হঠাৎ মনে হল, ধুন্ধুর এক কানে অফ করার সুইচ আছে যখন, অপর কানেও কি পালটা অন করার সুইচ নেই?
যেই কথাটি মাথায় আসা, ডান কানের সুইচটা টিপে দিলুম। অমনি ধুন্ধু ঝনঝন শব্দে উঠে দাঁড়াল। তারপর আমার দিকে ঘুরে একখানা স্যালুট ঠুকল। খুশি হয়ে বললুম, “হ্যালো ধুন্ধু! কনগ্রাচুলেশন!”
ধুন্ধু তার ধাতব কণ্ঠস্বরে বলল, “ট্রাও ট্রাও ট্রাও!”
এই রোবট-ভাষা আমি বুঝি না। ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বললুম। স্পেসশিপের কাছে গিয়ে দেখি, সে আমার ইশারা বুঝতেই পারেনি। বালির পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মরুক হতচ্ছাড়া! আমার তেষ্টা পেয়েছে, যা-সব আক্কেল গুড়ুম করা কাণ্ড ঘটল! স্পেসশিপে ঢুকে জলের ফ্লাক্স থেকে অনেকটা জল খেলুম। চন্দ্ৰকান্তের সিটে গিয়ে স্পেসশিপ চালানোর চেষ্টা করব নাকি?
এই ভেবে উঠতে যাচ্ছি, চোখে পড়ল ধুন্ধু দমাস-দমাস করে বালির পাহাড়টার দিকে হেঁটে চলেছে। রাগে গা জ্বালা করছিল। কিন্তু কী আর করা যায়? নিজের আসনে বসে সিগারেট ধরালুম। এখন আমি মরিয়া। বরাতে যা আছে ঘটুক।
কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ কী একটা শব্দ। দরজা খোলা ছিল বলেই কানে এল। তাকিয়ে দেখি, কী আশ্চর্য, একটা রোগা খেকুটে চেহারার মানুষ, হ্যাঁ, আমার মতোই মানুষ, অবাক চোখে স্পেসশিপটা দেখছে।
.
তিন
এমন সৃষ্টিছাড়া এক জায়গায় মানুষ দেখলে মানুষের মনে আনন্দ উপচে পড়ে। লাফ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বললুম, “নমস্কার, নমস্কার!”
মানুষটি চমকে উঠে দু’পা পিছিয়ে গেলেন। তারপর ভয়ে-ভয়ে বললেন, “আপনি মানুষ বটে তো?”
হাসতে হাসতে বললুম, “আপনার সন্দেহের কারণ? আমি জলজ্যান্ত মানুষ।”
“ওরে বাবা! জ্যান্ত বললেন নাকি?”
“হ্যাঁ। জ্যান্ত বইকি। আপনার মতোই জ্যান্ত।”
“উঁহু। আমি কিন্তু জ্যান্ত নই, মড়া।”
বড় রসিক লোক তো! হো-হো করে হেসে বললুম, “আপনার রসিকতায় বড় আনন্দ পেলুম। এতক্ষণ এই কুমড়ো-মানুষদের দেশে যা-সব কাণ্ড হল, বাপস্! আপনাকে দেখে ধাতস্থ হওয়া গেল। তা মশাইয়ের নাম?”
“আপনার নাম আগে শুনি।”
“জয়ন্ত চৌধুরী। স্পেশ্যাল রিপোর্টার। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা।”
“ওরে বাবা! এখানেও রিপোর্টার?” বলে ভদ্রলোক আরও সরে গেলেন। “আরে! আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন?”
“ভয় পাব না? মরেও রেহাই নেই দেখছি। পেছনে রিপোর্টার লেলিয়ে দিয়েছে।”
“মরে মানে?”
“হু, পৃথিবীতে মশাই, রিপোর্টারদের জ্বালাতেই হার্টফেল করেছি। ওঃ! প্রশ্নে-প্রশ্নে জেরবার। এই বল কোথায় পেলেন? কে দিল? কী ধাতুতে তৈরি? আমার…”
“বল?” সন্দিগ্ধ হয়ে বললুম, “মশাইয়ের নাম?”
