চারবারের বার বলটা ক্যাচ ধরল পালোয়ান এবং ধুপ করে নামতে পারল। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম অভ্যাসে, “আউট! আউট! আউট!”
সম্রাট চাংকো চোখ কটমট করে বললেন, “আর যাই বলল হে ছোকরা, তোমাদের ওই নোংরা জায়গার ভুতুড়ে খেলার টার্মগুলো আওড়াবে না। কান পচে যায়।”
পালোয়ান মুচকি হেসে বলল, “দাদা! সত্যিই আউট করে দিয়েছি বলুন! কেমন একখানা ক্যাচ ধরেছি।”
“আবার? আবার?” সম্রাট চাংকো হুঙ্কার দিলেন, “বল কেড়ে নেব বলে দিচ্ছি।”
“ভোঁদা-পালোয়ান ভড়কে গিয়ে জিভ কাটল, “সরি স্যার!”
“স্যার নয়, ইওর এক্সেলেন্সি বলো!”
ভোঁদা মুখ-তাকাতাকি করছে এবং তার মামা চোখ-ইশারা করছেন। আমিও করছি। সম্রাট চাংকো ক্রুদ্ধ হয়ে চোখ পিটপিট করছেন। অগত্যা ভোঁদা বলল, “সরি, ইওর এক্সেলেন্সি!”
সম্রাট চাংকো খুশি হয়ে বললেন, “এসো।”
ঘরের পর ঘর, সবই কালো, তারপর ঘর। অনেক গোলকধাঁধা পেরিয়ে একটা ঘরে পৌঁছলুম আমরা। এতক্ষণে বুঝলুম, সম্রাট চাংকো একজন বিজ্ঞানী। চন্দ্রকান্তবাবুর চেয়ে উঁচুদরের বিজ্ঞানী নিঃসন্দেহে। বিশাল ল্যাব। কতরকম যন্ত্র। জার। কত বিচিত্র সব কমপিউটার। এককোণে সোফায় আমাদের বসতে বললেন সম্রাট চাংকো। বসার পর তারিফ করে বললুম, “আমাদের বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তেরও একটা ল্যাব আছে। তবে এর কাছে নস্যি!”
সম্রাট চাংকো বাঁকা হেসে বললেন, “চন্দ্রকান্ত বিজ্ঞানের বোঝে কী? ও তো একটা বুন্ধু।”
“তাঁকে আপনি চেনেন সম্রাটবাহাদুর?”
“আলবাত চিনি। আমার সঙ্গে তাইপেতে আলাপ হয়েছিল একটা সেমিনারে। যাই হোক, এবার ওদের ধরে আনার ব্যবস্থা করি।” বলে সম্রাট চাংকো একটা যন্ত্রের সামনে বসলেন, “শুধু একটাই সমস্যা। কুমড়ো-মানুষগুলো বেয়াড়া। খুব আমুদে স্বভাবের কিনা! তাই আমাদের জিনিস পেলে ছাড়তে চায় না। দেখা যাক। নইলে আমার গোরিলা-সেনা পাঠাতে হবে। ওদের ওরা খুব ভয় পায়।”
বিশাল ভিশনস্ক্রিনে এবার ফুটে উঠল সেই কিটো গ্রহের মনোরম সবুজ উপত্যকা আর রং-বেরঙের কুমড়ো-মানুষ। আমার বৃদ্ধ বন্ধু চোখে বাইনোকুলার রেখে যথারীতি এদিকে-ওদিকে, সম্ভবত পাখি খুঁজছেন অথবা প্রজাপতি। কিটো গ্রহে পাখি-প্রজাপতি দেখেনি। তবে কর্নেলের চোখ। কিছু বলা যায় না!
গজকুমারবাবুকে দেখলুম রেসের আয়োজন করেছেন। কুমড়ো-মানুষেরা দৌড়চ্ছে। উনি হাততালি দিচ্ছেন। হালদারমশাই একটা ডিমাললা বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরঘুর করছেন। গগায়েন্দার স্বভাব। আর বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত নোটবইতে কীসব টুকছেন। কুমড়ো-মানুষেরা রেসের জায়গায় ভিড় করেছে।
সম্রাট চাংকো বললেন, “ওদের এক্সরের ল্যাসেতে বন্দী করে আনা যায়। যেভাবে আমার বন্ধুর নাতি আর এই মামা-ভাগনেকে ধরে এনেছি। কিন্তু চন্দ্রকান্ত মহা ধূর্ত। ওর পকেটে একটা রে-ডিটেক্টর আছে। টের পেয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেই সমস্যা। কুমড়ো-মানুষদের ঘরগুলো এমন ধাতুতে তৈরি, কোনো অদৃশ্য রশ্মিই ঢুকতে পারবে না। হুঁ, গোরিলা-বাহিনীই পাঠানো যাক।” বলে হাঁক দিলেন, “টাম্বো মাম্বো জাম্বো!”
