কর্নেল একটু হাসলেন। জয়ন্ত, তুমি কি কখনও এমন অদ্ভুত প্রাণীর কথা শুনেছ-যার পায়ের পাতা উলটো, চোখ দুটো সাপের মতো নিষ্পলক, যার চিৎকার শুনলে দুঃসাহসীরও শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে যায়?
জোরে মাথা নেড়ে বললুম,–না।
বলছি বটে প্রাণী, কিন্তু দেহাতি লোকেরা বলে পেত্নি। তুমি বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ হিমাচলের যেখানেই যাবে, দেহাতি লোকেদের কাছে এই সাংঘাতিক পেত্নির কথা শুনতে পাবে। উলটো দিকে পায়ের পাতা বলে এই পেত্নিকে মনে হবে পিছু হেঁটে তোমার দিকে ক্রমাগত এগিয়ে আসছে। চোখে পলক পড়ে না। ঠাণ্ডা-হিম সেই চোখে তাকিয়ে তোমার দিকে আসতে আসতে হঠাৎ সে বিকট চেঁচিয়ে উঠবে। সেই রক্ত-হিম-করা চিৎকার শুনলে তুমি তক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। তখন পেত্নি তোমার মুণ্ডটি মুচড়ে ছিঁড়ে নিয়ে রক্ত চুষে খাবে।
রাত সাড়ে দশটার কলকাতায় এই বিবরণ শুনতে শুনতে হেসেই ফেলতুম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ললাডশেডিং হয়ে গেল। অন্ধকারে মনে হল আমার খুব কাছেই পেত্নিটা দাঁড়িয়ে আছে। ঝটপট লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাতে ব্যস্ত হলুম। একটু চুপ করে থাকার পর কর্নেল বললেন, কিন্তু তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, পোড়োখনি এলাকায় জটাজুটধারী এক সাধুবাবাও নাকি থাকেন। যাই হোক, ভৈরবগড়ের পোড়োখনির ভেতর থেকে পেত্নিটা যদি আজ রাতে বেরিয়েও থাকে, কলকাতা পৌঁছুতে তার ভোর হয়ে যাবে। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, ডার্লিং।
হৈ-চৈ করে বললুম,–কী যা-তা বলেন! আমি কি ভয় পেয়েছি নাকি?
ষষ্ঠীচরণ একটা বাতি রেখে গেল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–বিহার থেকে হিমাচল পর্যন্ত এই পেত্নির খুব নামডাক। ওরা বলে চুরাইল। কোথাও চুড়ৈলও বলে। বাংলার গ্রামে যাকে বলে শাঁখচুন্নি, সে আসলে ওই চুরাইলেরই বাঙালি রূপ। পেত্নির হাতে থাকে শাঁখের চুড়ি। তাই ওই নাম। বাংলায় শাঁখের চুড়ি-পরা পেত্নি অপভ্রংশে শাঁখচুন্নি হয়ে গেছে।
ভৈরবগড়ে আপনি তাহলে চুরাইল দেখেছিলেন?
