হালদারমশাই ভয়ে-ভয়ে ঘুরে ধুন্ধু’র চিবুকে ঠোনা মেরে আদর করলেন, “লক্ষ্মীসোনা!”
চন্দ্রকান্ত বললেন, “আমরা উড়ছি। রেডি!”
একটা ঝাঁকুনি লাগল। তারপর কাঁচের জানালা দিয়ে দেখলুম, নীচের অজস্র আলোর ফুটকি দেখতে-দেখতে মিলিয়ে গেল। হালদারমশাই ফিসফিস করে বললেন, “আচ্ছা জয়ন্তবাবু! আমাদের স্পেসসুট পরালেন না তো সায়েন্টিস্টমশাই! আমার কেমন যেন ঠেকছে!”
চন্দ্রকান্ত তা শুনতে পেয়ে সহাস্যে বললেন, “এই শর্মার সেটাই কৃতিত্ব মিঃ হালদার। স্পেসসুট-টুট সবই প্রিমিটিভ করে ফেলেছি। কত কিলোমিটার বেগে যাচ্ছি, জানেন? সেকেন্ডে দু’হাজার মাইল। ওই দেখুন, সূর্য ঝলমল করছে।”
হালদারমশাই বললেন, “কিন্তু রোদ্র কোথায়? আকাশই বা এত কালো কেন? ধুস!”
তিনি নস্যি নিলেন। অমনি ধুন্ধু পিছন থেকে মুণ্ডু এগিয়ে দিল। হালদারমশাই খি-খি হেসে তার নাকে খানিকটা নস্যি গুঁজে দিলেন। ধুন্ধু নস্যির চোটে ধাতব হাঁচি হাঁচতে হাঁচতে কাত হয়ে পড়ল। চন্দ্রকান্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, “মিঃ হালদার! কেলেঙ্কারি করবেন দেখছি। ধুন্ধু’র নড়াচড়ায় স্পেসশিপ ব্যালান্স হারালেই…এই রে! সর্বনাশ!”
হালদারমশাই প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “ক্কী? কী? কী?”
চন্দ্রকান্ত খুটখুট শব্দে বোম টেপাটেপি করতে করতে বললেন, “গতিপথ বদলে গেছে। আপনি মশাই বড্ড ঝামেলা বাধান! এই রে! আমরা কোথায় চলেছি কে জানে?”
কর্নেল চুপচাপ নির্বিকার মুখে চুরুট টানছেন। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলুম। বললুম, “চন্দ্রকান্তবাবু, অ্যাসিডেন্ট হবে না তো?”
“হবে কী মশাই? হয়ে গেছে।” বিজ্ঞানী তেতো মুখে বললেন, “আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছি।”
“কিন্তু স্পেসশিপ ভেঙে পড়বে না তো?”
“দেখা যাক।”
আরও ভয় পেয়ে হালদারমশাইয়ের দিকে তাকালুম। উনি মুখ চুন করে বসে আছেন। বললুম, “এবার কী হবে ভাবুন তো হালদারমশাই!”
গোয়েন্দা ভদ্রলোক বললেন, “হঃ। ভাবতাছি। তবে আমারে দোষ দেবেন না য্যান। ওই পাজি হতচ্ছাড়া নাক বাড়াইয়া…”
উনি থেমে গেলেন। ধুন্ধু আবার নাক বাড়িয়েছে ওঁর কাঁধের ওপর দিয়ে। বিজ্ঞানী টের পেয়ে ধমকে দিলেন, “ধুন্ধু! ট্রাট ট্রাট ট্রাট!”
ওটা নিশ্চয় সাঙ্কেতিক ভাষা। ধুন্ধু ধাতব স্বরে বলল, “ক্রাট ক্রাট ক্রাট!”
“ক্রিও ক্রিও ক্রিও!” হুঙ্কার দিলেন বিজ্ঞানী।
ধুন্ধু তার চৌকো থাবা দিয়ে হালদারমশাইয়ের কাধ আঁকড়ে ধরল। কর্নেল বললেন, “নস্যি হালদারমশাই! ধুন্ধু নস্যির মজা টের পেয়েছে। না পেলে আপনার কাঁধের হাড় ভেঙে দেবে। শিগগির!”
