নেমেই মনে হল কী একটা শক্তি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। তাই তক্ষুনি উপুড় হয়ে গিরগিটির মতো হাঁটতে থাকলুম। নীলচে রোদ্দুরে মায়াময় দেখাচ্ছে জায়গাটা। তবে বালি নেই, শক্ত পাথর। মাটিও চোখে পড়ল না। এখানে-ওখানে ন্যাড়া পাথরের স্তূপ। দূরে ও কাছে ছোট-বড় বিচিত্র গড়নের বিশাল ভাস্কর্যের মতো পাহাড়। পাথরের রং ঘন কালো।
হঠাৎ দেখি, সামনে একটা ক্রিকেট বলের সাইজের পাথর পড়ে আছে, কর্নেলের ঘরে যেমনটি দেখেছিলুম।
মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। পাথরটা হাতে নিলুম এবং উঠে দাঁড়ালুম। হুঁ, ঠিকই ধরেছি। এই পাথর নিয়ে দিব্যি দু’ঠ্যাঙে চলাফেরা করা যায়–স্বচ্ছন্দে মানুষের মতোই। মাধ্যাকর্ষণ এখানে কম। তাই পাথরটা খুব কাজের।
তা হলে কি সেই পাথর এখানকারই? তার চেয়ে বড় কথা, এটা কোন্ গ্রহ এবং পৃথিবী থেকে কত দূরে?
ভাবতে ভাবতে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছি, দেখি, খানিকটা দূরে একটা পাথরের চাইয়ের ওপাশে কালো লোমশ গোরিলার মতো একটা প্রাণী হেঁটে যাচ্ছে। তার মাথার চুলের সঙ্গে এমনি একটা পাথর বাঁধা। টিকিতে পূজারী ব্রাহ্মণ যেমন করে ফুল বেঁধে রাখেন।
কিন্তু এ তো সর্বনেশে ব্যাপার! যেখানে অমন সাঙ্ঘাতিক প্রাণীর বসবাস আছে, সেখানে চলাফেরা করা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ওই পেল্লায় গড়নের প্রাণীদের সঙ্গে এঁটে ওঠার মতো অস্ত্রও সঙ্গে নেই।
কিন্তু মানুষের স্বভাব অজানাকে জানা। আমি এই আদিম সহজাত স্বভাব থেকে নিষ্কৃতি পেলুম না। জায়গাটা ভালো করে দেখার জন্য সাবধানে পাথরের আড়ালে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলুম। তারপর দেখি, একশো গজ দূরে একটা টিলার গায়ে বিশাল চৌকো সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ দিয়ে গোরিলা-মানুষেরা যাতায়াত করছে। সবারই চুলের সঙ্গে এমনি পাথরের বল বাঁধা।
অনেকক্ষণ ধরে ঘাপটি মেরে বসে লক্ষ রাখলুম। একসময় দেখলুম, প্রকাণ্ড এক গোরিলা-মানুষ বেরিয়ে এসে একটা উঁচু চত্বরে দাঁড়াল। তার হাতেও একটা বল। বলটা সে ছুঁড়ে দিল আকাশের দিকে। তারপর হা-হা করে বিকট হেসে উঠল। আর সব গোরিলা-মানুষও হাসিতে যোগ দিল। কানে তালা ধরে গেল সেই তুমুল হাসির শব্দে। ওদিকে বলটা উধাও হয়ে গেল।
এবার আর-একজন গোরিলা-মানুষ চত্বরটায় উঠল। তার হাতেও একটা বল। সে বলটা ছুড়ল। কিন্তু বলটা আকাশে না গিয়ে সোজা একটা পাহাড়ের ওপর পড়ল। বেচারা কাঁচুমাচু মুখে নেমে গেল।
কিন্তু এ তো দেখছি যেন ডিসকাস ছোঁড়ার খেলা! তা হলে কি এদের এই খেলারই বল দৈবাৎ পৃথিবীতে গিয়ে পড়ে?
আনন্দে নেচে উঠলুম। আমাদের অভিযানের লক্ষ্য যদি হয় সেই ওজনদার বলের রহস্য উন্মোচন, তা হলে সেই কৃতিত্ব আমার বরাতে জুটে গেল। কিন্তু কৃতিত্ব নিয়ে এখন করবটা কী? কোন কিটো গ্রহে কর্নেলরা রয়ে গেলেন, আর কোথায় আমার প্রিয় পৃথিবী, আর কোথায় এই অজানা গ্রহ!
