কিন্তু সেই যথেষ্ট। সেই জানলাটার ছিটকিনি মরচে ধরে ভেঙে গেছে। খড়াক করে খুলে গেল এবং একটা মুখ দেখতে পেলুম। বিট্টু!
তার হাতে ঘুড়ি-লাটাই। এই ঘরের ছাদে চড়ে হয়তো ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টায় ছিল। আমাকে এ অবস্থায় দেখামাত্র সে বড়-বড় চোখে তাকাল। তারপর ফিক করে হেসে উঠল।
তারপর জিভ দেখাল এবং ব্যা-অ্যা করল। সত্যিই বিচ্ছু ছেলে। ধুপ শব্দে লাফিয়ে পড়ে তখনই উধাও হয়ে গেল। কিছু বলার সুযোগই পেলুম না।
রাগে-ক্ষোভে ছটফট করা ছাড়া উপায় নেই। অদ্ভুত ছেলে তো! একটা লোক এমন অবস্থায় পড়ে আছে দেখেও তার সঙ্গে ফকুড়ি করে কেটে পড়ল!
কিছুক্ষণ পরে বাইরে ধুপধুপ শব্দ আবার। তারপর জানলায় এবার মুরারিবাবুর মুখ এবং আমাকে দেখে অবাক হবেন কী, সেই খ্যাক করলেন।
অতিকষ্টে বললুম, “দরজা প্লি-ই-জ!”
মুরারিবাবু সরে গেলেন। দরজার দিকে তার কথা শোনা গেল, “এই রে! তিন-তিরেক্কে করে রেখেছে। বিট্টু! হাতুড়ি! হাতুড়ি! বউদিকে গিয়ে বল, কয়লাভাঙার হাতুড়ি দাও!”
তারপর কড়া টানাটানির বিকট শব্দ এবং দরজার কপাট কাঁপতে থাকল। সেইসঙ্গে মুরারিবাবুর ফেস-ফোঁস, গোঁ-গোঁ। স্তূপের ভেতর গর্তের মুখে পাথর ঠেলে সরানোর সময় যেমনটি শুনেছিলুম।
কিন্তু ক্রমশ উনি যেন রেগে যাচ্ছিলেন। “তবে রে তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশি! মারে জো-হেঁইয়ো!…জোরসে টানো-হেঁইয়ো!…ঔর থোড়া–হেঁইয়ো!” কড়াক শব্দে কড়া উপড়ে গেল এবং দরজাও প্রচণ্ড জোরে খুলে গেল। এত জোরে যে, দেওয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়ল ঝুরঝুর করে।
মুরারিবাবু ঘরে ঢুকে পুনঃ খ্যাক করলেন। কোমরে দু’হাত রেখে আমাকে দেখতে-দেখতে বললেন, “এই! এই তিন-তিরেক্তের ভয়েই কাল সন্ধ্যাবেলা আপনার সঙ্গে যাইনি। বুঝলেন তো
এবার?… আহা রে! কী অবস্থা করেছে দেখছ? একেবারে নয় নয়ে একাশি… ওদিকে আরও এক তিন-তিরেক্কে। মানিক রিকশাওয়ালাকে ডাকাতরা শুনলুম মেরে ফর্দাই করেছে। মুখে টেপ!…সেই তিন-তিরেকের টেপ! ডিটেকটিভবাবুর মতোই অবস্থা। …আরে! আপনার মুখেও তিন-তিরেক্কে?”
বলে একটু ঝুঁকে টেপটা ওপড়ালেন। যন্ত্রণায় উঁহুহু করে উঠলুম। বাঁধন খুলে দিচ্ছেন না। এখনও। কথা বলতে গলায় যন্ত্রণা। “খু-খুলে দি-দিন” বলে চুপ করলুম।
হঠাৎ মুরারিবাবু এক লাফে পিছিয়ে “বাপ রে, সাপ” বলে একেবারে দরজার বাইরে চলে গেলেন।
অতিকষ্টে মাথা ঘুরিয়ে কোথাও সাপটাকে দেখতে পেলুম না। তবে কোণায় গর্তের পাশে একটা সাপের খোলস দেখা যাচ্ছিল। সেইসময় রমলাবউদির গলা ভেসে এল। “কই? কোথায়! কোথায় ঠাকুরপোকে বেঁধে রেখেছে?”
