“সর্বনাশ নয়, ডার্লিং! বলিদান-করা মুণ্ডু নয়।” কর্নেল সহাস্যে বললেন। “রক্ত দেখতে পাচ্ছি কি?”
মুরারিবাবু চোখ টেরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর সামনে মুণ্ডুটা কর্নেল তুলে ধরে বললেন, “কী মুরারিবাবু? নকল একাশিদেবকে চিনতে পারছেন কি?”
অমনি মুরারিবাবু খ্যাক করে হাসলেন। তারপর মুণ্ডুটা ছিনিয়ে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, “কী কাণ্ড! এও দেখছি তিন-তিরেক্কের খেলা। মুখোশ!”
“হ্যাঁ, মুখোশ।” কর্নেল বললেন, “সুড়ঙ্গের মুখে ঝোঁপের আড়ালে ওৎ পেতে ছিলুম। যেই ঝোঁপ ফুঁড়ে উঠেছে, শিং ধরে ফেললুম। মুখোশ উপড়ে এল। আসল প্রাণীটি দুই ঠ্যাঙে দৌড়ে
পালিয়ে গেল।”
“বিট্টু?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “নিশ্চয় বিট্ট এই মুখোশ পরে মুরারিবাবুকে নিয়ে জোক করত!”
মুরারিবাবু মারমুখী হয়ে “তবে রে হতচ্ছাড়া, বিচ্ছু বাঁদর,– বলে ছুটে গেলেন। বিট্টুকে খুঁজে পাবেন কি না সন্দেহ। কর্নেল বললেন, “ওই যাঃ! মুরারিবাবু মুখোশটা নিয়ে চলে গেলেন যে!”
“যাকগে! শিলালিপির পাঠোদ্ধার হয়েছে কি না বলুন।”
“চলো। বাংলোয় ফিরে গিয়ে বলব।”
ঢিবি-এলাকা থেকে হাইওয়েতে নেমে বাংলোর দিকে হাঁটতে-হাঁটতে কর্নেল বললেন, “এও একটা সন্ধিবিচ্ছেদ বা ধড়-মুণ্ডুবিচ্ছেদ হওয়ার ঘটনা বলা চলে, ডার্লিং! তবে এটা নকল। আসলটা ফাস হবে মধ্যরাতে–বারোটা নাগাদ। ফঁদ পেতে এসেছি। দেখা যাক।”
“খুলে বলুন। হেঁয়ালি আর ভাল্লাগে না!”
কর্নেল আমার কথার জবাবই দিলেন না। চোখে বাইনোকুলার রেখে পাখি দেখতে দেখতে চললেন। বাংলোর গেটে মাধবলাল উদ্বিগ্নমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, “ছোটসাবকে লিয়ে হাম বহত শোচতা থা। রাতভর নিদ নেহি! আজ সারে দিনতকভি শোচতে শোচতে…হা রামজি!”
“জলদি কফি বানাও, মাধবলাল।” বলে কর্নেল বারান্দায় উঠে বেতের চেয়ারে বসলেন। একটু পরেই কফি এল। বারান্দার বাতিটা জ্বালিয়ে দিল মাধবলাল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন। সেটা খুলে টেবিলে বিছিয়ে বললেন, “কলকাতা যাব বলে রওনা হয়ে বর্ধমানে পৌঁছে হঠাৎ মনে হল, ডঃ টি সি সিংহের সঙ্গে একবার দেখা করে যাওয়া উচিত। তার কার্ড তিনকড়িচন্দ্র পেল কী করে? তা ছাড়া ডঃ সিংহ একজন পুরাবিদ এবং ভাষাবিজ্ঞানীও। …হঁ, যা ভেবেছিলুম। তিনকড়িচন্দ্র তার কাছে একটা শিলালিপির একটুখানি ভাঙা অংশ নিয়ে গিয়েছিল। উনি সেটা কপি করে রেখে সময় চেয়েছিলেন। লিপিটা দেখে ওঁর অবাক লেগেছিল। তিনকড়িচন্দ্র তার চর মারফত খবর পেয়ে থাকবে, আমি পরের ট্রেনে আসছি। সে বর্ধমান থেকে আমাদের সঙ্গ নিল।”
“কার্ড চুরি করল কী করে?”
