কর্নেল হাসলেন। “সেজন্যই অনেক পাথরের ইট ওপড়াতে হবে তিনকড়িচন্দ্রকে। শাবল দিয়ে ইট ওপড়াতে শব্দ হবে। রাত বারোটায় অমাবস্যায় আজ পুজোর ধুম। ঢাক বাজবে প্রচুর। ঢাকের শব্দে শাবলের শব্দ চাপা পড়বে।”
রাত সাড়ে এগারোটায় থানা-পুলিশের জিপ আমাদের হাইওয়ের বটতলায় পৌঁছে দিল। সঙ্গে সেই দত্যিদানোর মতো প্রকাণ্ড মানুষ অফিসার-ইন-চার্জ মিঃ হাটি। পুলিশের দারোগা না হলে হাতিমশাই বলা যেত। তিনি ভূমিকম্প-হাসি হাসছিলেন না। সম্ভবত ডিউটিতে আছেন বলেই। নয়তো খানতিনেক হাসলেই দেউড়ি ধসে পড়ত। কিন্তু রাত বারোটা বাজতেই চায় না। গুমোট গরম আর স্তব্ধতা। এ-রাতে বাতাস বন্ধ। ঝোঁপের আড়ালে আমরা বসে সময় গুনছি, কখন মন্দিরে বলির ঢাক বেজে উঠবে অমাবস্যার লগ্নে। সামনে আকাশের নক্ষত্রের ওপর একটা কালো ছায়া, ওটাই ভাঙা দেউড়ি।
একসময় মন্দিরের দিকে হঠাৎ তুমুল ঢাক বেজে উঠল। ভক্তদের জয়ধ্বনি শোনা গেল। ঝোঁপঝাড়-ধ্বংসস্তূপের ফোকর গলিয়ে মাঝেসাঝে আলোর ঝিলিমিলি। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন “মশাল-নৃত্য!”
তারপর চোখে পড়ল কালো তোরণের ওপর কয়েকটা ছায়ামূর্তি নড়াচড়া করছে। মিঃ হাটি ফেস-ফোঁস শব্দে বললেন, “এসে গেছে। কখন আসামি ধরতে হবে, জানিয়ে দেবেন।”
কর্নেল তেমনই চাপা স্বরে বললেন, “মিঃ হাটি, এবার আসুন আমরা সুড়ঙ্গের মুখে গিয়ে অপেক্ষা করি। ওরা কাজে নামুক। বেরনোর সময় মালসুন্ধু আসামি ধরবেন।”
তিনজনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলুম। মিঃ হাটির পায়ের শব্দ নেই, যেন শূন্যে হাঁটছেন। বুঝলুম পুলিশ ট্রেনিং। আমার পা বারবার শুকনো লতাপাতায় পড়ে মচমচ শব্দ উঠছে। • কর্নেলের এ-তল্লাট নখদর্পণে, এমন করে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন ঘুরঘুট্টে অন্ধকারে। কিছুক্ষণ পরে যেখানে থামতে হল, সেটা একটা ভাঙা বাড়ি। মনে পড়ল, এর মেঝেতে ঝোঁপের ভেতর সুড়ঙ্গের দরজা রয়েছে। হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, “এই রে, মুরারিবাবু মনে হচ্ছে!”
একটু দূরে টর্চের আলো জ্বলে উঠতে দেখলুম। পায়ের কাছে আলো ফেলতে ফেলতে কেউ এগিয়ে আসছে এদিকে। মিঃ হাটি বললেন, “পাগলাটাকে সামলানো দরকার।”
কর্নেল বললেন, “উনি তিন-শিঙে ছাগলের মুখোশ পরেছেন দেখা যাচ্ছে। এক মিনিট! আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। এই নতুন প্ল্যানে মুরারিবাবুকে কাজে লাগাব।”
বলে উনি গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন। তারপর মুরারিবাবুর ওপর আচমকা টর্চের আলো ফেললেন। মুরারিবাবু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পালালেন না। বিচ্ছিরি, ব্যা-অ্যা’ ডেকে উঠলেন। কর্নেল টর্চ নিভিয়ে চাপা স্বরে বললেন, “চুপ!” বোঝা গেল, মুরারিবাবুর ব্যা-ডাক ভয় দেখাতেই। কিন্তু নিজেই ভয় পেলেন। তাঁর টর্চের আলো কর্নেলের ওপর পড়ল। তারপর খাক করে হেসে টর্চ নেভালেন। মহানন্দে বললেন, “বিট্টুর কাছে সুড়ঙ্গের দরজার খোঁজ পেয়েছি। সোনার মোহরের ঘড়া আনতে যাচ্ছি।”
“চুপ, চুপ! আস্তে!” কর্নেল বললেন, “শুনুন! আপনি সুড়ঙ্গের মুখে ঝোঁপের ভেতর শুধু মুণ্ডটা বের করে বসুন। আপনার তিনকড়িদা দলবল নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকেছেন। ওঁর ফেরার সময়
ব্যা-অ্যা করবেন। খুব শিঙ নাড়বেন কিন্তু!”
মুরারিবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “নাড়ব মানে? তিন-তিরেকে নয়, নয় নয়ে একাশিবার নাড়ব। আমার ঠাকুর্দার সোনার মোহরভর্তি ঘড়া!”
“আস্তে! থানার বড়বাবু আছেন, এই দেখুন। রেগে যাবেন।”
মুরারিবাবু শ্বাসের সঙ্গে বললেন, “ও! আচ্ছা!” তারপর ঝোঁপঝাড় ঠেলে বাড়ির ভাঙা দেওয়ালের পাশের ঝোঁপ ঠেলে ঢুকে পড়লেন। একবার টর্চ জ্বেলে জায়গাটা শনাক্ত করে নিলেন। সম্ভবত সুড়ঙ্গের মুখে চারঠেঙে প্রাণীর মতোই বসলেন।
কতক্ষণ কেটে গেল। তারপর মুরারিবাবু যেখানে ঢুকেছেন, সেখানে কয়েকবার আবছা টর্চের আলো ঝিলিক দিল। একটু পরে মুরারিবাবুর বিকট ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক শোনা গেল। অমনি কর্নেল বলে উঠলেন, “মিঃ হাটি, জয়ন্তকে নিয়ে আপনি দেউড়ির ওখানে যান। হুইসল বাজিয়ে আপনার লোকেদের ডাকুন গিয়ে।”
মিঃ হাটি এবার ভূমিকম্পের মতো মাটি কাঁপিয়ে হাঁটতে বা দৌড়তে থাকলেন। সেই সঙ্গে হুইসলও বাজতে থাকল। দেউড়ির দিকে ঝলকে ঝলকে টর্চের আলো, পাল্টা হুইসল, দুদ্দাড়, হুলুস্থুল। ঝড়, ভূমিকম্প হয়ে গেছে এমন তাণ্ডব! দেউড়ির মাথায় টর্চের আলো পড়েছে এদিক-ওদিক থেকে। সেই আলোয় দেখলুম, সেই ষণ্ডামার্কা মোটকু আর তার সঙ্গী ঝাঁপ দেবার তাল করছে। কিন্তু পারছে না। হাড়গোড় ভেঙে তো যাবেই, তার ওপর পুলিশের খপ্পরে পড়বে। মিঃ হাটি গর্জন করলেন, “খুলি ফুটো হয়ে যাবে। যেখানে আছ, তেমনই থাকো। কল্যাণবাবু!”
কল্যাণবাবুর সাড়া পাওয়া গেল। ‘ইয়েস স্যার!”
“ওদিকে যান। সুড়ঙ্গের মুখে পাগলাবাবু ওখানে আছে। তিন-শিঙে ছাগলের মুণ্ডু দেখে ভয় পাবেন না যেন।” বলে মিঃ হাটি সেই ভূমিকম্প-হাসি হাসলেন।
টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে কল্যাণবাবু একদল সেপাই নিয়ে ছুটে গেলেন। দেউড়ির মাথায় মোটকু এবং তার সঙ্গী এইসময় গর্তের দিকে ঝুঁকল। তারপরই “ও রে বাবা” বলে পিছিয়ে এসে মরিয়া হয়ে ঝাঁপ দিল। ঝাঁপ দিয়েই আর্তনাদ করে উঠল। ক’জন সেপাই গিয়ে ঘিরে ধরল তাদের। তারা আছাড়ের চোটে কাতরাতে থাকল। বেটনের গুতোও খাচ্ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। কিন্তু এদিকে আমি উদ্বিগ্ন। সুড়ঙ্গের ভেতর কর্নেল তিনকড়িচন্দ্রের সঙ্গে ট্রেনের কুপেতে যেমন ফিল্মি লড়াই লড়ছিলেন, তেমন কিছু ঘটছে না তো? টর্চের আলো দেউড়ির মাথায় ফেলে ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”
