একজন মাঝারি গড়নের ছিমছাম চেহারার প্রৌঢ় ভদ্রলোক। পরনে ধুতি ও সিল্কের পাঞ্জাবি। অন্যজন একেবারে দানো বললেই চলে। পেল্লায় গড়নের পালোয়ান। পরনে হাফপেন্টুল ও স্পোর্টিং গেঞ্জি। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। গলায় চাঁদির তক্তি। তার মাথায় একটা ছোট্ট চটের থলে, যে-ধরনের থলেতে বাজার করা হয়। থলের মুখটা দড়ি দিয়ে আঁটো করে বাঁধা আছে। পালোয়ান লোকটি দু’টি পেশিবহুল হাতে থলেটি ধরে আছে এবং এই মোলায়েম এপ্রিলে সে দরদর করে ঘামছে, টলছে এবং হাঁফাচ্ছে। ফেস-ফোঁস শব্দ ছাড়ছে নাক-মুখ থেকে।
ভেবেই পেলুম না একটা তোবড়ানো থলের ভেতর কী ওজনদার জিনিস আছে যে এমন পেল্লায় গড়নের মানুষকে কাহিল হতে হয়েছে।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন, “কী রে ভোঁদা? দাঁড়িয়ে থাকবি, না নামাবি?”
পালোয়ান হাঁসফাঁস শব্দে বলল, “ধরতে হবে।”
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “জয়ন্ত! এসো, আমরা ওকে একটু সাহায্য করি। ভবেশবাবু, মনে হচ্ছে আপনাকেও হাত লাগাতে হবে। ষষ্ঠী! তুইও আয়।”
ষষ্ঠী দরজার পরদায় উঁকি মেরে পিটপিটে চোখে ব্যাপারটা দেখছিল। এগিয়ে এল। তারপর আমরা সবাই মিলে পালোয়ানের মাথা থেকে চটের থলেটি নামিয়ে টেবিলে রাখলুম।
বলছি বটে নামিয়ে রাখলুম, যেন আস্ত একটা পাহাড়কে কাত করে ফেললুম। থলের ভেতরে কী আছে কে জানে, মনে হল, অন্তত পাঁচ কুইন্টালের কম নয় সেটির ওজন। টেবিলটা যে মড়মড় করে ভেঙে গেল না, এটাই আশ্চর্য! তবে টেবিলে রাখার সময় বাড়িটাই যেন ভূমিকম্পে নড়ে উঠল। অবশ্য মনের ভুল হতেও পারে।
কর্নেল থলে খুলতে ব্যস্ত হলেন। পালোয়ান মেঝের কার্পেটে বসে হুমহাম শব্দে বলল, “ফ্যান! ফ্যান! জল!”
ষষ্ঠী ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিল। তারপর জল আনতে দৌড়ল। ততক্ষণে কর্নেল দড়ি খুলে থলেটা ফাঁক করেছেন। দেখলুম, থলের ভেতর ক্রিকেটবলের সাইজের কালো একটা জিনিস। অবাক হয়ে বললুম, “এই জিনিসটা এত ভারী? কী এটা?”
ভবেশবাবু সোফায় বসে বললেন, “সেটাই তো রহস্য মশাই! তবে তার চেয়ে বেশি রহস্য, আমার বাথরুমে জিনিসটার আবির্ভাব।”
যে-টেবিলে আজব বলটি রাখা হয়েছে, সেটি কর্নেলের রিসার্চ-ক্ষেত্র বললে ভুল হয় না। টেবিলটি এতদিন ধরে দেখে আসছি। কিন্তু সেটি যে এমন শক্তিশালী তা এই প্রথম জানতে পারলুম। অমন ওজনদার জিনিসের চাপে একটুও মচকাল না। কর্নেল ড্রয়ার থেকে আতসকাঁচ বের বের করে ততক্ষণে খুঁটিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছেন। এদিকে পালোয়ান পর-পর তিন গ্লাস জল খেয়ে মাথায় হাত বুলোচ্ছে। ভবেশবাবু খুব আগ্রহের সঙ্গে কর্নেলের দিকে লক্ষ রেখেছেন।
আমি ভবেশবাবুকে বললুম, “প্লিজ, ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন কি?”
