চমকে উঠে বললুম, “সেই কিটো গ্রহে এসে গেছি নাকি?”
চন্দ্রকান্ত খুশি-মুখে বললেন, “হ্যা! খামোকা ধুন্ধুকে দোষ দিচ্ছিলুম। ধুন্ধু দু’-দু’বার জার্ক না দিলেই বরং গতিপথ থেকে এক ডিগ্রি সরে যেতুম। ফলে কী হত জানেন? অনন্তকাল মহাকাশে ভেসে বেড়াতুম। কর্নেল! চলে আসুন। জয়ন্তবাবু! মিঃ হালদার! কুইক। ডিটেক্টরের কাঁটা সেই বলটার দিকে তাক করে আছে। আমরা সেদিকেই এবার যাব।”
কর্নেল আবার বাইনোকুলারে দূরে কিছু দেখছিলেন। বললেন, “যাওয়ার আগে কুমড়ো-মানুষদের একটা গ্রুপফোটো নিতে চাই চন্দ্রকান্তবাবু!”
“কুমড়ো-মানুষ!” বিজ্ঞানী অবাক হয়ে বললেন। “কই, কোথায়?”
“ওই দেখুন, দলবেঁধে গড়াতে গড়াতে আসছে।”
এবার ব্যাপারটা চোখে পড়ল। সেই বালির পাহাড় বেয়ে অন্তত শ’খানেক জ্যান্ত কুমড়ো গড়াতে-গড়াতে নামছিল। সমতলে নেমে এবার তারা গড়াতে-গড়াতে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। অবিকল প্রকাণ্ড ফুটবল মনে হচ্ছে। মাঝে-মাঝে কয়েকটা যেন কিক খেয়ে আকাশে উঠছে। আবার নেমে পড়ছে।
চন্দ্রকান্ত বললেন, “কী বিপদ! নাঃ, ধুন্ধুকে বের করি। কিছু বলা যায় না।”
তিনি স্পেসশিপের পেছনের খোপের দরজা খুলে দিলেন। শ্রীমান ধুন্ধুমার বেরিয়ে এসে আমাদের পাশে দাঁড়াল। হালদারমশাই তার কাছ ঘেঁষে রইলেন। চন্দ্রকান্তকে দেখলুম, হাতে মারাত্মক লেসার-পিস্তল নিয়েছেন।
কিন্তু আমার বৃদ্ধ বন্ধু ক্যামেরা তাক করে আছেন।
কুমড়ো-মানুষেরা আমাদের প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে এসে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল। নাঃ! দাঁড়াবে কী করে? ঠ্যাংই তো নেই। কাজেই থামল বলা ভালো। এই সময় লক্ষ করলুম, কেমন অদ্ভুত চাপা একটা ঝাঁ-আঁ শব্দ হচ্ছে। ওটাই কি ওদের ভাষা? ক্রমে চোখে পড়ল, ওদের মধ্যে নানা বয়সি কুমড়ো-মানুষ আছে। তারপর সবাই আমাদের জিভ দেখাতে থাকল।
হালদারমশাই খাপ্পা হয়ে বললেন, “অসভ্যতা দ্যাখছেন? মুখ ভ্যাঙায় কেমন!”
কর্নেল টেলিলেন্স ফিট করে কয়েকটা ছবি নিলেন। তারপর আমাদের অবাক করে সোজা এগিয়ে গেলেন ওদের দিকে। চন্দ্রকান্ত চেঁচিয়ে উঠলেন, “যাবেন না! যাবেন না!”