স্পেসশিপের কাছে ফিরে এলুম। যানটি এমন জায়গায় নেমেছে, প্রায় চারদিকেই প্রকাণ্ড সব পাথরের স্তূপ। তাই ওদের চোখে পড়বে না। কিন্তু দৈবাৎ কেউ যদি এদিকে এগিয়ে আসে?
এবার বিকট হল্লার শব্দ, মাঝে-মাঝে হা-হা-হা-হা প্রচণ্ড হাসির শব্দ ভেসে আসছে। সম্ভবত আজ ওদের খেলাধুলোর উৎসব চলেছে। তাই এদিকে কারও আসার চান্স কম। এই সুযোগে আরও কয়েকটা বল কুড়িয়ে স্পেসশিপে বোঝাই করা যাক।
এত কম মাধ্যাকর্ষণ, কাজেই গোটা ছয়েক বল কুড়িয়ে আনা কঠিন হল না। তারপর বোতাম টিপতে থাকলুম, আগের মতোই এলোপাথাড়ি। এতে কাজ হল। কঁকুনি দিয়ে স্পেসশিপ আকাশে উঠে পড়ল। কিন্তু তারপর টালমাটাল অবস্থা। বিমান ঝড়ের মধ্যে পড়লে যেমন হয়। ভিশনস্ক্রিনে ফুটে উঠল : ‘বেশি ভারী হয়ে গেছি। ওজন কমাও। নইলে বিপদ।
মনমরা হয়ে একটা দুটো তিনটে করে ছ’টা পাথর ছুঁড়ে ফেলার পর বাকি রইল আমার হাতেরটা। ভিশনস্ক্রিনে ফুটল : ‘আরও ওজন কমাও।
রাগ করে বললুম, “ধ্যাত্তেরি! তুমি যাই বলো, হাতেরটা ফেলছি না। এটা আমার আবিষ্কারের সাক্ষী!”
ভিশনস্ক্রিনে বারবার লাল হরফে ফুটে উঠতে থাকল : ‘বিপদ…বিপদ…বিপদ..
তারপর ঝাঁকুনি খেলুম। স্পেসশিপ নেমেছে। সেই গ্রহ বলেই মনে হচ্ছে। কারণ নীচে রোদ্দুর এবং কালো পাথুরে পারিপার্শ্বিক। আবার তা হলে গোরিলা-মানুষদের গ্রহেই ফিরে এলুম!
বলটা প্যান্টের পকেটে ভরে নেমে গেলুম সাবধানেই। একটা সমতল উপত্যকার মতো জায়গা। দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখছি, হঠাৎ কী-একটা এসে আমার ওপর পড়ল এবং হ্যাঁচকা টান। দেখলুম, ল্যাসো ছুঁড়ে কেউ আমাকে আটকেছে এবং টানছে। আমি পড়ে যাচ্ছি না, তার কারণ বোঝা সহজ। কিন্তু ল্যাসোটার অন্য প্রান্তে কিছু দেখা যাচ্ছে না। বহু দূর থেকে কেউ ল্যাসো ছুঁড়েছে। কম মাধ্যাকর্ষণের গ্রহে এটা সম্ভব। কিন্তু কে সে? কোনো গোরিলা-মানুষ হলে সত্যিই বিপদ। ভাষা না জানলে কাউকে কিছু বুঝিয়ে বলা কঠিন। ভাষা যে কী অসাধারণ জিনিস, এতক্ষণে মাথায় সেটা স্পষ্ট হল।
বন্দিদশায় চলেছি তো চলেছি। কতক্ষণ পরে দেখতে পেলুম, একটা ছোট্ট নদীর ধারে পাথরের চৌকো বাড়ি। বাড়ির সামনে, কী অবাক, আমার মতোই একটা মানুষ! তার হাতে ল্যাসোর ডগা। তার চেহারা বেজায় রাগী। মুখটা চিনাদের মতো। চিবুকে ছাগলদাড়ি। ঠোঁটের দু’ধার দু’চিলতে সূক্ষ্ম গোঁফ। পরনে আলখাল্লার মতো পোশাক। মাথায় চুঁচলো টুপি। টুপির ডগায় একই রকম একটা বল বসানো।
