টোরাদ্বীপের ত্রিভুজের মতো অর্থাৎ পিরামিড-গড়ন দেখে অবাক হলুম। দুদিকে ঢালু ও খাড়া পাথুরে দেওয়াল, একদিকে–পশ্চিমে খানিকটা বেলাভূমি আছে। সেখানে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বোট চলে গেল। কথা থাকল, আমরা উঁচু জায়গা থেকে সাংকেতিক আলো দেখালে শার্ক থেকে আবার বোটটা এখানে চলে আসবে। শার্ক আমাদের জন্যে বাহাত্তর ঘন্টা অপেক্ষা করবে।
কুয়াশা মুছে গেলে দ্বীপের জঙ্গল এবং থমথমে চেহারা দেখে এতক্ষণে আমার গা ছমছম করে উঠল। বালির বিচে দাঁড়িয়ে কর্নেলরা চাপাগলায় কিছু আলোচনা করছিলেন। আমি ও পরমেশবাবু বিচের একটু তফাতে ঘন নারকেলগাছের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছিলুম। হঠাৎ যদি নৃসিংহটা বেরিয়ে এসে হামলা করে, রিভলভার দিয়ে ঠেকানো যাবে কি? রাইফেলগুলো তো এখনও বাক্সতে ভরা।
বোধকরি, সেকথা ভেবেই ডঃ গড়গড়ি গুটেনবার্গ সায়েবের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু পরে কর্নেল বললেন—চলুন ডঃ গুটেনবার্গ। তাহলে সেখানেই যাওয়া যাক।
রাইফেলের বাক্সটা খোলা হল। গুলি ভরে যে-যার রাইফেল হাতে নিয়ে আশ্বস্ত হলুম। কর্নেল ডিনামাইট-গ্রেনেডের বাক্সটা একহাতে ঝোলালেন। তারপর ডঃ গড়গড়িকে বললেন—ডঃ গড়গড়ি! কিছু যদি মনে করেন, রাইফেলের খালি বাক্সটা আপনাকে নিতেই অনুরোধ জানাব।
রোগাপটকা মানুষটি যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেটা কাধে নিলেন। আমরা কেউ কেউ লুকিয়ে হাসলেও বুঝলুম, বেচারার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কর্নেল এখন দলের নেতা। তাঁর কথা মেনে চলতেই হবে। আমি দেখেছি, এ সব অভিযানের ক্ষেত্রে কর্নেল একবারে রাশভারি মিলিটারি লোক হয়ে ওঠেন। সেই আমুদে চেহারাটি আর থাকে না।
নারকেল বনটাকে দুর্ভেদ্য মনে হল। অজস্র নারকেল পড়ে আছে এবং দু এক মিনিট অন্তর দুমদাম করে নারকেল পড়ছে। মাথা বাঁচিয়ে আমরা সাবধানে চলেছি। তারপর অন্যরকম গাছপালার ঘন জঙ্গল শুরু হল। কিন্তু মোটেও সমতল জায়গা নয়। ক্রমশ চড়াই হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। মধ্যে মধ্যে বিরাট ন্যাড়া পাথর রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকল।
এখন পথপ্রদর্শক ডঃ গুটেনবার্গ। সেবারকার জায়গায় তিনি ক্যাম্প করতে চান না। নতুন জায়গায় নিয়ে গেলেন। ওপরে একটা পাহাড়ি প্রস্রবণ থেকে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে এবং একটা খাদে জমা সেই জল আরও নিচে গড়িয়ে আবার একটা খাদে পড়ছে। সেখানে সমতল পাথরের ওপর আমরা জিনিসপত্র নামিয়ে হাঁফ ছাড়লুম। কাছে মিঠে জল থাকায় জলের অভাবে অন্তত তেষ্টায় মরতে হবে না। অবশ্য নারকেলগাছ রয়েছে নিচের দিকে। ডাবের জলে তেষ্টা মেটানো যায় কিন্তু গাছগুলোর গায়ে ঘন লতাপাতার বেড়া। তাছাড়া অনেক লতা নাকি বিষাক্ত এবং তলায় পড়ে থাকা নারকেল কুড়োতে গিয়ে সেবারে নাকি ডঃ গড়গড়ি সাপের পাল্লায় পড়েছিলেন।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁবু পাতা হল তিনটে। ডঃ গড়গড়ি একা একটা তাঁবুতেই থাকতে চান। সঙ্গীর নাকডাকার শব্দে নাকি ওঁর বড্ড বিরক্তি জাগে। তাছাড়া সারাক্ষণ বই পড়ার স্বভাব। কেতাব সঙ্গে আনতে ছাড়েননি।
সঙ্গে আনা টিনের খাবারে আমরা খিদে মেটালুম এবং প্রকাণ্ড ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে আনন্দে পান করলুম। ক্লান্তি চলে গেল। তারপর কর্নেল নির্দেশ দিলেন–এবার বেরিয়ে পড়া যাক।
সবাই তৈরি। ডঃ গড়গড়ি বললেন—কিন্তু ক্যাম্পে তো একজন থাকা দরকার। অন্তত টিনের খাবারগুলো পাহারা না দিলে দ্বীপের রাক্ষুসে ইঁদুরগুলো সব শেষ করে ফেলবে। তাই না ডঃ গুটেনবার্গ?