আমিও চেঁচিয়ে ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”
কর্নেল কান করলেন না। সেই আঁ-আঁ শব্দটা এখন থেমে গেছে। হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, “বিপদ বাধবে! ওই দ্যাখেন, কর্নেল-স্যারেরে চক্কর দিয়া ঘিরতাছে।”
কিন্তু এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও আমার হাসি পেল, যখন দেখলুম, কর্নেলও ওদের মতো জিভ বের করে অনবরত ভেংচি কাটার ভান করছেন।
তারপর সে এক বিচিত্র ব্যাপার। কুমড়ো-মানুষগুলো কর্নেলের ওপর এসে পড়ল। কেউ ওঁর কাঁধে, কেউ ওঁর মাথায় চড়ল। মাথারটি কর্নেলের টুপি খুলে নিজের মাথায় পরল এবং কর্নেলের চকচকে টাকে সেঁটে বসে রইল। একজন ওঁর দাড়িতে আটকে গেল। এবার আরও আজব দৃশ্য। সার্কাসে লোহার বলের ওপর পা রেখে বলটাকে গড়াতে-গড়াতে এগনো দেখেছি। কর্নেল কি সে-খেলাও জানেন? ওঁর পায়ের তলায় কয়েকটা কুমড়ো-মানুষ এবং উনি দিব্যি নাচার ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছেন। এদিকে ওঁর চারপাশে ওড়াউড়ি করছে আরও সব কুমড়ো-মানুষ। সম্ভবত বসার জুতসই জায়গা খুঁজছে।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ব্যস্তভাবে বললেন, “মনে হচ্ছে, কর্নেলকে ওরা বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। অসহ্য বেয়াদপি! ধুন্ধু। টুট টুট, ক্রুট ক্রুট!”
ধুন্ধু বালির ওপর দমাস-দমাস পা ফেলে এগিয়ে গেল। ওকে পেছনে দেখামাত্র কুমড়ো-মানুষের একটা দঙ্গল কঁ-আঁ শব্দে তেড়ে এল। ধুন্ধু’র ওপর তারা প্রকাণ্ড ঢিলের মতো পড়তে থাকল। ধুন্ধু টাল সামলে নিয়ে খপ করে একটাকে ধরে দূরে ছুঁড়ে ফেলল।
কিন্তু তার কিছুই হল না। সে আবার গড়াতে-গড়াতে এসে লাফ দিয়ে ধুন্ধুর একটা কানে এসে পড়ল। চন্দ্রকান্ত বললেন, “ওই যাঃ!”
দেখলুম, ধুন্ধু নেতিয়ে হাঁটু দুমড়ে ধরাশায়ী হল। চন্দ্রকান্ত বললেন, “বাঁ কানের নীচেই সুইচ। চাপ পড়লে ধুন্ধু ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে যায়।” বলে তিনি লেসার-পিস্তল উঁচিয়ে দৌড়ে গেলেন।
লেসার-পিস্তলের গুলিতে কোনো কাজ হল না। কুমড়ো-মানুষেরা কর্নেলের মতোই বিজ্ঞানী ভদ্রলোককে নাচাতে-নাচাতে নিয়ে চলল। উনি পেছন ফিরে চেঁচিয়ে কিছু বললেন। বোঝা গেল না।
হালদারমশাই ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, “কোনো মানে হয়? ব্যাটাচ্ছেলেরা…”
ওঁর কথা থেমে গেল। আমাদের পেছনে স্পেসশিপ। তার আড়ালে কখন একদঙ্গল কুমড়ো-মানুষ এসে লুকিয়ে ছিল টের পাইনি। আচমকা তারা এসে হালদারমশাইকে ঘিরে ফেলল এবং তারপর একই দৃশ্য দেখতে পেলুম। ঢ্যাঙা গোয়েন্দাপ্রবর নাচতে-নাচতে চলেছেন আর চাঁচাচ্ছেন, “জয়ন্তবাবু! জয়ন্তবাবু! বাঁচান, বাঁচান!”
কিন্তু আমার দিকে কুমড়ো-মানুষদের লক্ষ নেই কেন? একা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম। এ তো ভারি অপমানজনক ব্যাপার! আমাকে ওরা বন্দী করল না, গ্রাহ্যই করল না! আমি কি এতই ফেলনা? আঁতে বড্ড ঘা লাগছিল এবং অভিমান হচ্ছিল।
আর-এক আশ্চর্য ব্যাপার, সূর্য যেখানকার সেখানেই আছে। এ কি তা হলে এক চির-বিকেলের দেশ? সোনালি বালির ওপর নরম গোলাপি রোদ্দুর। একটু ভ্যাপসা গরম আছে, এই যা। একটুও বাতাস বইছে না। কুমড়ো-মানুষেরা তিন বন্দীকে নিয়ে বালির পাহাড় পেরিয়ে উধাও হয়ে গেলে ধুন্ধুর কাছে গেলুম।
