কর্নেলের বদলে বেরোলেন ছাগলাবতাররূপী মুরারিবাবু। বললেন, “একাশি।”
মিঃ হাটি আবার ভূমিকম্প-হাসি হাসতে লাগলেন।
চেঁচিয়ে বললুম, “কর্নেল কোথায় মুরারিবাবু?”
মুরারিবাবু মুখোশ খুলে বললেন, “তিনকড়িদাকে তিন-তিরেক্কে করে ফেলেছেন।” বলেই তারপর গর্তে ঢুকে গেলেন। ব্যাপারটা বোঝা গেল না।
দূরে সুড়ঙ্গের মুখের দিক থেকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে কল্যাণবাবুরা আসছেন দেখতে পেলুম। সঙ্গে কর্নেলও আছেন। কল্যাণবাবু তিনকড়িচন্দ্রের জামার কলার ধরে আছেন। সে ল্যাংচাচ্ছে। কাছে এসে কর্নেল বললেন, “একাশি! না–একাশীদেব। তালব্য শ-এ দীর্ঘ ঈ হবে। একটু বানানভুল আর কি!”
ওঁর হাতে একটা ছোট্ট পাথরের মূর্তি। মূর্তিটা তিন-শিঙে ছাগলের। বললুম, “এ কি?”
“ডার্লিং, এটা বিদেশে বেচতে পারলে কোটি টাকা পেতেন তিনকড়িবাবু। তোমাকে বলেছিলুম এক এবং আশি সন্ধি করে একাশি। ব্যাকরণ বা ব্যাকরণ রহস্য।” কর্নেল শিঙ তিনটে দেখিয়ে ব্যাখ্যা করলেন।”একে চন্দ্র-নামতা, জয়ন্ত! শিবের মাথায় চন্দ্র থাকে। মাঝখানেরটা আশী অর্থাৎ সাপ। আশীবিষ পুরো সাপ। এটা আসলে সাপের ফণার প্রতীক। শুধু ফণাটুকু, তাই আশী। ওকে শাস্ত্রে বলে কূটাভাস। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রাজা শিবসিংহের আমলে শিবের কূটাভাস তিন-শিঙে ছাগলে পরিণত হয়েছিল। পশুপতিদেব কিনা! মহেনজো-দরোর ঐতিহ্য, জয়ন্ত। শিবের মাথায় চন্দ্রকলা এবং মাঝখানে সাপের ফণা। সন্ধি করলে এক গ্লাস আশি সমান একাশি। ব্যাকরণ রহস্য। তবে ব্যাকরণ রহস্যই বলব। কারণ..”।
মুরারিবাবু হাঁফাতে-হাঁফাতে এসে বললেন, “কই, সোনার মোহরভর্তি ঘড়া?”
কর্নেল তাকে একাশীদেবের মূর্তিটা দেখিয়ে শুধু বললেন, “একাশী!”
রাগের চোটে মুরারিবাবু বিকট ব্যা-অ্যা-অ্যা’ করে ভেংচি কেটেই বুঝলেন, থানার বড়বাবু-মেজোবাবুদের সামনে বেয়াদপি হয়ে গেছে। টর্চ জ্বালতে জ্বালতে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। ব্যাকরণে আর রহস্য নেই, বুঝতে পেরেছেন মুরারিবাবু।
কর্নেল বললেন, “চলুন। থানায় গিয়ে এবার হালদারমশাইকে উদ্ধার করি।”
৪.২ আজব বলের রহস্য
“এক কিলো তুলো ভারী, না এক কিলো লোহা ভারী?” ষষ্ঠীচরণ ট্রে-তে কফি আর স্ন্যাক্স রেখে চলে যাচ্ছিল। এই বেমক্কা প্রশ্নে হকচকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল এবং ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, “আজ্ঞে বাবামশাই?”
তার বাবামশাই’ মানে, আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চোখ কটমটিয়ে বললেন, “এক কিলো তুলো আর এক কিলো লোহার মধ্যে কোনটা বেশি ভারী?”
