পরমেশ এখানকার এক বাঙালি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে নৌকার ব্যবস্থা করে ফেললেন। পরদিন সকালে আমরা দু-জন যাব। কর্নেল বা আর কাউকে জানাব না, পাছে বাগড়া দেন ওঁরা।
কিন্তু আমাদের ভাগ্যে জারোয়া যাওয়া আর হলো না। সেই রাতেই দেড়টার সময় ঘুম থেকে তুলিয়ে কর্নেল বললেন, শার্ক এসে গেছে। এক্ষুনি বেরুতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পিঠে বোঁচকাকুঁচকি বেঁধে পায়ে হেঁটে আমরা চারজনে প্রথমে ডক এলাকায় গেলুম। শার্কের একজন লোক আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল। ডক এলাকার ধারে-ধারে মাইলটাক গিয়ে মেছো জেটির কাছে পৌঁছলুম। ওদিকটায় আলো খুব কম। মাছের আঁশটে গন্ধে গা ঘুলিয়ে যাচ্ছিল। জায়গায়-জায়গায় কাদায় পা ড়ুবে যাচ্ছিল। তারপর একবারে অন্ধকার চারিদিক। খালি গর্জন শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের। পাথরে খাড়ির মধ্যে শার্ক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু মাস্তুলের মাথায় একটু আলো জুগ জুগ করছে। আমাদের পথ-প্রদর্শক এবার টর্চ জ্বেলে আমাদের একটা ছোট্ট বোটে ওঠাল। খাড়ির মধ্যে প্রচণ্ড ঢেউ। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে, আমরা জলে তলিয়ে যাব। ঢেউয়ের ঝাপটায় প্রায় ভিজে গেলুম সবাই। নোনা জলের কুচ্ছিত গন্ধ আর মাঝে মাঝে মুখে ঝাপটা মারা জল এসে ঢুকছে। ব্যাপারটা বড্ড বিরক্তিকর।
তবে মিনিট দশেক এই লাঞ্ছনা পোহাতে হল। আমরা দড়ির সিঁড়ি বেয়ে শার্কে উঠে পড়লুম।
শার্কেই গোপনে কলকাতা থেকে আমাদের রাইফেলের বাক্সটা এসেছে। মোটমাট চারটে রাইফেল আর অজস্র গুলি আনা হয়েছে। ডিনামাইট, গ্রেনেডও আনা হয়েছে। তাছাড়া চারটে রিভলভার আমাদের কাছেই আছে, শুধু গড়গড়ি সায়েবের কোনও অস্ত্র নেই। উনি বেজায় অহিংস মানুষ। নিরামিষ খান। অস্ত্রশস্ত্র দেখে আঁতকে উঠে বললেন—ওরে বাবা! এ যে যুদ্ধের আয়োজন!
পরমেশবাবু মুচকি হেসে বললেন- বরং নৃসিংহবধ পালা বলতে পারেন।
ডঃ গড়গড়ি মনমরা হয়ে গেলেন। বললেন—রক্ষে করুন মশাই। গোলাগুলির মধ্যে আমি নেই।
আমি বললুম—কিন্তু নৃসিংহ ঠেকাবেন কী দিয়ে?
ডঃ গড়গড়ি বললেন—এই বিদঘুটে জন্তুটাকে ঘাঁটানোর কী দরকার? জানেন? আমি ওবারেও পইপই করে বলেছিলুম, ওটাকে এড়িয়ে যে যা কাজ করতে এসেছেন করুন। আমি পুরাতাত্ত্বিক জিনিস কিছু পাই নাকি খুঁজি। ডঃ গুটেনবার্গ উদ্ভিদের খবরাখবর জোগাড় করুন। প্রত্যেককে বলেছি এমন কথা। কেউ কান দিলেন না। জন্তুটার গুহার কাছে গিয়ে বেমক্কা গণ্ডগোল বাধিয়ে ছাড়লেন। প্রাণ তো গেলই, কাজ ভণ্ডুল হল—সেটাই বড় কথা কি না বলুন?