মুরারিবাবু ঘুরে বললেন, “একেবারে তিন-তিরেকে! তার সঙ্গে সাপ।”
রমলাবউদি দরজায় এসে আমাকে দেখেই “ও মা! এ কী!” বলে ঘরে ঢুকলেন। ওঁর হাতে একটা হাতুড়ি। আমার হাতের এবং পায়ের বাঁধন খুলে দু’হাতে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর হাতুড়ি তুলে তেড়ে গেলেন মুরারিবাবুর দিকে। “হাঁ করে এতক্ষণ মজা দেখা হচ্ছিল, ভূত কোথাকার।”
মুরারিবাবু নিমেষে উধাও হয়ে গেলেন। রমলাবউদি এসে আমার কাধ ধরে বললেন, “কী সর্বনেশে কাণ্ড! কাল তুমি গেলে বটে, বড্ড ভয় করছিল। পথে কোনো বিপদ-আপদ যেন না ঘটে। চলো, চলো! ইশ! এক রাত্তিরেই কী অবস্থা হয়ে গেছে তোমার!”
বিট্টু নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ চলে গেল। ছেলেটা আপনভোলা খেয়ালি স্বভাবের। কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য ওকে আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু, কর্নেলের সেই রামধনু প্রজাপতির মতো এই ছটফটে সুন্দর ছেলেটিকে নাগালে পাওয়া কঠিন।
কাল শেষবিকেলে মুরারিবাবুর সঙ্গে এই হানাবাড়ি এলাকা দিয়ে এসেছিলুম। তখন আমি এক মানুষ, এখন আমি আর-এক মানুষ। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেন বেতো-রুগিকে। এ দিকটা নিরিবিলি সুনসান। সকালের রোদ্দুর মিটিমিটি হাসছে আমার দশা দেখে, কাল হালদারমশাইয়ের দশা দেখে আমি যেমন হেসেছিলুম, তেমনি হাসি।
গরম দুধ খাইয়ে রমলাবউদি আমাকে চাঙ্গা করে তুললেন। বিরু নাইট ডিউটি করে এসে ঘুমাচ্ছিল। হাই তুলতে-তুলতে এসে আমাকে একবার দেখে গেল। গম্ভীর মুখে বলেও গেল, “চান করে নিন দাদা! বড্ড বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে আপনাকে।” আয়নায় নিজেকে দেখে শিউরে উঠলুম। আমি না অন্য কেউ? প্যান্ট-শার্টে ঝুলকালি, আরশোলার নাদি। চুলে মাকড়সা পর্যন্ত কখন জাল পেতেছিল। রাতারাতি একেবারে আস্ত ভূতে পরিণত হয়েছি।
রমলাবউদির তাড়ায় স্নান করতে হল। বিরুর পাঞ্জাবি-পাজামা পরে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখলুম, আমি আবার আমাকে ফিরে পেয়েছি। একটু পরে যখন খেতে বসেছি এবং রমলাবউদি সামনে বসে তিনকড়িচন্দ্রের শ্রাদ্ধ করছেন, তখন মুরারিবাবু হন্তদন্ত ফিরলেন। বললেন, “থানায় গিয়েছিলুম। আপনার ব্যাপারটা যে বলব, শুনলে তো? তিন-তিরেকে করতে এল। তবে করালীদাকে শাসিয়ে এসেছি।…অবাক কাণ্ড মশাই! করালীদা বলল, তিনু তো জাহাজে। ওদের জাহাজ এখন প্যাসিফিক ওসেনে ভাসছে। বুঝুন তিন-তিরেক্কের কারবার!”
রমলাবউদি ধমক দিয়ে বললেন, “কবক কোরো না তো! ঠাকুরপোকে খেতে দাও। আর শোনো, ইরিগেশন-বাংলোয় গিয়ে ঠাকুরপোর জিনিসপত্র নিয়ে এসো।”
বললুম, “না বউদি, আমি বাংলোয় ফিরে যাই, কর্নেল এসে আমাকে না দেখে ভাবনায় পড়ে যাবেন।”
