“কাশীটা একটা গাধা!” গলাটা সেই তিনকড়িচন্দ্রেরই মনে হল। “যাকগে, টেপ খুলে কথা আদায় কর। বুড়োঘুঘুটার সঙ্গী যখন, তখন সব জানে। কতদূর এগিয়েছে, ঠিকঠাক জানা দরকার।”
একজন আমার মুখের টেপ এক ঝটকায় খুলে দিল। চামড়া, গোঁফসুষ্ঠু উপড়ে গেল যেন। যন্ত্রণায় “উঁহুহু” করে উঠলাম। তারপর পিঠে ছুঁচলো কিছু ঠেকল। একজন বলল, “টু করলেই উলটো দিক থেকে হার্ট ছেদা হয়ে যাবে। সাবধান!”
একজন আমার কাধ ধরে ঠেলে বসিয়ে দিল ঘাসের ওপর। এতক্ষণে কানে আবছা ভেসে এল ঢাকের শব্দ। তা হলে মন্দিরটার কাছাকাছি কোথাও আছি। সামনের লোকটার হাতে ছড়ি দেখতে পেলুম। ঠিকই চিনেছি তা হলে। বললুম, “ডঃ সিংহ নাকি?”
ছড়ির খোঁচা খেলুম পেটে। “শাট আপ! ন্যাকামি হচ্ছে? ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দ্যাখোনি?”
“দেখতে পাচ্ছি তিনকড়িবাবু!”
“মোটকু, কথা আদায় কর।” তিনকড়িচন্দ্র একটু তফাতে বসল। “দেরি করিসনে!”
পিঠে ছুরির ডগার চাপ পড়ল। বললুম, “বলছি, বলছি।”
“বলো!” উদাস গলায় তিনকড়িচন্দ্র বলল। “বলো কদ্দূর এগিয়েছে বুড়োঘুঘু?” বললুম, “অনেকদূর! কলকাতা অবধি।”
“তার মানে?”
“কর্নেল কলকাতা গেছেন। একটা ভাঙা শিলালিপির পাঠোদ্ধার করতে।”
“তার মানে? তার মানে?”
“নকুলবাবুর নোটবইতে ওই শিলালিপির নকল আঁকা আছে। ওতেই নাকি সোনার মোহরভর্তি ঘড়ার কথা আছে।”
“শাট আপ!” তিনকড়িচন্দ্র ধমক দিল। “মোহর-টোহর বোগাস! আমি জানতে চাইছি একাশিদেবের কথা!”
অবাক হয়ে বললুম, “সবসময় একাশি-একাশি শুনেছি! একাশিদেবের কথা তো শুনিনি।”
“সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না।” তিনকড়িচন্দ্র শাসাল। “নোলো ব্যাটাচ্ছেলেকে ত্রিশূলে গেঁথেছি। তোমাকে…তোমাকে…”তিনকড়িচন্দ্র আমার জন্য সাঙ্ঘাতিক মৃত্যু খুঁজতে-খুঁজতে বলল, “হু, তোমার গা পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে কাটব। বলো, কোথায় একাশিদেব লুকনো আছে?”
“কী আশ্চর্য! আমি জানলে তো বলে দিতুম। শিলালিপির ভেতর তার খোঁজ আছে হয়তো। কর্নেল সেজন্যই তো কলকাতা গেছেন। পাঠোদ্ধার করে তবে না জানা যাবে।”
আমার কথায় তিনকড়িচন্দ্র একটু ভাবনায় পড়ে গেল হয়তো। বলল, “ওকে। মোটকু, ওকে কাশীর ঘরে…না, কাশীর ঘরে পুলিশ আসার চান্স আছে। স্তূপের ভেতর গর্তটা ভালো জায়গা ছিল। বুড়ো চিনে ফেলেছে। এক কাজ কর।”
পেছনে মোটকু বলল, “বস্তায় ভরে টিকটিকিবাবুর মতো…”
“নাঃ! পুলিশ বস্তা দেখলেই সার্চ করছে দেখে এলুম।” তিনকড়িচন্দ্র উঠল। “একে বরং ডোম্বলবাবুদের পোড়োবাড়িতে নিয়ে চল। ঠ্যাং দুটোও বেঁধে মুখে ফের টেপ সেঁটে ফেলে রাখবি। তালা ভেঙে নতুন তালা এঁটে দিবি ঘরটাতে। বুড়োঘুঘু ফিরলে উড়ো চিঠিতে জানিয়ে দেব, মাল দাও, মাল নাও! গিভ অ্যান্ড টেক। ব্যস!”
.
