—মাথা খারাপ স্যার! এ কি সে সত্যযুগ আছে? ঘোর কলি। লোকের ধর্মবোধই নেই। ধর্মকর্মে এক পয়সা খরচ করতে হলেই মুখ ভার।
—আচ্ছা ঠাকুরমশাই, যদি ধরুন বড়সড়ো যজমান পেয়ে যান, আপনাকে ভাল মাইনে-কড়ি দেবে, জামাকাপড় মায়-খোরাকিও দেবে, আপনি যাবেন?
—এক্ষুনি যাব স্যার, এক্ষুনি। কাঁহাতক আর বাড়ি-বাড়ি দুচার পয়সা কুড়িয়ে ঘোরা যায়?
—ভাল! তাহলে ঠিকানা দিন। কথা বলে আপনাকে জানাব।
আমি অবাক হয়ে শুনছিলুম। এরপর দেখলুম, কর্নেল নোটবই বের করে নাম-ঠিকানা টুকে নিলেন। ঠাকুরমশাই গদগদ হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরমেশবাবুর স্ত্রী কড়া চোখে ব্যাজার মুখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আরও কিছুক্ষণ ডঃ পুরকায়স্থের বাড়িতে কাটিয়ে আমরা যখন রাস্তায় পৌঁছলুম, তখন দেখি ঠাকুরমশাই সাইকেলে চেপে সোজা কাশকুশের জঙ্গল ভেঙে চলেছেন। মনে হল, সাইকেলে চাপার ব্যাপারে ভারি দক্ষ লোক। পথ-বিপথ মানেন না। পাখির মতো ডানা মেলে দিয়েছেন যেন।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললুম-হাই ওল্ড ঘুঘু! ব্যাপারটা কী?
অন্যমনস্ক জবাব এল–উঁ?
—আপনি তো সয়েব মানুষ। হঠাৎ ঠাকুরমশাইয়ের বড়লোক যজমান খুঁজে দিতে এত উৎসাহ কেন? ও ডার্লিং! যজমানটি কে হবেন জানো? স্বয়ং লালবাজার গোয়েন্দা দফতরের ডেপুটি কমিশনার আনোয়ার খান।
ঘ্যাঁচ করে গাড়ির ব্রেক কষে দিলুম। নইলে পাথরের ওপর দিয়ে চাকা গড়িয়ে গর্তে পড়ত। এবং আকাশ থেকে পড়ে বললুম-মুসলমান যজমানের বাড়ি পুজোআচ্চার কাজ? কী বলছেন আবোল-তাবোল। এর অর্থ কী?
কর্নেল হাসলেন।–লোকটা দাগি। দেখেই চিনেছি। আনোয়ার খানের সামনে ওকে পৌঁছে দিতে পারলেই জানতে পারবে, নৃসিংহ রহস্যের পেছনে কে বা কার রয়েছে। যাই হোক, স্টার্ট দাও বৎস। আমাদের এখন অনেক জায়গায় ছোটাছুটি করতে হবে।…
ডঃ গড়গড়ির চমকপ্রদ আবিষ্কার
জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডঃ গুটেনবার্গের সঙ্গে সেদিন আলাপ হয়েছিল। খুব আমুদে মানুষ। ইংরেজির চেয়ে বরং হিন্দিই রপ্ত করছেন বেশি। কথায় কথায় হেসে বলেন—ম্যায় হিন্দি সমঝতে হেঁ। কর্নেলের বয়সী এই জার্মান বিজ্ঞানী চেহারায় অবিকল কর্নেলের মতো। দূর থেকে দেখলে বোঝা কঠিন, কর্নেল, না ডঃ গুটেনবার্গ।
তাঁর কাছেই জানা গেছে টোরা আইল্যান্ড একটা বেওয়ারিশ দ্বীপ। পুবে ইন্দোনেশিয়া, উত্তরে আন্দামান নিকোবর এবং পশ্চিম ও দক্ষিণে ফাঁকা অনন্ত অথই ভারত মহাসাগর। টোরাদ্বীপের মালিকানা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের আদালতে তিন দেশের মধ্যে বহুকাল ধরে মামলা চলছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া তিন দেশেরই দাবি, টোরা আমাদের। এখনও ফয়সালা হয়নি। কবছর আগে পর্যন্ত ওখানে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রহরীবাহিনী টহল দিত। কিন্তু নানা অসুবিধার জন্য তাদের সরিয়ে নিতে হয়। সেই অসুবিধেগুলো কী, খুলে বলা হয়নি। কিন্তু এখন আমরা সবাই আঁচ করেছি। তবে ভারত সরকার যে ওখানে সমীক্ষক দল পাঠিয়েছিল, সেটা খুব গোপন ব্যাপার। কারণ যে দ্বীপ নিয়ে মামলা চলছে, সেখানে সমীক্ষক দল পাঠানো চলে না। তাই নৃসিংহের হাতে বিজ্ঞানীদের খুন হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে এত লুকোচুরি।
