ভেঁদা-পালোয়ান হঠাৎ খেপে গেল। আঁক শব্দে পেশী ফুলিয়ে বলল, “তবে রে বদমাশ!” তারপর সে ঊরুতে থাপ্পড় মেরে ঈগল-মানুষটাকে কুস্তিতে চ্যালেঞ্জ করতে লাগল, “চলা আও! কাম অন!” ।
ভবেশবাবু ধমক দিলেন, “আঁই বাঁদর! মারা পড়বি যে! সাঙ্ঘাতিক নখ দেখতে পাচ্ছিস না?”
ভোঁদা-পালোয়ান গর্জে বলল, “নখ ভেঙে ছাতু করে দেব। কাম ইন ঈগলকা বাচ্চা!”
আমি বললুম, “জগদীশবাবু! জগদীশবাবু! আগে গোটাকতক বল কুড়িয়ে নিন। তা হলে ঈগল-মানুষটাকে নামিয়ে এনে লড়তে পারবেন। সম্রাটবাহাদুর! আপনার ল্যাসো কোথায়?”
সম্রাট চাংকো বলে উঠলেন, “খাসা বুদ্ধি! তুমি বকশিশ পাবে হে ছোকরা! আমার মাথা খুলে গেছে। হায়, হায়! কেন যে এটা অ্যাদ্দিন মাথায় ঢোকেনি?” বলে তিনি আলখাল্লা থেকে সেই ল্যাসোটা বের করলেন। ঝটপট কয়েকটা বল কুড়িয়ে পালোয়নের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, “আমি ওকে আটকাচ্ছি। তুমি রেডি হও, পালোয়ান!”
তিনবারের বার ল্যাসোটা ঈগল-মানুষের এক পায়ে আটকে গেল। আমি আর ভবেশবাবু ল্যাম্বোর গোড়ায় হাত লাগালুম। তিনজনে টানতে থাকলুম হেঁইয়ো-হেঁইয়ো করে। ঈগল-মানুষটার জোরে এঁটে ওঠা কঠিন। পালোয়ান এবার বলের ওজনে খুব ওজনদার মানুষ। সে-ও হাত লাগাল। এতক্ষণ ঈগল-মানুষ জব্দ হল। নীচে নামানো গেল তাকে। তারপর পালোয়ান একটা বল ছুড়ল তার দিকে। ঠকাস করে লাগল ডানায়। আমরা তিনজনে ততক্ষণে পাথুরে মাটিতে উপুড় হয়েছি।
পালোয়ান ফের বল ছুঁড়তে যাচ্ছিল, নিষেধ করে বললুম, “না, না। ওজন কমে যাবে আপনার। এবার কুস্তি শুরু করুন। কিন্তু সাবধান! ঠুকরে না দেয়!”
পালোয়ান বলল, “ওজন বেড়েই তো প্রবলেম দাদা! লাফাতে পারছি না যে! ওজন কমাই আগে। তারপর এক লাফে…।” বলে বাড়তি বলগুলো ফেলে দিতে গিয়ে হঠাৎ সে থামল। বলল, “নাহ দাদা! বলসুষ্ঠু ওর পিঠে চাপব। তা হলে কাবু হবে। আপনারা টেনে আটকে রাখুন।”
ঈগল-মানুষটার ডানার ঝাঁপটানিতে ঝড় বইছিল। পালোয়ান চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে একাকে লাফ দিয়ে তার পিঠে চেপে গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। ঈগল-মানুষটা তীক্ষ্ণ ঠোঁট ঘুরিয়ে বিকট ক্রা-ক্রা গর্জন করতে করতে নেতিয়ে পড়ল। পালোয়ান একগাল হেসে বলল, “রামটিপুনির চোটে ব্যাটাচ্ছেলের দম বেরিয়ে গেছে।”
সে ঈগল-মানুষটার পিঠে দাঁড়িয়ে আছে দেখে ভবেশবাবু বললেন, “নেমে আয় ভোঁদা! আর বীরত্ব দেখাতে হবে না।”
পালোয়ান একলাফে নামল। তারপর বাড়তি বলগুলো ঈগল-মানুষের প্রকাণ্ড ঠোঁটের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, “বডি উড়ে যাবে না! এ কী জায়গা বাবা! বলগুলো না থাকলে উড়ে যায় মানুষ।”
