ভবেশবাবু সোফায় বসে তারিয়ে-তারিয়ে অমৃত খেতে থাকলেন। মুখে অমায়িক ভাব ফুটে উঠল। চাপা স্বরে বললেন, “লোহালক্কড়ের ব্যাবসাটা এখানে করতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু চলবে কি? ওই গোরিলা-মানুষগুলো কেনাকাটা-বিক্রিবাটা বোঝে বলে মনে হয় না। খালি হাম্বা-হাম্বা করে বেড়ায় গোরুর মতো!”
পালোয়ান-ভাগনে শুধরে দিল, “না মামাবাবু! হাম্বো হাম্বা!”
“ওই হল আর কি! তবে ভোঁদা, তুই কি সত্যি এখানে থাকবি ভেবেছিস?”
“হুঁউ।”
ভবেশবাবু বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বললেন, “তোর নামে সম্পত্তি উইল করে দিতুম। আর নবডঙ্কাটিও পাবি না কিন্তু! ভেবে দেখ।”
ভোঁদা পালটা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, “নবডঙ্কাটি! আমি লোহালক্কড়ের মধ্যে থেকে আপনার মতো মরচে ধরে যাব নাকি?”
মামা-ভাগনের মধ্যে ঝগড়া বাধার উপক্রম হয়েছিল, সেই সময় ভিশনস্ক্রিনে একটা দৃশ্য ফুটে ওঠায় তা থেমে গেল। গোরিলা-মানুষদের সঙ্গে ধুন্ধুর যুদ্ধ বেধেছে। কুমড়ো-মানুষরাও দমাদ্দম গোরিলা-মানুষদের ওপর পড়ছে। আর গোয়েন্দা-হালদারমশাই ফঁক বুঝে গোরিলা-মানুষদের টিকি থেকে লোহার বল খুলে ফেলছেন। অমনি তারা ভড়কে গিয়ে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে। সম্রাট চাংকো হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “তবে রে ব্যাটা টিকটিকি!”
.
পাঁচ
এবার যুদ্ধটা দেখার মতো হত। কিন্তু সম্রাট চাংকো বেরিয়ে গেলেন। আমরাও বেরোলুম। উনি ব্যস্তভাবে হাতের একটা খুদে যন্ত্রের মাথায় বল কুড়িয়ে আটকে ট্রিগারে চাপ দিতে থাকলেন এবং বলগুলো উধাও হয়ে গেল। বুঝলুম, গোরিলাবাহিনীকে বল জোগাচ্ছেন। তা না হলে ওরা এই গ্রহে ফিরে বিপদে পড়বে। একটার-পর-একটা বল ছুঁড়ছিলেন সম্রাট চাংকো। সেই সময় ভবেশবাবু ফিসফিস করে বললেন, “জয়ন্তবাবু! এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। চলুন, পালিয়ে যাই!” ।
কথাটা মনে ধরল। ভোঁদাকে ইশারা করলুম। সে গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
তখন ভবেশবাবু তার কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে থাকলেন। সম্রাট চাংকো ক্রমশ বল ছুঁড়তে-ছুঁড়তে এগিয়ে চলেছেন। আমাদের লক্ষ করার সময় নেই ওঁর।
আজব পুরী থেকে বেরিয়ে পড়তে অসুবিধে হল না। কারণ সব প্রহরী গোরিলা-মানুষ তাদের সম্রাটের কাছে গিয়ে জুটেছে এবং হাম্বা হাম্বো করে সম্ভবত তার জয়ধ্বনি দিচ্ছে। তা ছাড়া তারা তাদের বাহিনীর বিপদ টের পেয়েও থাকবে।
সোজা গিয়ে পৌঁছলুম। স্পেসশিপের কাছে। আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, কোনো গোরিলা-মানুষ ওটার কোনো ক্ষতি করেনি। আসলে জায়গাটা ওদের বসতি এলাকা থেকে দূরে।