এই যে জার্মান বিজ্ঞানীরও সাহায্য নিয়েছে ভারত, তাও গোপনে। আসলে ডঃ গুটেনবার্গ ভারত-জার্মান বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা চুক্তি অনুসারে ভারতে আছেন। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছেন। তার টোরা অভিযানে যাওয়ার ব্যাপারটা বেসরকারি ভাবে। অর্থাৎ নিজের দেশের সরকারকেও উনি এটা জানাননি। সবসময় সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চললে কোনওকালে কি বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানকে এতখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন? এক সময় রাষ্ট্র তো বিজ্ঞানীকে শত্রু ভাবত।
কাজেই পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপন। অথচ সরকারি গোপনীয়তার পাঁচিল ডিঙিয়ে ব্যাপারটা কর্নেলের হাতে এসে পড়ল এবং আমিও তার সঙ্গে জড়িয়ে গেলুম। সেই সঙ্গে এও বুঝতে পারলুম যে কর্নেল যথাসময়ে দিল্লিতে সাংবাদিকদের ডেকে কর্তৃপক্ষ যে বিবৃতি দেবে বলেছেন—সে নিতান্ত ধোঁকা। সরকার অত বোকামি করবেই না। তাহলে যে ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়া হইচই জুড়ে দেবে। কেন বিচারাধীন এলাকায় ভারত নাক গলাতে গেল?
আমাদের একটা বড় সুবিধে, পাসপোর্ট-ভিসা কিছু লাগছে না। আমরাও গোপনে যাচ্ছি। প্রথমে আন্দামানের পোর্টব্লেয়ারে বিমান থেকে নামলুম। পাঁচজন স্রেফ পর্যটক বেড়াতে এসেছি অন্যদের মতো।
ওদিকে কলকাতা থেকেই ব্যবস্থা করা হয়েছে, গভীর সমুদ্রে মাছধরা জাহাজ শার্ক অর্থাৎ হাঙর আমাদের নিয়ে গিয়ে টোরাদ্বীপের কাছাকাছি নামিয়ে দেবে।
না, জলে নামিয়ে দেবে না। কর্নেলের এ বাহাদুরির তুলনা নেই। নৌ-বাহিনীতে তার পরিচিত এক কর্তাব্যক্তির সাহায্য জোগাড় করেছেন। টোরাদ্বীপের একমাইল দূরে রাত তিনটে নাগাদ চুপি চুপি একটা মিলিটারি মোটরবোট এসে অপেক্ষা করবে। আমরা শার্ক থেকে তাতেই নামব এবং দ্বীপে পৌঁছব।
পোর্টব্লেয়ারের একটা হোটেলে আড্ডা দিলুম আমরা। সত্যি বলতে কী, এবার আমার মনে রীতিমতো আতঙ্ক ছমছম করে উঠেছে। বিশাল সমুদ্রের মধ্যে এক অজানা ছোট্ট দ্বীপ। তার বিভীষিকা মনে এখনই ছায়া ফেলেছে। আমি খুব মনমরা হয়ে গেলুম। পৈতৃক প্রাণটি এবার
বেঘোরে না হারাতে হয়।
কর্নেল তো সারাক্ষণ সমুদ্রের ধারে ধারে নানা জাতের কাঁকড়া শামুক সংগ্রহে ব্যস্ত। ডঃ গুটেনবার্গ গাছপালার জঙ্গল ছুঁড়ে কী খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ডঃ হরিহর গড়গড়ির শরীর ভাল নয়। সামুদ্রিক হাওয়া বাতাস নাকি সয় না। ঘরে চুপচাপ বসে প্রকাণ্ড বই পড়ছেন। ভাগ্যিস পরমেশবাবু এসেছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে ঘুরছি। দুজনে মতলব আঁটছি, শার্ক এসে পৌঁছনোর আগেই একবার জারোয়াদের এলাকায় ঘুরে আসতে পারলে মন্দ হত না। জারোয়ারা আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের এক জংলি উপজাতি। ভারি হিংস্র আর বুনো মানুষ। গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। সভ্য মানুষ দেখলেই নাকি বিষাক্ত তির ছোড়ে। তবে আমরা বেশি কাছে যাব না। ওই এলাকাটা একটু দূর থেকে দেখেই চলে আসব।
