রমলাবউদি কড়া মুখে বললেন, “না। সারারাত্তির ঘুমোওনি। খেয়েদেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ো। আর তোমাকে একা বেরোতে দিচ্ছিনে। মুরারি, দেখছ পাগলের কাণ্ড? এই আছে, এই নেই। আস্ত ভূত!”
মুরারিবাবু ততক্ষণে কেটে পড়েছেন। বাংলোয় আমার জিনিসপত্র আনতে যে যাননি, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। গেলেও মাধবলাল ওঁকে তা দেবে না। গেট থেকেই ভাগিয়ে দেবে।
স্নান করে চাঙ্গা হয়েছিলুম। কিন্তু পেটে ভাত পড়ার পর চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে এল। আর দেরি না করে নকুলবাবুর জাদুঘরে ঢুকলুম। রমলাবউদি বিছানা গুছিয়ে পেতে দিতেই লম্বা হয়ে পড়লুম এবং ঘুমও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
.
সেই ঘুম ভাঙল যখন, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। চোখ খুলে প্রথমে একটি চকচকে টাক দেখতে পেলুম। জানলা দিয়ে শেষ রোদ্দুরের ছটা এসে সেই টাকে পড়েছে। টেবিলে টুপি। ধুড়মুড় করে উঠে বসলুম। “কর্নেল!” বলে উল্লাসে হাঁক ছাড়লুম।
প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ ঘুরলেন না। টেবিলে একটুকরো ভাঙা কালচে পাথরের ফলক আর নোটবই নিয়ে কী একটা করছেন। একপাশে মুরারিবাবু আর রমলাবউদি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু পরে মুরারিবাবু বললেন, “তিন-তিরেক্কের হিসেব। দেখুন, মিলে যাবে।”
ব্যা ক র ণ র হ স্য “মিলেছে।” বলে কর্নেল এতক্ষণে আমার দিকে ঘুরলেন। “কী জয়ন্ত? একাশির পাল্লায় তা হলে তুমিও পড়েছিলে? তোমাকে পইপই করে বলেছিলুম, বাংলো ছেড়ে বেরিও না।”
বললুম, “পড়লেও একাশিদেবের নাম জপে বেঁচে গেছি।”
“একাশিদেব?” কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। “হুঁ, একাশির পাশে দেব যুক্ত করতে পেরেছ, এটাই লাভ। ..না, মুরারিবাবু! তিন যুক্ত দুই পাঁচ করে আর ঝামেলায় পড়বেন না।”
মুরারিবাবু ঝটপট বললেন, “পাঁচে ঝামেলা নেই কর্নেলসায়েব। তিন পাঁচে পনেরো। একের পিঠে পাঁচ। পাঁচ প্লাস এক–ছয়। দুটো নম্বর থ্রি।…মাধবলালের নামের সংখ্যাতত্ত্ব জয়ন্তবাবুই বের করেছিলেন। ওঁর ক্রেডিট পাওনা। কিন্তু কী মিলেছে বলুন এবার?”
কর্নেল বললেন, “ব্যাকরণ রহস্য ফাঁস করে তবে সব বলব। চলুন, বেরনো যাক। জয়ন্ত, ওঠো। রমলা, ফলকটা যেখানে ছিল, রেখে দাও।”
রমলাবউদি পাথরেরর ভাঙা ফলকটা নিয়ে পাশের ঘরে গেলেন। একটু পরে বারান্দা থেকে বললেন, “চায়ের জল চাপানো আছে। চা খেয়ে তবে বেরোবেন বাবামশাই!”
