পেছনে বাগানের দিকের একটা ঘরে আমরা উঠেছি, বাগান অবশ্য নামেই। তিন একর জায়গা জুড়ে গাছপালা ঝোঁপঝাড় গজিয়ে আছে। একটা প্রকাণ্ড আর চ্যাপটা টিলার মাথায় বাড়িটা। বাগানের শেষ প্রান্তে দাঁড়ালে অনেক দূর দেখা যায়। ওই দিকটায় সেইসব পোড়োখনি আছে।
কর্নেল যদুবাবুকে নিয়ে বেরিয়েছেন কোথায়। রাত জেগে ট্রেনে এসেছি। ক্লান্তিও বটে, চোখ দুটোও জ্বালা করছে। তাই ওঁদের সঙ্গে যাইনি। বাগানের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে বেড়া ডিঙিয়ে কঁকা জায়গায় গিয়ে একটা পাথরে বসে ছিলুম।
দিন-দুপুরে পেত্নির ভয় থাকার কথা নয়। কিন্তু পোড়োখনি এলাকার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি হচ্ছিল। সেইসময় কোথকে সাদা রঙের একটা ছোট্ট কুকুর দৌড়ে এসে আমার পা শুঁকে জ্বলজ্বল চোখে আমাকে দেখতে থাকল। অবাক হয়ে ভাবছি, কুকুরটা কার, এমন সময় ওপাশের ঝোঁপ থেকে যদুবাবুর মেয়ে পিঙ্কি ডাক দিল,–কুকি! কুকি!
কুকুরটার সারা গায়ে লোম। গা ঝাড়া দিয়ে সে মুখ ঘোরাল। পিঙ্কি তার কাছে এসে ধমক দিল, –কী? কথা কানে যাচ্ছে না বুঝি? চাটি খাবি বলে দিচ্ছি? চলে আয়!
বললুম,–তোমার কুকুর বুঝি? ভারি সুন্দর তো কুকুরটা!
পিঙ্কি আমার কথায় কান দিল না। সে কুকুরটাকে দুহাতে তুলে নিয়ে ঢাল বেয়ে দৌড়তে শুরু করল। তারপর নীচের সমতলে গিয়ে কুকুরটাকে নামিয়ে দিল। দেখলুম, এবার কুকুরটা অর্থাৎ কুকি তার পেছন-পেছন হাঁটছে। একটু পরে পিঙ্কি ঝোঁপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মেয়েটা তো বড্ড সাহসী দেখছি! এসেই শুনেছি, চুরাইলের আতঙ্কে লোকে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ঢুকে পড়ে। বাজার-এলাকা শিগগির নিশুতি সুনসান হয়ে যায়। এমনকি দিনের বেলাতেও কেউ একাদোকা মাঠেঘাটে পা বাড়ায় না। আর অতটুকু মেয়েটা দিব্যি একা ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই এলাকায়!
কিছুক্ষণ পরে উঁচু একটা জায়গায় ফ্রক পরা পিঙ্কির মূর্তি ভেসে উঠল। তার পায়ের কাছে কুকি। দুজনে খুব মন দিয়ে কী যেন দেখছে।
তারপর কুকিকে লাফাতে লাফাতে ওপাশে চলে যেতে দেখলুম। পিঙ্কিও তার পেছনে ছুটল। সিগারেট ধরিয়ে ওদের গতিবিধি লক্ষ করতে থাকলুম। কখনও ওরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আবার ওদের দেখতে পাচ্ছি। তারপর কতক্ষণ আর দুটিকে দেখতেই পেলুম না।
কেমন একটা অস্বস্তি লাগল। লম্বা পায়ে ঢাল বেয়ে নেমে গেলুম। ওদের শেষবার যেখানে দেখেছি, সেইদিকে হাঁটতে থাকলুম। জায়গাটা উঁচুনিচু, এবড়ো খেবড়ো। অজস্র খানাখন্দ, কোথাও গভীর গর্ত, নানা গড়নের পাথর পড়ে রয়েছে। মধ্যে-মধ্যে বোপঝাড় বা কিছু গাছ। এপাশে-ওপাশে টিলা। একটা পাথরে উঠে ওদের খুঁজলুম। তারপর দেখলুম, একখানে দাঁড়িয়ে পিঙ্কি একটু ঝুঁকে কী করছে। কুকিকে দেখতে পেলুম না।
চেঁচিয়ে ডাকলুম,–পিঙ্কি! পিঙ্কি!