ষষ্ঠী ফিক করে হেসে বলল, “নোহা।” সে সবসময় ‘ল’-কে নি’ এবং ‘ন’-কে ‘ল’ করে ফেলে।
আমি হোহো করে হেসে ফেললুম। ষষ্ঠী গাল চুলকোতে-চুলকোতে সম্ভবত ভুলটা খোঁজার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আমাকে অবাক করে কর্নেল বললেন, “ঠিক বলেছিস। বকশিস পাবি।”
ষষ্ঠী খুশি হয়ে চলে গেল। কর্নেল পেয়ালায় কফি ঢালতে থাকলেন। মুখে সিরিয়াস ভাবভঙ্গি। আমি একটু ধাঁধায় পড়ে গেলুম। কর্নেল আমার হাতে কফির পেয়ালা তুলে দিয়ে বলল, “ষষ্ঠী কিন্তু ঠিক বলেনি।”
“বলেছে।”কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “তুমি কী বলতে চাইছ জানি, জয়ন্ত। এ-ধরনের প্রশ্নকে আগের দিনে বলা হত ‘জামাই-ঠকানো প্রশ্ন’! এক কিলো তুলো আর এক কিলো লোহা। দুটোরই ওজন যখন এক, তখন একটা আর-একটার চেয়ে ভারী হতে পারে না। ঠিক কথা। কিন্তু সত্যিই তুলোর চেয়ে লোহা অনেক ভারী জিনিস। আয়তন ডার্লিং, আয়তন! তুমি আয়তনের কথাটা ভুলে যাচ্ছ। আমরা যখন কোনো বস্তুকে দেখি, আগে সেটার আয়তনই চোখে পড়ে। এক কিলো তুলোর যা আয়তন, তা যদি লোহার হয়, তা হলে লোহাটাই বেশি ভারী নয় কি?”
বিরক্ত হয়ে বললুম, “কিন্তু ভারী বলতে তো ওজনই বোঝায়।”
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, “। তবে ভুলে যাচ্ছ, আমরা আয়তন বাদ দিয়ে কোনো বস্তুকেই কল্পনা করতে পারি না। একটু তলিয়ে ভাবা দরকার জয়ন্ত! বস্তুর যেমন ওজন আছে, তেমনই আয়তনও আছে।”
“আপনার যুক্তির মাথামুণ্ডু নেই। আমি দুঃখিত।”
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে বললেন, “আচ্ছা জয়ন্ত, সমান আয়তনের কোনো ধাতু, ধরো, একটা ক্রিকেটবলের সাইজ লোহা, সোনা আর সিসের মধ্যে কোনটা বেশি ভারী?”
একটু ভেবে বললুম, “সম্ভবত সোনা।”
“হুঁ, সোনা। আমরা সচরাচর যেসব জিনিস হাতে নাড়াঘাটা করে থাকি বা মোটামুটিভাবে হাতের কাছে পাই, তাদের মধ্যে সোনা সবচেয়ে ভারী এবং সেটা আয়তনের দিক থেকে।” বলে কর্নেল হেলান দিলেন এবং চোখ বন্ধ। সাদা দাড়ি এবং চওড়া টাকে বাঁ হাতটা পর্যায়ক্রমে বুলোতে থাকলেন। এটা ওঁর চিন্তাভাবনার লক্ষণ।
বললুম, “ব্যাপারটা কী? আজ সকালবেলায় হঠাৎ এসব নিয়ে মাথাব্যথার কারণ কী বুঝতে পারছি না।”
কর্নেল একই অবস্থায় থেকে বললেন, “ওই শোনো ডার্লিং! দোতলায় লিন্ডার প্রিয় কুকুর রেক্সি চেঁচামেচি জুড়েছে। সিঁড়িতে ধুপধুপ ভারী পায়ের শব্দ। এবার কলিং বেল বাজাটা অনিবার্য।” বলে হাঁকলেন, “ষষ্ঠী!” এবং চোখ খুলে সিধে হয়ে বসলেন।
সত্যিই কলিং বেল বাজল। ষষ্ঠীর দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। তারপর কর্নেলের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িংরুমে দু’টি মূর্তির আবির্ভাব ঘটল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম।
