একটু ইতস্তত করে বললুম, “এক কাজ করা যাক। চলুন না, দুজনে চুপিচুপি ওই বালির পাহাড়ের দিকে যাই। গিয়ে দেখি, আমার সঙ্গীদের কী অবস্থা হল। মানুষ হয়ে মানুষকে বাঁচানো কর্তব্য নয় কি? আমাদের রিস্কটা নেওয়া উচিত।”
গজকুমারবাবু বললেন, “চলুন। কিন্তু হাতে অন্তত একটা লাঠি-ফাটি থাকলে ভালো হত। এই আজগুবি মরুভূমিতে একটা ঝোঁপঝাড় পর্যন্ত নেই। দেখুন না, আপনাদের গাড়ির ভেতর রড-টড পান নাকি। যা হোক কিছু পেলেই চলবে। অগত্যা একটা হাতুড়ি কি ভ্রু ড্রাইভার। ছুরি থাকলে আরও ভালো। কুমড়ো-মানুষ বললেন। প্যাক করে পেটে ঢুকিয়ে দেব।”
উনি খ্যা-খ্যা করে হেসে উঠলেন। তবে যুক্তিটা মন্দ নয়। স্পেসশিপে ঢুকে চন্দ্ৰকান্তের সিটের পাশে সৌভাগ্যক্রমে টুলস-ব্যাগটা পেয়ে গেলুম। হাতুড়ি বা ছুরি নেই। নানা সাইজের ভ্রু-ড্রাইভার, প্লাস, আরও কতরকম টুকিটাকি জিনিস আছে। বুদ্ধি করে দুটো বড় সাইজের ক্রু-ড্রাইভার নিলুম।
দু’জনে এভাবে সশস্ত্র হয়ে বালির পাহাড়টার দিকে হাঁটতে থাকলুম। এতক্ষণে টের পেলুম, যে ঝাঁ-আঁ শব্দ তখন শুনেছি, তা এই বালির ভেতর থেকে উঠছে। বইতে পড়েছি, পৃথিবীর বহু মরুভূমিতে বালির ওপর চলাফেরা করলে অদ্ভুত সব শব্দ হয়। কোথাও কোথাও নাকি অর্কেস্ট্রাও শোনা যায়।
বালিতে হাঁটার সমস্যা আছে। দ্রুত এগনো যায় না। তাতে ক্রমাগত অস্বস্তিকর ঝাঁ-ঝাঁ ঝনঝন শব্দ। পাহাড়টা আন্দাজ শতিনেক ফুট উঁচু। কিন্তু যতবার উঠতে যাই, পা হড়কে গড়িয়ে পড়ি। দু’জনে অনেক খোঁজাখুঁজি করে অপেক্ষাকৃত শক্ত জায়গা পেলুম। সেখান দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। তারপর চোখে পড়ল, নীচে উপত্যকার মতো একটা জায়গা এবং সত্যিই স্বর্গোদ্যান বলা চলে।
উজ্জ্বল সবুজ গাছপালা, সুন্দর ঝিরঝিরে ঝরনাধারা এবং ওলটানো বিশাল বাটির মতো অসংখ্য রং-বেরঙের ঘর। ঝরনার ধারে একটা সবুজ ঘাসের মাঠ। মাঠে কুমড়ো-মানুষদের ভিড়। কিন্তু আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, আমার সঙ্গীদের ওরা ধরে নিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু বন্দী করে রাখেনি। তিনটে মোড়ার মতো গড়নের নিটোল রঙিন আসন দিয়েছে বসতে। তিনজনের হাতেই আধখানা প্রকাণ্ড ডিমের খোলার মতো পাত্র। ওঁরা তারিয়ে-তারিয়ে কিছু খাচ্ছেন। ধুন্ধু’র অবস্থা অন্যরকম। সে চিত হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। বুঝলুম, বেয়াদপি করেছিল। তার শাস্তি। কুমড়ো-মানুষরা নাচানাচি করছে। যেন রং-বেরঙের বড়-বড় বেলুন উড়ছে। গজকুমারবাবু ফিসফিস করে বললেন, চলুন, এরা খুব সজ্জন মনে হচ্ছে। আমার খুব খিদেও পেয়েছে।”
বললুম, “আগে বুঝে নিন, আপনাকে ওরা পছন্দ করছে কি না।”
গজকুমারবাবু ঔড্রাইভার নাচিয়ে বললেন, “বেগড়বাঁই করলে প্যাক করে ঢুকিয়ে দেব। চলে আসুন।”
বলে উনি উঠে দাঁড়ালেন। দু’হাত তুলে সাড়া দিয়ে ঢাল বেয়ে নেমে গেলেন। কুমড়ো-মানুষেরা থেমে গেল এবং এদিকে তাকাল। তারপর গজকুমারবাবুকে কর্নেলদের মতোই পায়ের তলায় ঢুকে নাচাতে-নাচাতে নিয়ে গেল!