হালদারমশাই দ্রুত নস্যির কৌটো বের করে বাকি নস্যির সবটাই ধুন্ধু’র নাকে খুঁজে দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হল ধুন্ধু’র বিকট হাঁচি এবং হাঁচতে হাঁচতে সে এমন নড়তে থাকল, স্পেসশিপ বেজায় ঝাঁকুনি খাচ্ছিল। চন্দ্রকান্ত হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, “ইমপসিবল! নিন! কোথায় নামছেন, দেখুন আপনারা।”
নীচে রোদে ঝকমকে সোনালি বালি। যতদূর চোখ যায়, শুধু বালি। অসমতল, কোথাও সমতল বালির বিস্তার। কাছে ও দূরে বালিরই পাহাড়। জায়গাটা মরুভূমি তাতে সন্দেহ নেই। প্রচণ্ড বালি উড়িয়ে স্পেসশিপ অবশ্য নিরাপদে থামল। কর্নেল দরজা খুলে নেমেই বললেন, “বাঃ! অসাধারণ।”
তারপর উনি যথারীতি চোখে বাইনোকুলার তুলে চারদিক দেখতে থাকলেন। আমি আর হালদারমশাই দরজা খুলে নেমে গেলুম। ঘড়ি দেখে অবাক। সাতটা চল্লিশ বাজে! তার মানে দশ মিনিটের জার্নি। ঘড়িতে একই তারিখ যে। সাধারণ জ্ঞানে বুঝলুম, আমরা নিশ্চয় পশ্চিম দিকে সূর্যের পেছন-পেছন ছুটে এসেছি। তাই এখন বিকেলের দেখা পাচ্ছি এখানে। কিন্তু কী বিচ্ছিরি গরম!
হালদারমশাইয়ের দোষেই মহাকাশযাত্রা ব্যর্থ এবং পৃথিবীর কোনো সৃষ্টিছাড়া মরুভূমিতে এসে পড়েছি। হালদারমশাইকে সম্ভবত সেজন্যই কাতর দেখাচ্ছে। তাই ওঁকে সান্ত্বনা দিতে বললুম, “সত্যি বলতে কী, আমার আনন্দ হচ্ছে জানেন হালদারমশাই? কোন্ উদ্ভুট্টে গ্রহে গিয়ে কী বিপদে পড়তুম কে জানে। তার চেয়ে এটা বরং ভালোই হল।”
হালদারমশাই কিন্তু বেজার মুখে বললেন, “হঃ! ভালোই হল! মরুভূমিতে আইয়া পড়ছি। এখন বেদুইন ডাকাতগুলি আইয়া পড়লেই গেছি!”
“আপনি বেদুইনের কথা ভাবছেন কেন? এটা মেক্সিকোর মরুভূমিও হতে পারে।”
হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, “আমি ডিটেকটিভ, ডোন্ট ফরগেট দ্যাট। নামবার সময় গম্বুজওয়ালা ঘর দেখছিলাম একখানে। আরবের ড্যাজার্ট না হইয়া যায় না।”
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, “হুঁ, ‘ড্যাজার্টে’ অনেক হ্যাজার্ড আছে মনে হচ্ছে হালদারমশাই!”
“ক্যান, ক্যান?” হালদারমশাই তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“ওইদিকে বালির পাহাড়ের মাথায় একটা বেঁটে লোক দেখলুম। গোল কুমড়োর গায়ে নাক-মুখ-চোখ এঁকে দিলে যেমন দেখায়, তেমনি চেহারা। লোকটার হাত-পা কিছু নেই। দিব্যি গড়াতে গড়াতে ওধারে উধাও হয়ে গেল। কুমড়ো-মানুষের দেশে এসে পড়েছি আমরা।”
রসিকতা করছেন ভেবে একটু হেসে বললুম, “কুমড়োপটাশের দেশে বলুন!”
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘হাসির কথা নয়, ডার্লিং! মনে হল, কুমড়ো-মানুষটা বসতিতে খবর দিতে গেল।” বলে ডাকলেন, “চন্দ্রকান্তবাবু! নেমে আসুন।”
বিজ্ঞানী স্পেসশিপের ভেতর বসে কীসব করছিলেন। তড়াক করে নেমে এসে বললেন, “আশ্চর্য কর্নেল, খুবই আশ্চর্য! আমরা পথভ্রষ্ট হইনি। সঠিক জায়গায় পৌঁছেছি।”
