“সার ইখানে উড়িয়ে আছে বটেক!”
শুনেই তাকিয়ে দেখি, সেই সাইকেল-রিকশাওয়ালা। রিকশার ব্রেক কষে সদ্য সামনে থেমেছে। মুখে মধুর হাসি। বললুম, “এই যে ভাই, তুমি শের আলিকে চেনো?”
শের আলির কথা ওকে দেখামাত্র মনে পড়েছিল। ও এই রোগা পাকাটি শরীর অমন চড়াই। রাস্তায় রিকশা তুলতে পারবে না, জানা কথা। কাজেই যদি শের আলির কাছে পৌঁছে দেয়, একটা জিপের আশা আছে। রিকশাওয়ালা বলল, “শের আলি? হ্যাঁ সার, চিনি বটেক।”
“ওর বাড়ি নিয়ে চলো তো।” বলে রিকশায় উঠলুম। রিকশাওয়ালা বলল, “সে তো সার দূর বটেক। রেলের লাইন পেরিয়ে পাঁচ-ছ’ মাইল। ইরিগেশং কুয়াটার বটেক…”
“অত দুরে?”
“হাঁ সার, উদিকে ড্যাম আছে বটেক। তার উত্তুর সাইডে বটেক।”
আরও ভাবনায় পড়া গেল দেখছি। অতদূরে গিয়ে যদি শুনি শের আলি নেই? তার স্যারের মেয়ের অসুখ। যদি সেই ভেবে কর্নেল তাকে বলে থাকেন, জিপের দরকার নেই, এবং কলকাতা যাওয়ার মুখে সেটা বলাই স্বাভাবিক, তা হলে তার স্যার অর্থাৎ ডি. ই. কামালসায়েব কোথাকার মিশনারি হাসপাতালে অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যাওয়ার জন্য এবার নিজের জিপই ব্যবহার করবেন। এই অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। ইরিগেশন কোয়ার্টার থেকে ফিরতে মোট দশ-বারো মাইল–তার মানে, আরও রাত হয়ে যাওয়া।
চুপ করে আছি দেখে রিকশাওয়ালা বলল, “ভাড়া লিয়ে ভাবছেন বটেক!” সে খুব হাসতে লাগল। “বুঢ়াসাহেবের লোক বটেক আপনি। ক্যানে উ ভাবনা গো? চলেন, লিয়ে যাই। যা দিবেন, লিব বটেক।”
খুলে বলাই উচিত মনে করলুম।”দ্যাখো ভাই, যাব আমি ইরিগেশন বাংলোয়। চেনো তো?”
“চিনি বটেক। ড্যামের দক্ষিণে।” রিকশাওয়ালা উৎসাহ দেখিয়ে বলল। “তা হলে শের আলির কথা ক্যানে?”
“তুমি যেতে পারবে ইরিগেশন বাংলোয়?” চরম কথাটি বললুম এবার।
“হাঁ-আ। ঠেইলতে…ঠেইলতে…ঠেইলতে পচে দিব বটেক।” রিকশাওয়ালা বলল। “ই মানিককে দেখে সার ভাবছেন কী বটেক? রেকশায় জম্মো, রেকশায় মরণ হবেক–ই মালিক সিটাই জানে বটেক। চহেন, চল্হেন!” সে প্যাডেলে পায়ের চাপ দিল। চ-এর সঙ্গে একটি হ-বর্ণ উচ্চারণ তার জোরটা জানিয়ে দিল।
কিছুটা এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিতেই সুনসান নিরিবিলি এলাকা। আলো নেই। তারপর হাইওয়ে এবং ক্রমশ চড়াই। ডান দিকে খাপচা-খাপচা ঝুপসি জঙ্গল। তার ওদিকে অনেকটা দূরে ড্যাম। চড়াইয়ের মাথার দিকটায় যেখানে ব্যারেজ শুরু, সেখানেই আলো জুগজুগ করছে।
মানিক রিকশাওয়ালাকে অবশেষে নামতেই হল। এতক্ষণে বাতাস উঠেছে এবং আমরা এগোচ্ছি দক্ষিণে, ফলে সামনে বাতাসের ধাক্কা। বললুম, “ওহে মানিক, বরং আমি হেঁটে যাই।”
সে খুব অবাক হয়ে গেল। “কী ভাবছেন বটেক? পারবে না মানিক?”
