মুরারিবাবুরও প্রচণ্ড তাড়া। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়েই বেরোলাম বাংলো থেকে। হালদারমশাই মন্দ বলেননি। কর্নেল ফেরার আগেই রহস্যভেদ এবং খুনে-লোকগুলোকে পাকড়াও করিয়ে দিয়ে তাক লাগানোর চান্স ছাড়া ঠিক নয়।…
এবার মুরারিবাবু আমাদের গাইড। হাইওয়ের ওধারে উঁচু জঙ্গুলে ঢিবিতে উঠে হালদারমশাই বললেন, “আগে সেই দেউড়ি!”
মুরারিবাবুর পেছন-পেছন ঘন জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর হাঁটছিলুম। এখনই জায়গাটা আবছা আঁধারে ভরে গেছে। এবেলা বাতাস বন্ধ। গুমোট গরম। নিঝুম বন আর ধ্বংসাবশেষে ঝিঁঝিপোকা আর পাখির ডাককে মনে হচ্ছে স্তব্ধতারই একটা আলাদা স্বাদ। নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠছি। কিছুক্ষণ পরে খোলা একটা জায়গায় পৌঁছলুম। এবার সামনে সেই ভাঙা তোরণ দেখতে পেলুম।
হালদারমশাই বললেন, “কোথায় বডি পড়ে ছিল, দেখিয়ে দিন।”
মুরারিবাবু দেউড়ির ওধারে গিয়ে পাঁচিলের নীচে একটা জায়গা দেখালেন। “এইখানে উপুড় হয়ে পড়েছিল নকুলদা।” একটু তফাতে গিয়ে ওপরে আঙুল তুলে বললেন, “আর ওইখানে তিন-শিঙে ছাগলটা..”।
কথা শেষ না হতেই দেউড়ির ওপরে তিন-শিঙে সেই কালো ছাগলের মুণ্ডু ঝোঁপ ফুড়ে বেরোল এবং অদ্ভুত গলায় বলে উঠল, “এ-কাশি!”
সঙ্গে-সঙ্গে মুরারিবাবু তখনকার মতোই দিশেহারা হয়ে মন্দিরের দিকে ঘুরেছিলেন। কিন্তু তখনই হালদারমশাই “তবে রে” বলে রিভলভার বের করে ঢিসুম আওয়াজে গুলি ছুড়লেন। একঝাক টিয়া চাঁচাতে-চাচাতে পালিয়ে গেল। ছাগলের মুণ্ডুটা ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
হালদারমশাই রিভলভার তাক করে আবার কিম্ভুত প্রাণীটিকে খুঁজছেন, সেই সময় হইহই করে একদঙ্গল লোক আর কল্যাণবাবু দু’জন বন্দুকধারী সেপাইসহ এসে পড়লেন। মুরারিবাবুও তাদের সঙ্গে আছেন। কল্যাণবাবু আমার দিকে না-তাকিয়ে সোজা হালদারমশাইকে চার্জ করলেন, “আর য়ু মিঃ কে. কে. হালদার, দা প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”
হালদারমশাই সগৌরবে এবং সহাস্যে বললেন, “ইয়েস, আই অ্যাম!”
“ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। কাম উইথ মি।”
“হোয়াই?” বলে হালদারমশাই পকেট থেকে তাঁর আইডেনটিটি কার্ড বের করলেন। কিন্তু কল্যাণবাবুর ইশারায় সাদা পোশাকের পুলিশ এবং বন্দুকধারী সেপাইরা তাকে ঘিরে ধরল। কল্যাণবাবু বললেন, “গিভ মি ইওর আর্মস, প্লিজ!”
বোবা হয়ে গেলেন হালদারমশাই। রিভলভারটি কল্যাণবাবুর হাতে সঁপে দিয়ে ফোঁস করে একটি শ্বাস ছাড়লেন।
আমি বললুম, “এ কী হচ্ছে কল্যাণবাবু? কর্নেল তো আর…”
আমাকে থামিয়ে রূপগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার গম্ভীর মুখে বললেন, “আই অ্যাম অন ডিউটি মিঃ চৌধুরী! প্লিজ ডোন্ট ইন্টারভেন।”
হালদারমশাই ব্যহবেষ্টিত হয়ে গোমড়ামুখে চলে গেলেন। ভিড়টা সরে গেলে মুরারিবাবু ফিসফিস করে বললেন, “কিছু বুঝতে পারলুম না! তিন-তিরেক্কে হয়ে গেল কেন বলুন তো? আমি তো শুধু তিন-শিঙে…” বলে বুকে ও কপালে হাত ঠেকালেন। “শিব! শিব! বাবা গো!” বিড়বিড় করে এই মন্ত্র জপতে জপতে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন।
জিজ্ঞেস করলুম, “আমরা যাচ্ছি কোথায়?”