ঈগল-মানুষ পড়ে রইল। সম্রাট চাংকো পালোয়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমার ওপর খুব খুশি হয়েছি যে, ছোকরা! এসো, তোমাকে এক গ্লাস অমৃত খাইয়ে দিই। চিরজীবী হবে। তবে বলে রাখা উচিত, এই গ্রহ ছেড়ে তোমাদের ওই নোংরা গ্রহে গেলে কিন্তু অমৃত-শরবত কোনো কাজ দেবে না। ভেবে দ্যাখো, কী করবে।”
ভবেশবাবু ভাগনেকে চোখের ইশারায় খেতে নিষেধ করলেন। কিন্তু পালোয়ান বলল, “মামাবাবু! আমি আর পৃথিবীতে ফিরব না। এখানেই কুস্তির আখড়া খুলব। গোরিলা-মানুষদের বডি বিল্ডআপ শেখাব। ওদের অমন তাগড়াই বডি। কিন্তু কোনো কাজে লাগাতে জানে না। খেলা বলতে খালি বল ছোঁড়া। ধুস! ও তো পুঁচকে ছেলেমেয়েদের খেলা।”
ল্যাবে ফিরে সম্রাট চাংকো এক গ্লাস অমৃত দিলেন ভোঁদাকে। সে মামাবাবুর ফের নিষেধ সত্ত্বেও টো-টো করে খেয়ে বলল, “ওঁদেরও দিন দাদু! একলা খাওয়া কি…”
সম্রাট চাংকো ফুঁসে উঠলেন, “দাদু? দাদু মানে? সম্রাট চাংকোকে তুমি দাদু বলছ?” রফা করে দিয়ে বললুম, “দাদু, মন্দ না ইওর এক্সেলেন্সি! তবে সম্রাটদাদু বলাই উচিত।”
“ওকে! সম্রাটদাদু বলো।”
ভোঁদা বলল, “সম্রাটদাদু! মামাবাবু আর এই রিপোর্টারবাবুকে এক গ্লাস করে অমৃত দিন।”
সম্রাট চাংকো চমকে উঠে আমার দিকে তাকালেন, “তুমি রিপোর্টার নাকি হে ছোকরা? সর্বনাশ! আগে জানলে তো সাবধান হয়ে যেতুম। হুঁ, সবাইকে পৃথিবীতে ফেরার অনুমতি দেব। তোমাকে নয়।”
“কেন সম্রাটবাহাদুর?”
“ওরে বাবা! ফিরে গিয়ে তুমি কাগজে আমার কথা লিখবে আর আঁকে-ঝকে এখানে রিপোর্টার এসে জুটবে। আমাকে জেরবার করবে। আমি ওতে নেই। রিপোর্টাররা বড্ড ডিসটার্ব করে?”
“না, সম্রাটবাহাদুর! আজকাল রিপোর্টারদেরই যেচে-পড়ে সবাই খবর দেয়। পাবলিসিটি চায় কাগজে। সে-যুগ আর পৃথিবীতে নেই।”
“আমি পাবলিসিটি চাইনে।” গম্ভীর মুখে এ-কথা বলে এক গ্লাস অমৃত বের করলেন সম্রাট চাংকো, “নাও, খেয়ে ফেলো। পৃথিবীতে তোমাকে ফিরতে যখন দিচ্ছি না, তখন তুমি এটা খাও। এই মামা-ভদ্রলোকের লোহালক্কড়ের ব্যাবসা আছে। এখানে খামোকা পড়ে থাকলে ব্যাবসার লোকসান হবে। শুধু ওঁকে ফিরে যেতে দেব।”
অমৃতটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেয়ে দেখলুম, স্বাদটা মন্দ না। কতকটা বেলের শরবতের মতো স্বাদ। ভবেশবাবু করুণ মুখে বললেন, “অগত্যা এক গ্লাস জল পেলে হত। তেষ্টা পেয়েছে, এ-বয়সে এতক্ষণ দড়ি ধরে টানাটানি করে বড্ড টায়ার্ড হয়ে গেছি সম্রাটবাহাদুর!”
সম্রাট চাংকো ফিক করে হাসলেন, “ঠিক আছে। আপনাকে জলের বদলে অমৃতই দিচ্ছি। তবে ওই নোংরা গ্রহে ফিরলে অমৃতের গুণ টিকবে না। সাবধান মশাই! পৃথিবীতে ফিরে যেন নিজেকে অমর ভাববেন না।”