স্পেসশিপে মামা-ভাগনেকে ঢুকতে বললুম। দু’জনে মুখ-তাকালাকি করে অবশেষে ঢুকলেন। তারপর ভোঁদা বলল, “দাদা! এটা কী প্লেন? এমন প্লেন তো কখনও দেখিনি।”
বললুম, “এটা স্পেসশিপ। প্লিজ, চুপচাপ বসে থাকুন। সিটবেল্ট শক্ত করে বেঁধে নিন। আর বলগুলো বাইরে ফেলে দিন।”
স্পেসশিপটা চালানোর অভিজ্ঞতা খানিকটা হয়েছে। বলগুলো থাকলে আগের অবস্থা হত। তাই বলগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফেলতে হল। মামা-ভাগনে এতে আপত্তি করলেন না। ওঁরা পালাতে পারলে বাঁচেন বলেই মনে হচ্ছিল। ভোঁদা-পালোয়ান কিছুক্ষণ আগেই এই গ্রহে থাকতে জেদ ধরেছিল। এখন সে খ্যাখ্যা করে হেসে বলল, “বাপস! এখানে মানুষ থাকে? ওদিকে আমার ক্লাবের অ্যানুয়াল ফাংশন পয়লা বোশেখ। কত্ত কাজ বাকি আছে।”
বোম টিপে স্পেসশিপে স্টার্ট দিলুম। এবার লক্ষ করলুম, প্রত্যেকটা বোতামে নির্দেশ লেখা। আছে। কাজেই আর আমাকে পায় কে? স্পেসশিপ নিমেষে আকাশে উঠে গেল।
কিন্তু কুমড়ো-মানুষদের সেই কিটো গ্রহে যাব কী করে? খুঁজতে-খুঁজতে একটা বোতামে লেখা দেখলুম, “এনকোয়ারি।” সেটা টিপতেই ছোট্ট ভিশনস্ক্রিনে সবুজ হরফে ফুটে উঠল, “সামনে টাইপমেশিন। যেখানে যেতে চাও, সেই হরফগুলো টেপো। সাবধান! ভুল হরফে আঙুল পড়ে না। যেন।”
টাইপমেশিনে কে. আই. টি. ও হরফগুলো টিপে দিলুম।
মিনিটখানেক পরে ভিশনস্ক্রিনে ফুটে উঠল, ‘এসে গেছে। নামতে হলে ডাউন লেখা বোতাম টেপো।
ব্যস! চিরবিকেলের দেশের বালিয়াড়িতে স্পেসশিপ নামল। ভোঁদা জানলা দিয়ে দেখে বলল, “এ কোথায় এলুম দাদা? রাজস্থানের মরুভূমি নাকি?”
বললুম, “না জগদীশবাবু! নামুন। কুমড়ো-মানুষদের দেশে এসে গেছি। এখন আমার সঙ্গীদের খোঁজে বেরোতে হবে।”
ভোঁদা নেমে গেল, আমিও নামলুম। ভবেশবাবু বললেন, “আমার মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। আপনারা যা হয় করুন মশাই! আমি এখন ঘুমোব।”
এটা আগের জায়গা নয়। কুমড়ো-মানুষদের সেই বসতিটা থেকে কতদূর পৌঁছেছি কে জানে? বললুম, “আসুন জগদীশবাবু! এবার কিন্তু রীতিমতো একটা অভিযান হবে। সম্রাট চাংকোর ল্যাবে
যে বসতিতে লড়াই দেখেছেন, সেটা খুঁজে বের করা দরকার।”
ভোঁদা চিন্তিতমুখে বলল, “চারদিকেই তো মরুভূমি!”
“চলুন। দেখা যাক। একটা বালির পাহাড় কোথায় আছে, আগে সেটাই খুঁজতে হবে।”
কিছুদূর চলার পর ভোঁদা বলল, “এক কাজ করা যাক দাদা! এখানে বালির ঢিবি করে চিহ্ন দিয়ে রাখি। তারপর আপনি যান ওই দিকে, আমি যাই এই দিকে। এক ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে না পেলে ফিরে আসব এখানে। কেমন?”
“মন্দ বলেননি! ঠিক আছে। আপনি বাঁ দিকে যান, আমি ডান দিকে। পরের বার আমি সামনে, আপনি পেছনে। তবু যদি খুঁজে না পাই আমরা, তা হলে আবার উড়ে অন্য একখানে গিয়ে নামব।”