ভদ্রলোক একটু বদরাগী অথবা উত্তেজিত অবস্থায় ছিলেন। যে-জন্যই হোক, খ্যাক করে উঠলেন। “ওই তো বললুম মশাই! রহস্য! আর রহস্য বলেই কর্নেলসায়েবের কাছে আসা।” বলে কর্নেলের দিকে তাকালেন। “কিছু আঁচ করতে পারলেন স্যার?”
কর্নেল আতশকাঁচ রেখে সোফার কাছে জানালার ধারে তাঁর ইজিচেয়ারে এসে বসলেন। বললেন, “আপাতত কিছু বোঝা যাচ্ছে না ভবেশবাবু! জিনিসটা সত্যিই রহস্যময়। কিছুটা সময় লাগবে।”
ভবেশবাবু বললেন, “বেশ তো! যত ইচ্ছে সময় নিন। তবে স্যার, সত্যি বলতে কী, ওই বকশিশ জিনিস আমার ফেরত নিয়ে যেতেও আপত্তি আছে! বাস্! গতকাল বিকেলে বাথরুমে ওটা আবিষ্কারের পর থেকে যা-সব ঘটেছে, সবই তো আপনাকে টেলিফোনে বলেছি।”
পালোয়ান এতক্ষণে মেঝে থেকে উঠে সোফায় বসল। তার ওজনও কম নয়। সোফা মচমচ শব্দে কেঁপে উঠল। সে বলল, “ভূতুড়ে জিনিস স্যার! মামাবাবুকে এত বলছি, কানে করছেন না। নির্ঘাত ওটা ভূতের ঢিল।”
কর্নেল বললেন, “ঠিক। ভূতটা সারারাত ঢিলটা ফেরত নিতে বাড়ি চক্কর দিয়েছে। নানারকম ভয়-দেখানো আওয়াজ করেছে। তাই না ভবেশবাবু?”
ভবেশবাবু বললেন, “হ্যাঁ স্যার! সারারাত ঘুমোতে পারিনি। জানলার বাইরে ফিসফিস। দরজায় টোকা। বাগানে শাঁইশাঁই ঘূর্ণি হাওয়া। তারপর ছাদে বেহালার বাজনা! আমার অমন দাপুটে অ্যালসেশিয়ান টারজন, স্যার, সে পর্যন্ত ভয়ে কুঁকড়ে কাঠ।”
পালোয়ান ভেদা বলল, “আর সেই ঝনঝন শব্দটা, মামাবাবু? সেটার কথা বলুন!”
“হ্যাঁ, ঝনঝন শব্দ।” ভবেশবাবু চাপা গলায় বললেন, “ঘুম ভেঙে প্রথমে ভাবলুম, পাড়ায় কোথায় মাইকে খত্তাল বাজছে। পরে বুঝলুম, না–অন্য কিছু।”
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “ভূতের কেত্তন!”
পালোয়ান সোফা কাঁপিয়ে হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হাসতে লাগল। তারপর তার মামাবাবুর ধমক খেয়ে গম্ভীর হয়ে গেল। আমি ওকে বললুম, “ভোঁদাবাবু! আপনি তো ব্যায়ামবীর..”।
পালোয়ান ঝটপট বলল, “আমার নাম জগদীশ। তবে আপনি ব্যায়ামবীর বললেন, সেটা ঠিকই। গত বছর স্টেট মা এগজিবিশনে ওই টাইটেল পেয়েছি।”
বলে সে ডান হাত তুলে তাগড়া-তাগড়া পেশি ফুলিয়ে নমুনা দেখাল। দেখার মতো বস্তু হলেও আমার কেন যেন অস্বস্তিকর লাগে। মানুষের শরীরকে মানুষ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বিকট করে তোলে এবং সেজন্য খেতাবও জুটে যায়! একে দেহসৌষ্ঠব বা সৌন্দর্য বলে প্রশংসাও করা হয় শ্রী’ শব্দ সহযোগে। ব্যাপারটার মানে বুঝি না। কিন্তু কর্নেল জগদীশ ওরফে ভোঁদার পেশি-প্রদর্শনীর তারিফ করে বললেন, “অসাধারণ।”
