কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ভয় আমারও করছে। সেচ-বাংলোয় ফেরা এবং একা রাত কাটানো–তিনকড়িচন্দ্রের ষণ্ডা লোকদুটো নয়, বারবার সেই খঙ্গধারী সন্ন্যাসী লোকটার চেহারাই মনে ভেসে উঠছিল। শেষে ভাবলুম, থানায় গিয়ে ওসি ভদ্রলোককে বলে পুলিশ-জিপে পৌঁছে দিতে বলব। কল্যাণবাবু খচে আছেন, তার কারণ বোঝা যাচ্ছে। জিপের টায়ার ফঁসানোতে আগুন হয়ে ঘুরছিলেন। মন্দির থেকে নীচের রাস্তা পর্যন্ত নিশ্চয় কাঁদ পাতা ছিল। মাঝখান থেকে রাগটা গিয়ে পড়েছে হালদারমশাইয়ের ওপর।
মুরারিবাবু সমানে তিন-তিরেক্কে কষে চলেছেন। ঘরের ভেতর আঁধার হয়ে আসছে। রমলাবউদি বারান্দার বাতি জ্বালিয়ে একথালা তেলেভাজা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, “এই তিন-তিরেক্কেওয়ালা! আলো জ্বালতে পারোনি?”
সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন নিজেই। মুরারিবাবু নড়ে বসে বললেন, “একাশির ধাক্কা! মাথা ভেভো করছে।” তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন তেলেভাজার ওপর। সংখ্যাতত্ত্ববিদ–কাজেই ঝটপট গুনে ফেললেন। “উরেব্বাস! তিন-তিরেক্কে নয়!”
রমলাবউদি ভেংচি কেটে বললেন, “মুখেরটা গুনেছ? তিন-তিরেক্কে নয় তো করছ। খাও ভাই! চা নিয়ে আসছি। তারপর গল্প করব।”
গরম তেলেভাজা মন্দ নয়। কিন্তু মনে দুর্ভাবনা। ওসি ভদ্রলোক যদি বাইরে গিয়ে থাকেন দৈবাৎ? নাঃ, ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। শিগগির কেটে পড়াই ভালো। মাধবলালকে সাহসী লোক বলেই মনে হয়েছে। বরং পাশের এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরটা খুলে দিতে বলব। জানালা বন্ধ করেও আরামে ঘুমনো যাবে।…
রমলাবউদি চা নিয়ে এলেন। বললেন, “কর্নেলসায়েবকে চিঠির ব্যাপারটা বলেছি। তোমাকে বলি। বিট্টু চিঠি ডাকে দিতে গিয়েছিল। পোস্টাফিসে একটা লোক ওর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে নেয়। বলে, আমি ফেলে দিচ্ছি! পপাস্টবক্সটা দেওয়ালে ফোকরের মতো তৈরি। একটু উঁচুতে মুখটা। চিঠি ফেললে ঘরের ভেতর গিয়ে জমবে। তো বিট্টু চিঠিটা ওর হাতে দিয়েই চলে আসে। অত বুদ্ধি কি ওর আছে?”
বললুম, “বোঝা যাচ্ছে একটা দল এর পেছনে আছে।”
“তিনকড়িবাবুর কীর্তি শুনলুম কর্নেলসায়েবের কাছে। পইপই করে বলে গেছেন, তাকে যেন পাত্তা না দিই। যদি এসে গণ্ডগোল করে পুলিশে খবর দিতেও বলে গেছেন।”
বলে রমলাবউদি জানলার দিকে ঝুঁকে গেলেন। “কে রে? কে ওখানে? দাঁড়া তো, দেখাচ্ছি মজা!”