কর্নেল কখন তা হলে রমলাবউদিরও বাবামশাই হয়ে গেছেন! ষষ্ঠীর বাবামশাই ক্রমশ দেখছি, বিশ্বসুদ্ধ লোকের বাবামশাই হয়ে উঠছেন।
চা খেয়ে যখন বেরোলুম, তখন প্রায় সাড়ে-পাঁচটা বাজে। কর্নেল হানাবাড়িগুলোর দিকে চলেছেন। মুরারিবাবু কেন কে জানে, ভীষণ গম্ভীর। কর্নেল আমার বন্দী হওয়ার ঘটনাটা জেনে নিলেন হাঁটতে-হাঁটতে। তারপর আপন মনে বললেন, “ঘুরে-ফিরে সেই ব্যাকরণ রহস্য অথবা ব্যাকরণ রহস্য এসে পড়ছে। এক আর আশি একাশি। সন্ধি প্রকরণ। মুরারিবাবু, আপনি জয়ন্তর সঙ্গে ভাঙা দেউড়ির ওখানে যান। আমি একটু ঘুরপথে যাচ্ছি।” বলে আমার দিকে ঘুরে একটু হাসলেন।”ভয় নেই ডার্লিং! তিনকড়িচন্দ্র এখন ওদিকে পা বাড়াতে সাহস পাবে না। পুলিশ ও পেতে আছে। সে তত বোকা নয়।”
মুরারিবাবু এবার চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। বুঝলুম, তিনকড়িচন্দ্রের ভয়ে এ-তল্লাটে আসতে বড় অনিচ্ছা ছিল। তাই অমন গম্ভীর দেখাচ্ছিল ওঁকে। লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। বললেন, “পুলিশ ওত পেতে আছে। আর তিন-তিরেক্তে করে কে? নয় নয়ে একাশি হয়ে যাবে। কিন্তু একাশিদেব কোন্ দেবতা বলুন তো জয়ন্তবাবু?… শোনা-শোনা মনে হচ্ছে। …কার কাছে যেন শুনেছিলুম নামটা। পেটে আসছেন, মুখে আসতেই তিন-তিরেক্কে হয়ে যাচ্ছে।”
কর্নেল ঝোঁপঝাড়-ধ্বংসস্তূপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দেউড়ির কাছে পৌঁছে গেলুম। এখনও দিনের আলো আছে। তবু চারদিকে ভয়ে-ভয়ে তাকাচ্ছিলুম। মুরারিবাবুও তাকাচ্ছিলেন। ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বললেন, “পুলিশ ওৎ পেতে আছে! পুলিশ কীভাবে ওৎ পাতে জানেন? কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে.. এক মিনিট! ওই ঝোঁপটা দেখে আসি। স্বচক্ষে না দেখলে মশাই, বুকটা খালি তিন-তিরেকে তিন-তিরেকে করতেই থাকবে।”
এই বলে যেই পা বাড়িয়েছেন, দেউড়ির মাথা থেকে বিদঘুঁটে আওয়াজ এল, “এ-কা-শি!” সেই তিন-শিঙে ছাগলের মুণ্ডু। মুরারিবাবু থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরই আচমকা খাপ্পা হয়ে একটুকরো আধলা ইট কুড়িয়ে “নিকুচি করেছে তোর একাশির!” বলে ছুঁড়ে মারলেন। ছাগলের মুণ্ডুটা অদৃশ্য হলে গেল দেউড়ির মাথায় ঝোঁপের ভেতর। মুরারিবাবু আবার ইটের টুকরো কুড়িয়ে ছুঁড়লেন। সে একটা দেখার মতো দৃশ্য। ক্রমাগত ঢিল-ছছাড়াছুড়ি করে চলেছেন মুরারিবাবু। ওঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “এ কী করছেন! পুলিশ ওৎ পেতে আছে কোথাও। কারও মাথায় পড়লে কী হবে?”
মুরারিবাবু ক্ষান্ত হলেন সঙ্গে-সঙ্গে। জিভ কেটে বললেন, “সরি, ভেরি সরি!” তারপর চারদিকে করজোড়ে নমস্কার করে অদৃশ্য পুলিশদের উদ্দেশে বললেন, “কিছু মনে করবেন না স্যাররা! একাশির ঠ্যালা। মাথা ঠিক রাখা কঠিন।”
এইসময় দেউড়ির পেছন থেকে কর্নেলের আবির্ভাব ঘটল। মুখে উজ্জ্বল হাসি। কিন্তু হতভম্ব হয়ে দেখলুম, ওঁর হাতে সেই তিন-শিঙে ছাগলটার মুণ্ডু। বললুম, “সর্বনাশ!”