হ্যাঁ। জ্যোৎস্না ছিল। স্পষ্ট দেখতে পাইনি তার চোখ দুটো নিস্পলক কিনা, কিংবা তার পায়ের পাতা সত্যি উলটো দিকে ফেরানো কি না। তবে তার চিৎকারটা শুনেছিলুম। চেরা গলার সেই চিৎকার টেনে-টেনে হিপিয়ে কখনও কান্নার মত, কখনও তীব্র বিপদজ্ঞাপক সাইরেনের মতো। আমি ভীষণ হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। ব্যস্ততার মধ্যে টর্চটাও বিগড়ে গিয়েছিল। যখন আবার জ্বলল, তখন সে অদৃশ্য।
কিন্তু এতদিন পরে চুরাইল-রহস্য উদ্ধারে বেরুনোর কারণ কী? পেত্নিটা কি কারুর মুণ্ডু ছিঁড়ে রক্তপান করেছে?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন,–করেছে। তারপর উঠে গিয়ে কোণার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ইনল্যান্ড লেটার এনে বললেন,–পড়ে দেখো।
আলোর দিকে ঝুঁকে চিঠিটাতে চোখ রাখলুম। তাড়াহুড়ো করে লেখা। হরফগুলো বাঁকাচোরা।
প্রিয় কর্নেল,
ভৈরবগড়ে আবার চুরাইলের আবির্ভাব ঘটেছে। আগে মাঝেমাঝে যেমনটি দেখা গেছে, এবারও তেমনটি। দুজনের কাটামুণ্ডু আর ধড় পাওয়া গেছে। একফোঁটা রক্ত ছিল না। পুলিশ বলছে ডাকাতের কীর্তি। কিন্তু আমি জানি তা নয়। গত রাতে আমাদের পেছনের বাগানে চুরাইলের ডাক শুনেছি। তখন রাত প্রায় একটা। আমার অনিদ্রার কথা তো জানেন। ডাক শুনেই জানালা খুলে উঁকি দিয়েছিলুম। বন্দুক ছিল হাতে। কিন্তু লোডশেডিং চলছিল তখন। টর্চের আলোয় একপলক তার চেহারা দেখলুম। বুক কেঁপে উঠল। বন্দুক ছুঁড়তে পর্যন্ত পারলুম না ভয়ের চোটে। জানালা বন্ধ করে দিলুম। আমার খুব ভয় হচ্ছে, ওই দুজনের বাড়ির পেছনেও এমনি করে সে এসেছিল। দয়া করে আপনি শিগগির আসুন। ইতি,
যদুনারায়ণ দেব।
কর্নেলের কাছ থেকে যখন বেরোলুম, তখন রাত প্রায় এগারোটা বেছেছে। তখনও ওই এলাকা জুড়ে লোডশেডিং! গাড়ির হেডলাইটের ছটায় অসংখ্য চুরাইল ভেসে উঠছিল যেন। আলোকিত এলাকায় পৌঁছে দেখি, ঘন কুয়াশা জমেছে। মার্চেও এবার শীত পিছু ফিরে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে প্রচুর কুয়াশা। কুয়াশার ভেতর পেত্নিটা যেন আমাকে অনুসরণ করছিল। নিষ্পলক চোখে পিছু হেঁটে হেঁটে সে এগোচ্ছিল। গাড়ির গতি বাড়িয়েও তাকে যেন ফেলে যেতে পারছিলুম না। বাড়ি পৌঁছে। গাড়ি গ্যারেজে ঢুকিয়ে যখন বেরুচ্ছি। তখনও মনে হল সে গেটের বাইরে নিস্পলক ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে গিয়ে ঘরে ঢোকার পর কতক্ষণ কান পেতে থাকলুম, কিন্তু তার ডাক শুনতে পেলুম না। তখন নিজের মিথ্যে ভয়ের কথা ভেবে খুব লজ্জা হল। …
.
দুই
খনি এলাকা যতটা রুক্ষ দেখায়, ভৈরবগড় ততটা রুক্ষ নয়। শহর আর গ্রামে মেশানো একটা জনপদ। খনিগুলো অ্যাবান্ডা হয়ে ভৈরবগড়ের জৌলুস পড়ে গেছে কবে। রেলস্টেশন আছে। বটে, তার চেহারাও খাঁ খাঁ। ঢেউখেলানো মাটি, ছোটবড় আর পাহাড়, বনজঙ্গল নিয়ে কেমন একটা আদিম পরিবেশ।
যদুনারায়ণ দেবের বাড়িটা বেশ পুরনো। তিনপুরুষ আগে ওঁরা বাংলা থেকে এ মুল্লুকে এসেছিলেন খনি-ব্যবসা করতে। এখন অবস্থা আগের মতো জমকালো নয়। বাড়িতে আছেন যদুনারায়ণ, তার ছোটভাই রুদ্রনারায়ণ, যদুবাবুর সাত-আট বছর বয়সী মেয়ে পিঙ্কি, আর যদুবাবুর মা করুণাময়ী। যদুবাবুর স্ত্রী বেঁচে নেই। রুদ্রবাবু এখনও বিয়ে করেন নি। ধানবাদে একটা কোম্পানিতে চাকরি করেন। রোজ ট্রেনে যাতায়াত করেন।
