মনে একটা চাপা উত্তেজনা রয়ে গেল। বাড়ি ফিরে রাত দশটা নাগাদ আবার ফোন করতেই যথারীতি ষষ্ঠীচরণের সাড়া পেলুম। সে খিকখিক করে হেসে বলল,–কাগুঁজে দাদাবাবু নাকি? ইদিকে এক কাণ্ড!
কী কাণ্ড, ষষ্ঠী! কর্নেল ফেরেননি!
ফিরেছেন আজ্ঞে। কিন্তু বললুম না–ইদিকে এক কাণ্ড হয়েছে!
কী মুশকিল! কাণ্ডটা কী?
আজ্ঞে, কাটামুণ্ডু।
কাটামুণ্ডু! তার মানে? কার কাটামুণ্ডু?
আবার কার? বাবামশাইয়ের। খি খি খি …।
ভড়কে গেলুম। কর্নেলের কাটামুণ্ডু মানেটা কী? আর ষষ্ঠী এমন হাসছে কেন? শিউরে উঠলাম। কর্নেলের কাটামুণ্ডু … ষষ্ঠীর অমন পাগলাটে হাসি!
সর্বনাশ! তাহলে কি কর্নেলকে কেউ খুন করে গেছে আর তাই দেখে ষষ্ঠী পাগল হয়ে গেছে?
তক্ষুনি ফোন রেখে ঝটপট বেরিয়ে পড়লুম। রাস্তায় গিয়ে মনে হল, থানায় খবর দেওয়া উচিত হবে কি না। কিন্তু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের মতো ধুরন্ধর এবং শক্তিমান মানুষ খুন হবেন, কিংবা গলায় নির্বিবাদে কাউকে কোপ বসাতে দেবেন, ভাবাই যায় না। আগে ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখা দরকার।
কিন্তু ইলিয়ট রোডে কর্নেলের বাড়ির সামনে কোনো ভিড় নেই। রাস্তা সুনসান খাঁ-খাঁ। হন্তদন্ত তেতালায় উঠে কলিং বেলের সুইচ টিপলুম। আমার হাত কাঁপছিল। শরীর ভারী হয়ে উঠেছিল। দরজা খুলে গেলে ষষ্ঠীচরণের মুখ দেখতে পেলুম। আমাকে দেখে সে চাপা খিকখিক হেসে ফিসফিস করে বলল,–ভারি মজার কাণ্ড, দাদাবাবু। দেখুন গে না।
তাকে ঠেলে হন্তদন্ত ঢুকে পড়লুম। ড্রইংরুমের পর্দা তুলেই থমকে দাঁড়াতে হল। টেবিলের ওপর সত্যি সত্যি একটা কাটামুণ্ডু রয়েছে এবং সেটা কর্নেলেরই বটে। টাক এবং সাদা দাড়ি সবই ঠিকঠাক আছে। কিন্তু সেই কাটামুণ্ডের সামনে যিনি ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন, তিনি সম্ভবত কর্নেলের ভূত নন। কারণ তিনি চোখ তুলে আমাকে দেখলেন এবং মৃদুহাস্যে যথারীতি সম্ভাষণ করলেন, হ্যাল্লো ডার্লিং!
পাশে বসে আমি হো হো করে হেসে উঠলুম। তারপর বললুম,–আপনার ষষ্ঠীচরণটি এক অপূর্ব জিনিস! বলে কী, বাবামশাইয়ের কাটামুণ্ডু …
কর্নেল কথা কেড়ে বললেন,–ষষ্ঠী যে ভুল বলেনি, তা তো দেখতেই পাচ্ছ, জয়ন্ত! এখন বলো তো মুণ্ডুটা দেখে আমার বলে মনে হচ্ছে কি না?
আপনার ছাড়া আর কার? মুণ্ডুটা দেখতে দেখতে বললুম। একেবারে অবিকল। ওটা যদি রাস্তায় পড়ে থাকে, কেউ সন্দেহ করবে না যে ওটা নকল মুণ্ডু। এমনকি পোস্টমর্টেমের টেবিলে ডাক্তার যতক্ষণ না ছুরি চালাচ্ছেন, ততক্ষণ তিনিও ধরতে পারবেন না কিছু! তাছাড়া টাকটিও নিখুঁত হয়েছে।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে সহাস্যে বললেন,–ঠিক এমনটিই চেয়েছিলুম।
বললুম,–এটা কি চিৎপুরের টি এন গুপ্ত কোং থেকে অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়েছেন?