পিঙ্কি আমার দিকে ঘুরে হাত নেড়ে কী বলল। তখন দৌড়ে ওর কাছে চলে গেলুম। গিয়ে দেখি, পিঙ্কির সামনে একটা স্কুপের কিনারায় গুহার দরজার মতো প্রকাণ্ড একটা খোঁদল। সেইদিকে হাত বাড়িয়ে পিঙ্কি কঁদো-কঁদো মুখে বলল,–কুকি ওর ভেতর ঢুকে গেল। আর বেরুচ্ছে না–এত ডাকছি!
খোঁদলের কাছে গিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলুম। ফুট-চারেক গভীর একটা গর্ত–তারপর সুড়ঙ্গের মতো ভেতরে চলে গেছে খোঁদলটার। গর্তে ঘাস আর সামান্য ঝোঁপঝাড় গজিয়ে আছে। পিঙ্কি ব্যাকুলভাবে ডাকছিল,– কুকি! কুকি! সে শাসাচ্ছিল। আওি কুকি’ বলে ডাকাডাকি করলুম। কিন্তু কুকুরটার পাত্তা নেই।
এইসব গর্তের ভেতর নেকড়ে, চিতাবাঘ বা হায়না থাকাও সম্ভব। তাদের পাল্লায় পড়ল না তো বোকা কুকুরটা? বললুম,–দেখো তো কী বিপদ হল! ওকে নিয়ে কেন এখানে এসেছিলে!
পিঙ্কি চোখ মুছতে মুছতে কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল,–রোজই তো আসি। কুকির সঙ্গে লুকোচুরি খেলি।
কুকি ওখানে ঢুকতে গেল কেন?
পিঙ্কি মাথা নেড়ে বলল,–জানি না। হঠাৎ ঢুকে গেল।
খোঁদলটাতে মানুষের পক্ষেও ঢোকা সম্ভব। নিশ্চয় একটা পোড়োখনির মুখ এটা। ভেতরে ঘন অন্ধকার থমথম করছে। টর্চ থাকলে ঢুকতে পারতুম। তাই বললুম,তুমি এক কাজ করো বরং। দৌড়ে গিয়ে বাড়ি থেকে একটা টর্চ নিয়ে এসো। তোমার কুকিকে উদ্ধার করা যাবে।
পিঙ্কি তখুনি দৌড়ল। আমি পাশের একটা ঝোঁপ থেকে লাঠির মতো একটা ডাল ভেঙে নিলুম। সঙ্গে রিভলবারটা নেই। থাকলে ভালো হত। অগত্যা লাঠি ভরসা করেই ঢুকতে হবে।
লাঠিটা হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তোক খুঁজছিলুম, যদি দৈবাৎ কোনো দেহাতি লোক পেয়ে যাই, সেও মন্দ হবে না। পয়সার লোভে তাকে ওই খোদলে ঢুকিয়ে কুকিকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা যায়। নাহলে অগত্যা নিজেকেই ঢুকতে হবে।
হঠাৎ একটু দূরে উঁচু পাথরের আড়াল থেকে কাউকে বেরুতে দেখলুম। সে ফাঁকায় পৌঁছুলে অবাক হয়ে দেখি, লাল কাপড়পরা এক সন্ন্যাসী। চেঁচিয়ে ডাকলুম,–সাধুবাবা! সাধুবাবা!
সাধুবাবা ঘুরে দাঁড়াল। তারপর আমাকে দেখেই সাঁৎ করে আবার উঁচু পাথরের আড়ালে গা ঢাকা দিল। তারপর আর তাকে দেখতে পেলুম না। ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত তো! কর্নেল এই সাধুবাবার কথা বলেছিলেন না?
একটু পরে হাঁপাতে হাঁপাতে পিঙ্কি ফিরে এল। টর্চ এনেছে। ওর সঙ্গে ওদের চাকর দশরথও এসেছে। দশরথের সঙ্গে সকালে আলাপ হয়েছে। লোকটার বয়স হয়েছে বটে, এখনও চেহারাটি শক্তসমর্থ। হাসতে হাসতে বলল,–কুকি কেন ঢুকেছে, হামার মালুম হয়েছে স্যার! ভৈরবগড়ের কুত্তাদের কাছে কুকি শুনেছে কী, ইয়ে সব গুহার অন্দরে করাড়ি রোটি মিলতে পারে।