রমলাবউদি ছুটে বেরিয়ে গেলেন। জানলায় উঁকি মেরে কিছু দেখতে পেলুম না। মুরারিবাবু বললেন, “তিন-তিরেক্তে খেলা! ছেড়ে দিন! বউদির দিনদুপুরে ভূত দেখা অভ্যেস আছে। নামেই তিন-ব্যঞ্জন কিনা! র+ম+ল।”
ভদ্রমহিলার সাহস আছে! জানলা দিয়ে দেখলুম, টর্চ আর একটা মস্ত কাটারি হাতে পেছনের পোড়ো জমিটায় চক্কর দিচ্ছেন। আমি এভাবে বসে থাকা উচিত মনে করলুম না। বেরিয়ে গিয়ে উঠোনে নেমেছি উনি ফিরে এলেন। বললেন, “কে যেন দাঁড়িয়ে ছিল জানলার ওধারে। ঠাকুরপোকে বলব, ছাদের চারদিকে বাল্ব লাগাতে।”
একটু ইতস্তত করে বললুম, “আমাকে বাংলোয় ফিরতে হবে, বউদি! ওদিকে যেতে নাকি সন্ধ্যার পর রিকশা বা ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায় না।”
রমলাবউদি বললেন, “হ্যাঁ, চড়াই রাস্তা। তার ওপর বিরুর দাদা মার্ডার হওয়ার পর ওদিকের রাস্তায় কেউ পারতপক্ষে যেতে চায় না। এ তো ভাই তোমাদের কলকাতা শহর নয়। নামেই টাউন। মানুষজনের মনে রাজ্যের কুসংস্কার।”
একটু হেসে বললুম, “কুসংস্কার কলকাতাতেও কম নেই। তো, চনি বউদি!”
“মুরারিঠাকুরপোর সবসময় পাগলামি করতে লজ্জা হয় না?” রমলাবউদি তেড়ে গেলেন। “তখন তো আমার গেস্ট বলে খুব জাঁক দেখাচ্ছিলে! গেস্টকে পৌঁছে দিতে হবে না?”
তাড়া খেয়ে মুরারিবাবু বেরোলেন। মুখে অনিচ্ছার ভাব। চুপচাপ হাঁটতে থাকলেন। আমরা এবার বাজারের দিকে চলেছি। একটু পরে মুরারিবাবু বললেন, “আমি, কিন্তু, বুঝলেন বাংলো অবধি যাচ্ছি না। কেন জানেন? বউদিকে গার্ড দিতে হবে। জানলার পেছনের লোকটা…একাশি! তিন-তিরেক্কে করে দিলেই হল। মেয়েরা একা না বোকা। বুঝলেন না?”
“বুঝলুম।” হাসবার চেষ্টা করে বললুম, “অন্তত একটা এক্কাগাড়ি কোথায় পাব, দেখিয়ে দিন বরং।”
“পেয়ে যাবেন। ওই তো রাস্তা। কত লোক, কত গাড়িঘোড়া। ভয়টা কীসের?” বলে মুরারিবাবু বাঁই করে ঘুরে হনহন করে গলিপথে নিপাত্তা হয়ে গেলেন। সম্ভবত তিন-তিরেক্কে নয়–এই নয়টা ‘না’-অর্থব্যঞ্জক। অর্থাৎ স্রেফ না হয়ে যাওয়া। নঞর্থক হওয়া মানেই সন্ধিবিচ্ছেদ। ধড় এবং মুণ্ডু পৃথক হয়ে যাওয়া। সোজা কথায় খতম। তখন শিবের চেলা হয়ে ঘোরো। প্রেতাত্মা বা ভূত হয়ে যাও। সর্বনাশ!
গলিটা যেখানে বড় রাস্তায় পৌঁছেছে, সেখানে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একাগাড়িই খুঁজছিলুম। কারণ সাইকেল-রিকশা চড়াই ঠেলে ওদিকে যাবে না শুনেছি। ইতিমধ্যে রূপগঞ্জের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কিত মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেছে। আসলে এই জনপদটা কোনো যুগে নদীর তীরে একটা পাহাড়ের মাথা সমতল করে গড়ে উঠেছিল। তাই পশ্চিম ঘরে যে হাইওয়েটা নদীর সমান্তরালে বিহারের দিকে দক্ষিণে এগিয়ে গেছে, সেটা টানা চড়াই। ব্যারেজের মোড়ে পৌঁছলে আর চড়াই ভাঙতে তত হবে না। ব্রিজের ওপরটা স্বভাবত সমতন। তারপর সেচ-বাংলো পর্যন্ত যেটুকু চড়াই, সেটুকু সামান্যই।