“আমার ডেরায়।” ভয়ার্ত মুখে মুরারিবাবু বললেন। “আসলে কী জানেন? ওই ডিটেকটিভদ্রলোকের পাশাপাশি দুটো তিন বড্ড গণ্ডগুলে নম্বর। শেষ পর্যন্ত বেঁচে যাবেন। তবে বেশ ভোগাবে। চলুন, বউদির সঙ্গে গল্প করতে-করতে তেলেভাজা খাব। আর তো কিছু করার নেই।”
শটকার্টে নিয়ে যাচ্ছিলেন মুরারিবাবু। এবার একটা করে একলা পোডোভাঙা বাড়ি আর ঝোঁপঝাড়, কিছু উঁচু গাছ। হানাবাড়ি মনে হচ্ছিল কোনো-কোনো বাড়িকে। হঠাৎ কোত্থেকে ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক ভেসে এল। মুরারিবাবু পালাতে যাচ্ছেন, ওঁকে পেছন থেকে ধরে ফেললুম। মুরারিবাবু হাঁসফাস করে বললেন, “পা চালিয়ে চলুন। এসব বাড়ি হানাবাড়ি। লোকজন নেই।”
বাঁ দিকে তাকাতেই একটা বাড়ির পেছনে সেই ছেলেটি, বিট্টুকে দেখতে পেলুম। বুঝলুম ব্যা-ডাক কে ডেকেছে। কিন্তু সাহস আছে তো বিট্টুর! এই হানাবাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একা।
বললুম, “মুরারিবাবু, ওই দেখুন ব্যাকরণ রহস্য!”
মুরারিবাবু দেখামাত্র চাঁচালেন।”পাজি, বাঁদর, ভূত, সবসময় খালি…এবার এসো ‘জ্যাঠাকমশাই, দিন না ঘুড়িটা পেঁড়ে’ বলে কাঁদতে।”
বিট্টু জিভ দেখিয়ে উধাও হয়ে গেল।
মুরারিবাবু শাসালেন। “বিষ্ণুদাকে বলে তিন-তিরেক্কে করে দিচ্ছি, থামো!”…
বিরুর বউদি মুরারিবাবুর সাড়া পেয়ে সদর দরজা খুললেন। আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে বললেন, “এসো জয়ন্ত ঠাকুরপো! কর্নেলসায়েব এসেছিলেন সওয়া চারটে নাগাদ। বলে গেলেন, কলকাতা থেকে কাল ফিরবেন। বিরুকে পাঠিয়ে তোমার খোঁজ নিতে বললেন! এসো, ভেতরে এসো।”
মুরারিবাবু বললেন, “আমার গেস্ট। আমার ঘরে বসাই, বউদি! গরম-গরম তেলেভাজা খাওয়াব বলে নিয়ে এলুম।”
রমলাবউদি চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোমার ঘরের যা ছিরি করে রেখেছ! থাক্। এ-ঘরে এসো জয়ন্ত!”
কোনো-কোনো মানুষ থাকেন, মনে হয় কতদিনের চেনা। এক মুহূর্তে আপনার জন হয়ে ওঠেন। আসলে এটা পরকে আপন করে নেওয়ার স্বভাব। রমলাবউদি সেইরকম মানুষ। নকুলবাবুর জাদুঘরে আমাদের বসিয়ে তেলেভাজা করতে গেলেন। বিরুর নাইট ডিউটি। একটু আগেই বেরিয়ে গেছে। মুরারিবাবু খ্যাক করে হেসে বললেন, “ডিটেকটিভবাবুকে অ্যারেস্ট করল কেন বলুন তো? গুলি ছোঁড়ার জন্য তিন-তিরেক্তে হয়ে গেলেন? তা যাই বলুন, গুলি ছোঁড়াটা উচিত কাজ হয়নি। বাবার সাক্ষাৎ-অবতার। আমার বড় ভয় করছে, জানেন?”