কর্নেল আমার দিকে একবার তাকিয়ে মাথা দোলালেন। তুমি আজ বিকেলে চিৎপুরে ট্রাফিকজটে আটকে গিয়েছিলে এবং আমাকে ডেকেছিলে, ঠিকই। কিন্তু তখন আমার বেজায় তাড়া ছিল। আশা করি, তুমি কুমোরটুলির প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী দেবেন পালের নাম শুনেছ। দেবেনবাবু ইদানীং পোশাকের দোকানের জন্য ডামি তৈরিতে খুব নাম করেছেন। চৌরঙ্গি এলাকার বহু পোশাকের দোকানে লাইফসাইজ মূর্তিগুলো ওঁরই তৈরি। আগে এসব জিনিস বিদেশ থেকে আনা হত। তবে সেসব মূর্তি অবশ্য সায়েব-মেমদের। এ যুগে সায়েব-মেম চলে না।
আপনার এই কাটামুণ্ডুটা কি মাটির?
মোটেও না। প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে তৈরি। দোকানের ডামিগুলোও তাই। মাটির মূর্তি ভেঙে যাবার চান্স থাকে।
কিন্তু ব্যাপারটা কী খুলে বলুন তো! গুপ্ত কোম্পানিতে কি আপনি পরচুলো কিনতে ঢুকেছিলেন? আর এই কাটামুণ্ডুরই বা উদ্দেশ্য কী?
কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন,–পরচুলো জিনিসটা বরাবর আমার চক্ষুশুল। বিশেষ করে যাত্রা-থিয়েটারের জন্য যে সব পরচুলো ভাড়া দেওয়া হয়, তাতে অসংখ্য উকুন থাকা সম্ভব। আর জয়ন্ত, সত্যি বলতে কি, টাক মানুষের চেহারায় জ্ঞানীর ব্যক্তিত্ব এনে দেয়। আমার টাক আমার বড় গর্বের জিনিস। তবে কাটামুণ্ডুর কথা জিজ্ঞেস করছ, এটা আমাকে ভালোবেসে উপহার দিয়েছেন কুমোরটুলির দেবেনবাবু। পুরো প্রতিমূর্তি গড়ে দিতে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলুম,–অত পরিশ্রমের দরকার নেই। বরং আমার মাথাটা উপহার দিলেই আমি খুশি।
বুঝলাম। কিন্তু টি এন গুপ্তের দোকানে তাহলে কেন ঢুকেছিলেন?
কর্নেল সে-কথার জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ চুরুট টানলেন। তারপর বললেন,–কাল থেকে দিন-চারেকের ছুটি নিতে পারবে জয়ন্ত?
পারব। কেন?
আমরা বেড়াতে যাব একজায়গায়।
কোথায়?
কর্নেল চোখ বুজে গল্প বলার সুরে বললেন,–ধানবাদের ওদিকে ভৈরবগড় নামে একটা জায়গা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ওই এলাকায় অনেক খনি ছিল। এখন সবই পোড়ো হয়ে গেছে–যাকে বলে অ্যাবাভান্ড মাইন। অর্থাৎ ভূগর্ভ থেকে ভোলার মতো কোনো জিনিস আর নেই। নিয়ম হল, পোতখনির মুখ সিল করে দিতে হয়। কিন্তু কজনই বা নিয়ম মানে? অনেক খনির মুখ সিল করা হয়নি। কোনোটাতে জল জমে আছে, কোনোটায় গভীর গর্ত। ঝোঁপজঙ্গল গজিয়ে গেছে। গত শীতে ভোলা খনিমুখগুলো থেকে জন্তু জানোয়ার বেরুতে দেখেছিলুম। তবে শেষ পর্যন্ত একটা দারুণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
ষষ্ঠীচরণ কফির ট্রে রেখে গেল। পেয়ালায় কফি ঢালতে ঢালতে বললুম,–হুঁ। বলুন।