সাত
ঘুরঘুট্টে অন্ধকার হয়ে গেল ওরা চলে যেতেই। দয়া করে একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়েছে, এই যা। পিঠমোড়া করে দু’হাত বাঁধা, পা-দুটো বাঁধা। কাত হতে গেলে কষ্ট। চিত হতেও কষ্ট। অতএব উপুড় হয়ে আছি। ঘরটায় অদ্ভুত সব শব্দ। মাঝে-মাঝে কী সুড়সুড়ি দিচ্ছে। গায়ে চলাফেরা করছে। শেষে বুঝলুম, আরশোলা আর ইঁদুরের রাজত্ব ঘরের ভেতর। সাপ থাকাও অসম্ভব নয়। ওদের টর্চের আলোয় মেঝেয় প্রচুর গর্ত দেখেছি।
দরজা-জানলা বন্ধ এয়ারকন্ডিশন্ডু ঘর এ-রাতে আশা করেছিলুম। তার বদলে এই সাঙ্ঘাতিক উপহার। আমার নামে কি জোড়া নম্বর থ্রি আছে? পুরো নাম জয়ন্তকুমার চৌধুরী। তা হলে দশ ব্যঞ্জন-মুরারিবাবুর হিসেবে। তিন-তিরেক্তে নয়, হাতে রইল এক।… নাঃ। …তিন দশে তিরিশ, তিনের পাশে জিরো। জিরো নম্বর নয়–মুরারিবাবুর মতে। তা হলে স্রেফ তিন হয়। কিন্তু তিন তো পয়া নম্বর।
মুরারিবাবুর মতোই ঘিলু ফেঁসে যাবে। ঘুমনোর চেষ্টা বৃথা। অনবরত আরশোলার সুড়সুড়ি। ইঁদুরের হপ-স্টেপ-জাম্প রেস। র্যাটরেস আর কি! মনে-মনে গত রাতে কর্নেলের উপদেশ স্মরণ করে তিন-শিঙে ছাগলের পাল কল্পনা করে গুনতে শুরু করলুম। হঠাৎ মনে পড়ল, ছাগলটা ‘একাশি’ বলে এবং তিনকড়িচন্দ্র ‘একাশিদেব’ বলল। বড় গোলমেলে ব্যাপার।
তারপর চমকে উঠলুম। কী একটা লম্বা লিকলিকে প্রাণী আমার পিঠের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে। সেটা যে সাপ, তাতে সন্দেহ নেই। দম বন্ধ করে কাঠ হয়ে পড়ে রইলুম। সাপটা সম্ভবত ইঁদুরকে তাড়া করেছে। এরপর আর নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। শ্বাসপ্রশ্বাসেও সাবধান হওয়া উচিত। মনে-মনে বাবা একাশিদেবকে ডাকতে থাকলুম।
এতকাল ধরে কর্নেলের সঙ্গে দেশ-বিদেশে কত সব ভয়ঙ্কর অ্যাডভেঞ্চারে গেছি, কিন্তু এমন বিদঘুঁটে ধরনের বিপদে কখনও পড়িনি। এই বিপদটা বেজায় অপমানজনকও বটে। আরশোলার সুড়সুড়ি, ইঁদুরের কাতুকুতু, সাপের বেয়াদপি। বাইরেও সন্দেহজনক কেমন সব শব্দ। শোশো..শনশন…মচমচ…খটখট।
যেন কতকাল ধরে এইরকম নিছক কাঠে পরিণত হয়ে পড়ে আছি। হয়তো গায়ে শ্যাওলা জমেছে। ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে। একসময় অন্ধকার কমে গেছে টের পেলুম। ক্রমশ জানলার ফাঁকে এবং ঘুলঘুলিতে ধূসর আলো, তারপর একটু করে ফিকে লালচে ছটা ফুটে উঠল। এবার ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা গেল। মাদুরে চিবুক ঠেকিয়ে মাথা তুললুম। এবড়োখেবড়ো মেঝে, গর্ত, দেওয়াল ছুঁড়ে শেকড়বাকড়। ফাটল।
আরও কিছু সময় কাটল। তারপর একটা জানলার পাশে ধুপধুপ, খসখস, কিছু টানা-হেঁচড়ার শব্দ শুনতে পেলুম। অমনি যত জোরে পারি দম নাকে টেনে মুখ দিয়ে বের করলুম। টেপটাও সম্ভবত ঘামে নরম হয়েছিল। ফুটুস শব্দে একটুখানি খসে গেল বাঁ দিকে। গলা শুকিয়ে এমন অবস্থা যে যত জোরে কণ্ঠস্বর বের করলুম, ততটা জোরে বেরোল না। “কে আছ ভাই” কথাটা অদ্ভুত “কঁককাছ-ছ-ভাঁ” হয়ে গেল।