কর্নেল বললেন—কিন্তু ডঃ গড়গড়ি, নৃসিংহকে না ঘটালে তার রহস্য কীভাবে ভেদ করতেন বলুন? ডঃ গড়গড়ি বললেন—সেটাই খুঁজে বের করুন। ওকে না ঘাঁটিয়ে…
বাধা দিয়ে ডঃ গুটেনবার্গ ইংরেজিতে বললেন—ভাববেন না ডঃ গড়গড়ি। প্রাণীটাকে এবার আমরা বন্দি করে ফেলব কৌশলে। সে আক্রমণের কোনও সুযোগই পাবে না।
—তা পারলে ভালই হয় কিন্তু আমার বিশ্বাস, ও কাজ মানুষের সাধ্য নয়। বলে ডঃ গড়গড়ি হঠাৎ মাতালের মতো টলতে টলতে আর্তনাদ করে উঠলেন—এ কী! এ কী! সমুদ্রে ভূমিকম্প হচ্ছে যে।
আমরা হেসে উঠলুম। কর্নেল বললেন—না ডঃ গড়গড়ি! জাহাজ চলতে শুরু করেছে।
আমরা খোলের মধ্যে একটা সুন্দর আরামদায়ক ঘরে আছি। শার্কের পাঞ্জাবি মালিক জগদীপ সিং এতক্ষণে আলাপ করতে এলেন। তারপর কফি এল। কফি খেতে খেতে হঠাৎ ডঃ গড়গড়ি বলে উঠলেন—আপনাদের একটা কথা এবার বলা কর্তব্য, যা এ যাবৎ বলিনি। টোরাদ্বীপে গিয়ে আমি প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের এক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করেছি। তাই আমার উদ্দেশ্য নৃসিংহ রহস্য ভেদ নয়, সেই সভ্যতার আরও নিদর্শন সংগ্রহ। পৃথিবীকে আমি চমকে দিতে চাই—সুমের মিশর বা মহেনজোদারোর প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে আরও পুরনো এক সভ্যতা আমি আবিষ্কার করেছি, যা থেকে প্রমাণিত হবে যে স্থলচর মানুষরা নয়, জলচর মানুষই প্রথম সভ্যতার জনক। রথ নয়, জলযানই প্রথম সভ্যতা বহনকারী।…
মনে মনে বললুম—তাই করুন। সেজন্যেই আপনার মতো রোগা-পটকা লোকের এত উৎসাহ!
ঘটনার ঘোরপ্যাঁচে
আমাদের খোলের মধ্যে প্রায় বন্দির মতো রেখে শার্ক পরদিন মাছ ধরে বেড়াল এখানে ওখানে। তারপর যেন মাছ ধরার উদ্দেশ্যেই চলেছে, এমন ভাব দেখিয়ে জাহাজটা সন্ধ্যানাগাদ টোরাদ্বীপ থেকে তিন মাইলের মধ্যে পৌঁছুল। সেখানে দ্বীপের মতো সমুদ্র থেকে কয়েকটা পাহাড় যেন আচমকা মাথা তুলেই রয়ে গেছে, আর ডোবেনি। ওই এলাকায় কোনও জাহাজ যায় না। খুব বিপজ্জনক এলাকা। প্রচুর ড়ুবোপাহাড় রয়েছে। একটা পুরনো আমলের পোড়ো লাইটহাউসও দেখা যাচ্ছিল। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় একটা মাথা তোলা পাহাড় থেকে নিরাপদ দূরত্বে শার্ক নোঙর ফেলল। এখানে প্রচুর মাছ আছে নাকি। তবে হাঙরও বড় কম নেই।
সারারাত এখানে কাটল। ভোরবেলা ঘন কুয়াশায় সমুদ্র ও আকাশ একাকার। তার মধ্যে আমাদের ছোট্ট বোট রওনা দিল টোরাদ্বীপের দিকে। শার্কের নাবিকরা খুব অভিজ্ঞ এবং দক্ষ মানুষ। কেরলের লোক। কুয়াশার মধ্যে ড়ুবোপাহাড় বাঁচিয়ে কীভাবে যে আমাদের টোরাদ্বীপে পৌঁছে দিল, আশ্চর্য ব্যাপার। তবে সমুদ্র এখন শান্ত। তাই বিশেষ নাকানি চোবানি খেতে হল না।
ভারত মহাসাগরের এই এলাকাটা নিরক্ষরেখার কাছাকাছি। তাই শীত ক্রমশ কমে গেছে। আরও দক্ষিণে নিরক্ষরেখা ছাড়িয়ে গেলে আবহাওয়া একেবারে উল্টো। উত্তর গোলার্ধে যখন শীত, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্মকাল। কাজেই টোরাদ্বীপে যেন চিরবসন্ত বিরাজ করছে।
