সামনাসামনি হলে সে ইংরেজিতে বলল, “আমি সেই চাংকো, দ্বিতীয় ব্রহ্মাণ্ডের সম্রাট। ওহে প্রথম ব্রহ্মাণ্ডের পুঁচকে ছোকরা! কোন সাহসে তুমি বিনা অনুমতিতে আমার সাম্রাজ্যে ঢুকেছ?”
খট করে মিলিটারি স্যালুট ঠুকে বললুম, “বেয়াদপি মাফ করবেন সম্রাট বাহাদুর। আমি দৈবাৎ এখানে এসে পড়েছি। যদি অনুমতি পাই, সব কথা খুলে বলব।”
সম্রাট চাংকো কুতকুতে চোখে আমাকে দেখতে দেখতে বললেন, “তোমাকে ভালো ছেলে বলেই মনে হচ্ছে। অন্তত ওই লোকটার ভেঁপো ভাগনেটার মতো নও। বিচ্ছুটা আমায় বলে কী–সে নাকি প্রথম ব্রহ্মাণ্ডের কোথায় ‘দেহশ্রী’ খেতাব পেয়েছে। হাঃহাঃহাঃহাঃ!”
সন্দিগ্ধ হয়ে বললুম, “আপনি ভবেশবাবুর ভাগনে ভেদা-পালোয়ানের কথা বলছেন কি? তাদের কী করে পেলেন এখানে?”
সম্রাট চাংকো ফঁস খুলে খুব হেসে-টেসে বললেন, “ধরে এনেছি। তবে পালোয়ানের অবস্থা দেখবে এসো।”
.
চার
পালোয়ানের অবস্থা করুণই বটে! পরনে সেই হাফপেন্টুল আর স্পোর্টিং গেঞ্জি। কিন্তু এ কী দশা তার!
একটা বিশাল হলঘরের ভেতর তাকে ছাদে টিকটিকির মতো সেঁটে থাকতে দেখলুম। ডাকলুম, “জগদীশবাবু! জগদীশবাবু!”
পালোয়ান সিলিং থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে কাতর মুখে বলল, “দাদা, আমি নামতে পারছি না। যতবার নামবার চেষ্টা করছি, সিলিংয়ে আরও সেঁটে যাচ্ছি।”
“মাধ্যাকর্ষণের অভাব, জগদীশবাবু!” একটু হেসে বললুম, “আপনার উচিত ছিল এখানকার একটা বল কুড়িয়ে পকেটে রাখা। তা হলে ওজন বেড়ে যেত, দিব্যি চলাফেরা করতে পারতেন।”
“রেখেছিলুম তো! ওই লোকটা কেড়ে নিল।”
সম্রাট চাংকো খাপ্পা হয়ে বললেন, “লোকটা! তুমি আমাকে লোকটা বলছ? আমি সম্রাট চাংকো। আমার সঙ্গে ফাজলামি? যাও তোমাকে বল দিতুম, আর দিচ্ছি না।”
বললুম, “সম্রাটবাহাদুর, আপনার আর এক অতিথি কোথায়?”
সম্রাট চাংকো চোখ পাকিয়ে বললেন, “অতিথি? সে তো আমার বন্দী। তাকে প্রথম ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে নোংরা জায়গা থেকে ধরে এনেছি।”
“কেন সম্রাটবাহাদুর?”
“আমার বন্ধুর নাতি তাকে একটা বল বেচতে চেয়েছিল। সে তাচ্ছিল্য করে কেনেনি। ছাদে দাঁড়িয়ে দূরবীনযন্ত্রে আমি সব দেখেছি। ওকে পরীক্ষার জন্য বলটা ওর বাড়িতে পর্যন্ত পাঠিয়েছিলুম। সেই বলকে সম্মানে পুজো না করে সে এই হোঁতকা পালোয়ানের মাথায় চাপিয়ে এক দাড়িওলা বুডোর বাড়ি নিয়ে গেল। ওঃ! অসহ্য, বড় অসহ্য অপমান!” এই বলে সম্রাট চাংকো দাঁত কিড়মিড় করতে থাকলেন।
জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার বন্ধুর নাম?”