ডঃ গুটেনবার্গ বললেন—তাও বটে। সেবারে আমাদের পঞ্চাশটা টিনের কৌটো খালি করে ফেলেছিল ইঁদুরগুলো। একেকটা বেড়ালের মতো প্রকাণ্ড। দাঁত নয় যেন ইস্পাতকাটা করাত!
কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—তাহলে জয়ন্ত বরং পাহারা দাও।
আমি তীব্র আপত্তি জানিয়ে বললুম-কক্ষনও না। এমন কথা তো ছিল না কর্নেল!
ডঃ গড়গড়ি বললেন—আপত্তি করবেন না জয়ন্তবাবু! বরং আপনি আর আমি ক্যাম্পে থাকি। নৃসিংহ বিজয়ে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। বরং আমরা ক্যাম্পে পাহারাও দেব, আবার ধারেকাছে প্রত্নদ্রব্যও খোঁজাখুজি করব। সারা দ্বীপে ভাঙা মৃৎপাত্রের টুকরো ছড়ানো। বিশ্বাস না হয় এই দেখুন!
উনি সত্যিসত্যি পাথরের একটা খাঁজ থেকে একটা খোলামকুচি কুড়িয়ে দেখালেন। আমার দিকে জনান্তিকে চোখ টিপলেন। কর্নেল বললেন—দেরি হয়ে যাচ্ছে। বেশ, তাই হোক। আপনারা দুজনেই থাকুন। আসুন ডঃ গুটেনবার্গ! আসুন পরমেশবাবু!
ওঁরা পাহাড়ের ওপর দিকে জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য হলে ডঃ গড়গড়ি একটু হেসে বললেন—খুব বেঁচে গেলেন মশাই! দেখবেন, এক্ষুনি ভিরমি খেতে খেতে পালিয়ে আসবে। ওসব ঝুটঝামেলায় যাওয়ার কী দরকার বলুন না? বরং আসুন, আমরা পটারি কুড়োই। ওই দেখুন কত সব টুকরো পড়ে আছে।
বলে উনি ছেলেমানুষের মতো লাফালাফি করে পাথরের চত্বরে ফাটলগুলো থেকে খোলামকুচি কুড়োতে শুরু করলেন। আমি চুপচাপ মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে ঘুরে বললেন—কুড়োন! কুড়োন! দৈনিক সত্যসেবকে ছেপে দেবেন। এসব পটারি অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগেকার। হিড়িক পড়ে যাবে মশাই!
একটা ভাঙা খোলামকুচি কুড়িয়ে পরখ করে দেখলুম, সুন্দর নকশার চিহ্ন রয়েছে কিন্তু একটু চাপ দিতেই গুঁড়ো হয়ে গেল। ডঃ গড়গড়ি যা বলেছেন, তাতে সম্ভবত কোনও ভুল নেই। এই মাটির পাত্রগুলো খুবই প্রাচীনকালের। আর এই দ্বীপে যে মানুষ বাস করত তাও জানা যাচ্ছে। বললুম—আচ্ছা ডঃ গড়গড়ি, তাহলে কি নৃসিংহজাতীয় প্রাণীর হাতেই এখানকার অধিবাসীরা কোনও একসময়ে সবংশে মারা পড়েছিল?