“না, না।” একটু হেসে বললুম, “ব্রিজে গিয়ে চাপব। আসলে কী জানো? একলা এই রাস্তায় যেতে একটু কেমন-কেমন লাগে। একজন সঙ্গী চেয়েছিলুম। তুমি আমার সঙ্গী বটেক।”
এতে খুশি হল না, রিকশাচালকের আঁতে ঘা লাগল। একজন খাঁটি পরিশ্রমী মানুষ সে। বলল, “বুলেছি পঁহুছে দিবেক, তো দিবেক বটেক।”
গোঁ ধরে সে হ্যাঁন্ডেল ধরে টেনে নিয়ে চলল। বিচ্ছিরিরকমের চড়াই। বাঁ দিকে প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, ডান দিকে জঙ্গল। জঙ্গলের আড়ালে কিছুটা দূরে মাঝে-মাঝে ড্যামের
জলে তারার আলোর ঝিকিমিকি, ঝিকিমিকি গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ঢেউ উঠেছে জলে।
হঠাৎ দপ করে রিকশার সামনেকার বাতি নিভে গেল। মানিক হাঁসাস করে বলল, “নিভাক! ই মানিকের সার, আলো-আঁধার এক বটেক।”
কিন্তু এটাই আশ্চর্য, এটা হাইওয়ে। অথচ কোনো মোটরগাড়ি এখনও দেখলুম না। ভাবলুম, এটা নেহাত একটা চান্সের ব্যাপার। ঠিক এ সময়টাতে কোনো গাড়ি এখানে এসে পৌঁছচ্ছে না, কিন্তু যে-কোনো সময় দেখা যাবে কোনো ট্রাক বা বাস। হঠাৎ মানিক বলল, “কে বটেক?”
অন্ধকারে দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়েছে ততক্ষণে। রিকশার সামনে কয়েকটা কালো মূর্তি। একজন হুঙ্কার দিয়ে বলল, “একাশি।”
অমনি রিকশা থেকে লাফিয়ে নীচে পড়লুম। পালিয়ে যেতুম, না একহাত লড়তুম, জানি না। রাস্তায় নামতেই আমাকে তারা জাপটে ধরল। ধরেই মুখে টেপ সেঁটে দিল। মানিক চেঁচিয়ে উঠেছিল। তারপরই সে অদ্ভুত নাকিস্বরে গোঁ-গোঁ করতে লাগল। বুঝলুম, তার মুখেও টেপ পড়ে গেছে।
হালদারমশাইয়ের অবস্থাই হল। লোকগুলোর গায়ে সাঙ্ঘাতিক জোর। লড়তে গেলেই আরও বিপদ বাধবে। কী আর করা যাবে? পিঠমোড়া করে বেঁধে কাঁধে তুলল যখন, তখন ঠ্যাং ছুড়লুম না। সন্ধিবিচ্ছেদের জন্য তৈরি হয়ে গেছি। এরা হালদারমশাই বেহাত হয়ে ঠকেছে, অতএব এবার আর দেরি করবে না। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে সেই সন্ন্যাসী লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলুম,
যার হাতে খাঁড়া ছিল। কিন্তু কী যাচ্ছেতাই অন্ধকার। উঁচু ঢিবির ওপর জঙ্গলের ভেতর অন্ধকার একেবারে গাঢ় কালি। অদ্ভুতভাবে মনে একটা কথা ভেসে এল। মুণ্ডু আর ধড় আলাদা হলে রক্ত প্রচুর বেরোবে। কিন্তু রক্তগুলোও লাল দেখাবে না। কালোই দেখাবে।
একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে ওরা থামল। ভারিক্কি গলায় একজন বলল, “কথা আদায় কর! সত্যি কথা না বেরোলে বলিদান।”
অন্য একজন বলল, “কাশী তো হাজতে। বলিদানের খাঁড়াটাও পুলিশের হাতে গচ্চা গেল। বলি, দেবেটা কে?”