“ঈশ্বর গজকুমার সিং।”
“গজকুমার সিং! আপনি…কী আশ্চর্য! আপনিই তো সেই আজব বল বিক্রি করতে গিয়েছিলেন ভবেশবাবুর দোকানে?” বলেই ওঁর চোখের দিকে তাকালুম। চোখ দুটি ট্যারা! তা হলে ইনি সত্যিই সেই লোকটা।
গজকুমারবাবু বিষণ্ণ মুখে বললেন, “আর বলবেন না! বলটা আমার ঠাকুরদা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই থেকে আমাদের বিহার মুলুকের বাড়িতে ছিল। খুলে বলছি মশাই, আমি একজন রেসুড়ে। আগামী শনিবার একটা ঘোড়ার ওপর মোটা দান ধরব ভেবে ওটা বাড়ি থেকে মেসে এনে রেখেছিলুম। তারপর বেচতে যদি গেলুম, বিক্রি হল না। ফেরার পথে কী করে খবর হল কে জানে, আঁকে-ঝাঁকে খবরের কাগজের রিপোর্টার ঘিরে ধরল। প্রাণে মারা পড়লুম।”
“বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি এখানে কী করে এলেন?”
গজকুমারবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “তা তো জানি না। শুধু জানি, আমি মরে গেছি। তারপর একটু আগে চোখ খুলে দেখি, ওইখানে বালির ওপর শুয়ে আছি। উঠে বসলুম। তখন আপনার এই গাড়িটা চোখে পড়ল। চলে এলুম।”
“গজকুমারবাবু! সমস্ত ব্যাপারটা রহস্যময়। আমার ধারণা, আপনি সত্যি মারা পড়েননি। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ভুল করে আপনাকে মড়া ভেবে মর্গে ঢোকানো হয়েছিল। তারপর কেউ বা কারা আপনাকে এই কুমড়ো-মানুষদের গ্রহে পাঠিয়ে দিয়েছে!”
গজকুমারবাবু চিন্তিতভাবে বললেন, “যাগে! একটা সিগারেট দিন।”
সিগারেট দিলুম। উনি আরামে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ফের বললেন, “মরুভূমি তো। তাই বড্ড গরম। তা আপনি কী যেন বললেন, কুমড়ো-মানুষ না কি?”
“হ্যাঁ। এই গ্রহের নাম কিটো। এখানে অবিকল কুমড়োর মতো মানুষরা থাকে। তাদের হাত-পা নেই। গড়াতে-গড়াতে, লাফাতে-লাফাতে চলে। আমার তিন সঙ্গীকে তারা ধরে নিয়ে গেছে।”
“আপনাকে ধরে নিয়ে যায়নি কেন বলুন তো?”
“সেটাই তো ভাবছি।”
গজকুমারবাবু আমাকে খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, “আমার মনে হচ্ছে, ওরা কী করে টের পেয়েছে, আপনি কাগজের রিপোর্টার। তাই আপনাকে এড়িয়ে গেছে। আপনি প্রশ্নে-প্রশ্নে জেরবার করে হাঁড়ির খবর বের করবেন এবং জব্বর স্কুপ ঝাড়বেন। সেই ভয়েই আপনাকে ধরে নিয়ে যায়নি।”
“কিন্তু আপনাকে ধরে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কেন যায়নি?”
গজকুমারবাবু কঁচাপাকা চুল আঁকড়ে ধরে একটু ভাবলেন। তারপর খোঁচাখোঁচা গোঁফদাড়ি খুব করে চুলকে নিয়ে বললেন, “বালিতে বেজায় পিঁপড়ে। জ্বালা করছে। কুমড়ো-মানুষদের দেশে পিঁপড়েগুলোও একই গড়নের। গোটাকতক টিপে মেরেছি। …হ্যাঁ, আপনি একটা ভালো প্রশ্ন তুলেছেন, আমাকে ধরে নিয়ে যায়নি কেন? আমার মনে হচ্ছে, আমাকে যে বা যারা এখানে নিয়ে এসেছে, তাকে বা তাদের ওরা ভয় পায়। কিন্তু কথা হল, কে বা কারা আমাকে এখানে নিয়ে এল? আপনি ঠিকই বলেছেন জয়ন্তবাবু! সমস্ত ব্যাপারটাই রহস্যময়।”