অমনি ভিশনস্ক্রিনের দৃশ্য মুছে একদঙ্গল গোরিলা-মানুষের ছবি ফুটে উঠল। তারপর দেখলুম। সেই দানোর মতো গোরিলা-মানুষ, যে ভোঁদা-পালোয়ানকে কাতুকুতু দিচ্ছিল, গোরিলা-মানুষদের চুলের ডগা থেকে আজব বলগুলো খুলে নিল।
সঙ্গে-সঙ্গে তারা বাই-বাই শূন্যে ভেসে উঠল এবং দেখতে দেখতে উধাও হয়েও গেল। সম্রাট চাংকো বসে রইলেন। এই সুযোগে ফিসফিস করে ভবেশবাবুকে বললুম, “আপনি ওই গোরিলা-মানুষটার কাঁধে চেপেছিলেন কেন?”
ভবেশবাবু তেতোমুখে অমনি চাপা স্বরে বললেন, “ইচ্ছে করে কি চেপেছি মশাই? ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে কী পেয়েছে কে জানে। যখন-তখন এসে কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে বেড়ায়। আর নামবার চেষ্টা করলেই কাতুকুতু।”
সম্রাট চাংকো ঘুরে বললেন, “কীসের ষড়যন্ত্র হচ্ছে যেন? সাবধান!”
ঝটপট বললুম, “না, ইওর এক্সেলেন্সি! আমরা আপনার ক্ষমতার প্রশংসা করছি।”
“এ কী ক্ষমতা দেখছ হে ছোকরা! আসল ক্ষমতা দেখবে, চাঁদুটাকে আসতে দাও আগে।”
“চাঁদু, মানে চন্দ্রকান্তবাবুর কথা বলছেন কি?”
সম্রাট চাংকো অট্টহাসি হেসে বললেন, “আবার কার?” বলে তিনি খুটখুট করে বিজ্ঞানী চন্দ্রান্তের মতোই কমপিউটারের বোতাম টিপতে থাকলেন। একটু পরে ভিশনস্ক্রিনে একটা অদ্ভুত দৃশ্য ফুটে উঠল। প্রথমে মনে হল একটা বাজপাখি উড়ে আসছে। কিন্তু ক্রমে সেটা বড় হতে থাকল। তখন দেখলুম বাজপাখি গড়নের একটা বিকট মানুষ, দু’টি প্রকাণ্ড ডানা।
সম্রাট চাংকো উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। বললেন, “সর্বনাশ! আবার ঈগল-মানুষটা হানা দিতে আসছে দেখছি! জানি না, আমার কোন প্রজাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে। সমস্যা হল, ওকে কোনো অস্ত্রেই কাবু করা যায় না।” বলে একটা ছোট্ট স্পিকার হাঁকলেন, “আম্বো ডাম্বো হ্রাম্বো! আম্বো ডাম্বো হ্রাম্বো!”
তারপর আসন ছেড়ে উঠে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
আমরা ওঁকে অনুসরণ করলুম। একটু পরে খোলা চত্বরে দেখলুম সম্রাট চাংকো একটা লম্বাটে পিস্তল তাক করে আছেন। নীলচে রোদ্দুরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঈগল-মানুষটা আকাশে চক্কর দিচ্ছে। গোরিলা-মানুষদের অবস্থা দেখে মায়া হল। তারা তাড়াহুড়ো করে যে-যেখানে পারছে, লুকিয়ে পড়ছে। আড়াল থেকে বড়-বড় পাথরও ছুঁড়ছে কেউ-কেউ। মাধ্যাকর্ষণ কম। তাই প্রকাণ্ড পাথরগুলো আকাশে ছুটে যাচ্ছে। আশ্চর্য, ঈগল-মানুষটা পায়ের নখ দিয়ে পাথর ধরে ফেলে পালটা ছুঁড়ে দিচ্ছে। কিন্তু সেগুলো তুলোর মতো উড়তে উড়তে বহু দূরে গিয়ে আস্তে-আস্তে নেমে যাচ্ছে। সম্রাট চাংকোর পিস্তল থেকে নীল-লাল-হলুদ আলোর গুলি শাঁই-শাই করে বেরিয়ে ঈগল-মানুষটাকে আঘাত করছে। কিন্তু তার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। ধোঁয়া হয়ে চাপচাপ উড়ে যাচ্ছে। আকাশ যেন ক্রমে সাদা মেঘে-মেঘে ঢেকে গেল। তার ভেতর একটা অতিকায় ঈগলের ওড়াওড়ি।