“চুরি নয়। চেয়ে নিয়েছিল। নেমকার্ড চাইলে কি দেবেন না” বলে কর্নেল কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। “এই লিপি খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকের কুষান-লিপি। ব্রাহ্মীর রকমফের। কিন্তু মজার ব্যাপার, এর ভেতর বাংলায় কিছু কথা লেখা আছে। সম্ভবত ধাড়াবংশের কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তির কীর্তি।”
বললুম, “কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং!”
কর্নেল হাসলেন। “ব্যাকরণ রহস্য ডার্লিং! ব্যঞ্জনবর্ণ-স্বরবর্ণ সন্ধি করলেই কথাটা বেরিয়ে আসবে। এই দেখো! ত+ও+র+ণ=তোরণ। শ +ই+র+এ=শিরে। গ+উ+প+ত+গ+র+ত=গুপ্ত গর্ত। ম+আ+ঝ+এ=মাঝে। ন+আ+ম+ও=নামো। ব+আ+ম+দ+ই+ক+এ=বাম দিকে। ত+ই+ন+ধ+আ+প=তিন ধাপ।… এরপর শুধু ব’। বাকিটা ভেঙে গেছে এবং সেই ভাঙা অংশটা তিনকড়িচন্দ্র দিয়ে এসেছে ডঃ সিংহকে। তাই মিলিয়ে পুরো গুপ্তবাক্যটি হল :
তোরণশিরে গুপ্তগর্ত মাঝে নামো। বাম দিকে তিন ধাপ। বাম হাতের তর্জনী।
বুঝতে পেরে বললুম, “সত্যিই তিন-তিরেক্কের ব্যাপার। বাস! কিন্তু বাম হাতের তর্জনী মানে?”
“সেখানে দাঁড়ালে হাত বুলিয়ে বাম হাতের তর্জনী যেখানে ঠেকবে, সেখানেই…”
“ঘড়াভর্তি সোনার মোহর?”
“না। একাশিদেব।” বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। তোমার মুখে বাচ্চা ছেলে’ কথার সূত্রে আমার মাথায় আইডিয়াটা আসে। তবে বিট্ট ছেলেটির হাড়ে-হাড়ে বুদ্ধি। নকুলবাবু ওকে তাড়াতেন আর ইতিহাসের গল্প শোনাতেন। শিবের তিন-শিঙে ছাগল-অবতারের গল্প শুনে বিট্টু বাজারের মুখোশ তৈরির দোকানে অর্ডার দিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এ-অঞ্চলে মুখোশ তৈরির প্রচুর দোকান আছে। ছৌ-নাচের মুখোশ এইসব দোকান থেকেই লোকে কেনে। আসলে মুরারিবাবুকে ভয় দেখাতেই বিট্টুর এই দুষ্টুমি। কিন্তু বাচ্চা ছেলে বলে কুটা তুমিই দিয়েছিলে।”
“একাশিদেব ব্যাপারটা কী?”
“আজ রাত বারোটায় দেখবে। ডঃ সিংহকে বলে এসেছি, তিনকড়িচন্দ্রকে শিলালিপিটার বাকি অংশের কপি দেবেন। যেন উনি বর্ধমান মিউজিয়ামে এর খোঁজ পেয়েছেন! ফঁদটা বুঝলে তো?”
“রাত বারোটা কেন?” উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে বললুম। “আরও আগে নয় কেন?”
“ওই সময় অমাবস্যা পড়ছে। মন্দিরে খুব ভিড় হবে আজ রাতে। কাজেই সবার মন পড়ে থাকবে মন্দিরে। এদিকে নির্বিঘ্নে তিনকড়ি একাশিদেবকে উদ্ধার করবে। তিনপুরুষ ধরে ভাঙা দেউড়ি নিয়ে মামলার আসল কারণটা তো এই।”
একটু ভেবে বললুম, “কিন্তু তিনকড়িচন্দ্র বেঁটে? দেউড়ির মাথায় সুড়ঙ্গে তিন ধাপ নেমে বা হাত বুলিয়ে ওর তর্জনী যেখানে ঠেকবে, মুরারিবাবুর সেখানে ঠেকবে না। একজন বেঁটে, একজন লম্বা।”