দেখলুম, আমার বৃদ্ধ বন্ধু চোখে বাইনোকুলার তুললেন। তারপর হাত নেড়ে চলে যেতে ইশারা করলেন। খুব রাগ হল। আমাকে কেন হেনস্থা করা হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কুমড়ো-ব্যাটাচ্ছেলেরা আমাকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছে। অথচ গ্রাহ্য করছে না।
গোঁ ধরে ঢাল বেয়ে নামতে থাকলুম। খানিকটা নেমেছি, কয়েকটা খোকা কুমড়ো-মানুষ বাই-বাই করে ফুটবলের মতো এসে আমাকে ধাক্কা মারল। গড়িয়ে পড়ে গেলুম। তারপর যেই উঠে দাঁড়াই, অমনি বাঁই করে গায়ে পড়ে আর আছাড় খাই।
বুঝলুম, আমাকে যে-কোনো কারণেই হোক, এরা পছন্দ করেনি। রাগ করে ঢালে হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে ফিরে এলুম।
তাতেও রক্ষা নেই। বিচ্ছু খোকাগুলো উড়ে এসে দমাদ্দম গায়ে পড়ছে। ঠাসা বালিশের মতো জিনিস। তাই আঘাতটা গায়ে তত বাজছে না। কিন্তু আছাড় খাচ্ছি।
কী আর করা যাবে? অগত্যা স্পেসশিপে ফিরে এলুম। বালির ওপর হাঁটাহাঁটিতে খিদে পেয়েছে। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত নিশ্চয় সঙ্গে খাবার-দাবার এনেছেন। কিন্তু কোথায় তা? খোঁজাখুঁজি শুরু করলুম। একখানে ইংরেজিতে লেখা আছে : খিদে পেলে একটা ক্যাপসুল খান। না পেলে দুটো খান। তারপর একটা খান।
একটা ক্যাপসুল খেলুম। ফ্লাস্ক থেকে জল খেয়ে ঢেকুর তুলে আসনে হেলান দিলুম। এটা চন্দ্ৰকান্তের আসন। কী খেয়াল হল, বোতামগুলো টিপতে শুরু করলুম, হয়তো রাগের চোটে মরিয়া হয়েই। তারপর হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি।
এবং স্পেসশিপ আকাশে উঠে পড়েছে।
সর্বনাশ! যদি অনন্ত মহাকাশে চিরকাল ভেসে চলে? ভয় পেয়ে সামনে যে বোতাম দেখি, টিপে ধরি। তারপর এক চিররাত্রির দেশ। শুধু আকাশভরা তারা আর অন্ধকার। ভয়ে চোখ বুজে গেল।
কতক্ষণ পরে ফের ঝাঁকুনির চোটে খুলে দেখি, বাইরে নীলাভ আশ্চর্য আলো। আবার কোথায় এলুম কে জানে! দরজা খুলতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল সামনে ভিশনস্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ইংরেজিতে সতর্কবাণী : নামতে পারো। কিন্তু সাবধান, পৃথিবীর চেয়ে মাধ্যাকর্ষণ ৯০ শতাংশ কম। উড়ে যাওয়ার সুখ পাবে। তবে নামা কঠিন হবে। তাই বুকে হেঁটে চলবে।
কী বিপদ! আমি কি সরীসৃপ?
ব্যাপারটা খারাপ লাগছে এই ভেবে যে আমাকে কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন বড্ড বেশি হেনস্থা করতে চাইছে। কাগজের লোক হওয়ার জন্যই কি? গজকুমারবাবুর কথাটা মনে ধরল।