“ঐরাবত সিং। প্রথম ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে নোংরা গ্রহে তার জন্ম।”
“পৃথিবী সত্যিই বড় নোংরা গ্রহ, সম্রাটবাহাদুর!”
সম্রাট চাংকো আমার কাঁধে হাত রেখে চুপিচুপি বললেন, “কাউকে বোলো না! আমার জন্মও সেখানে। রাগ করে পালিয়ে এসেছি। ছ্যা-ছ্যা! দিনরাত্তির ঝগড়াঝাটি, খুনোখুনি, দলাদলি। সামান্য স্বার্থের জন্য লড়াই। ঘেন্না ধরে গিয়েছিল হে! বিশেষ করে আমার বন্ধু ঐরাবত সিং-ওই যে কী বলে তোমাদের পৃথিবীতে, হুঁ, ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিল। হেরে গেল। তোমাদের ভালো করার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু কেন হারল জানো কি? তাকে কারচুপি করে হারিয়ে দিল। রাগে-দুঃখে বেচারা হার্টফেল করে মারা গেল। খবরটা পেলুম দেরিতে। তখন আমি কুমড়ো-মানুষদের গ্রহ সবে জয় করেছি।”
শোনামাত্র বলে ফেললুম, “কুমড়ো-মানুষদের গ্রহেই আমার তিন সঙ্গী এখন বন্দী। দয়া করে ওদের উদ্ধার করুন, ইওর এক্সেলেন্সি! তাদের মধ্যে আপনার বন্ধুর নাতিও আছেন।”
সম্রাট চাংকো হা-হা করে হেসে বললেন, “সবই জানি হে ছোকরা! আমার দূরবীনযন্ত্রে সবই দেখেছি। একটু অপেক্ষা করো। আমার বাহিনী পাঠিয়েছি সেখানে। তাদের নিয়ে আসবে।”
এমন সময় একজন বিকট চেহারার গোরিলা-মানুষের কাঁধে চেপে ভবেশবাবুর আবির্ভাব ঘটল। কাঁধ থেকে নেমে ভবেশবাবু আমাকে দেখতে পেলেন। অবাক হয়ে বললেন, “মশাইকে চেনা-চেনা ঠেকছে?”
পরিচয় দিয়ে বললুম, “আপনার ভাগনেকে একটু বুঝিয়ে বলুন, যেন সম্রাটবাহাদুরকে সম্মান দেখান। তা না হলে ওঁকে টিকটিকি হয়েই কাটাতে হবে।”
গোরিলা-মানুষটি ততক্ষণে লাফ দিয়ে দিয়ে পালোয়ানকে কাতুকুতু দিতে শুরু করেছে। কাতুকুতুর চোটে পালোয়ান হেসে অস্থির এবং সিলিং-এ বুক ঠেকিয়ে এদিক-ওদিক করে বেড়াচ্ছে। সম্রাট চাংকোও খুব হাসছেন। ভবেশবাবু দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “উপযুক্ত শাস্তি! পালোয়ানি দেখাবে বেপাড়ায়? নাও, বোঝে ঠ্যালা। আমি তোমাকে বাঁচাব না। তুমি হেসে মরো আর যাই করো। হতভাগা বুন্ধু!”
বললুম, “সম্রাটবাহাদুর! যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে। এবার ওঁকে রেহাই দিন।”
“তুমি বলছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। কথা দিচ্ছি, ও যাতে আর বেয়াদপি না করে আমি দেখব।”
সম্রাট চাংকো গোরিলা-মানুষটিকে অদ্ভুত ভাষায় বললেন, “হাম্বো জাম্বো কাম্বো।” তারপর আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা বল বের করলেন। গোরিলা-মানুষটি চলে গেল। তখন সম্রাট চাংকো পালোয়ানকে বললেন, “ওহে পালোয়ান! বল ছুঁড়ে দিচ্ছি। লুফে নিতে হবে। দেখি, তোমার হাতের তাক। না লুফতে পারলে আটকে থাকবে কিন্তু!”
পালোয়নের দিকে ফের দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তার মামা বললেন, “তোকে বলতুম ক্রিকেট খেলাটা শিখে নে! শিখলে কাজে লাগত।”
