সমানে বকবক করতে থাকলেন মুরারিবাবু। মাধবলাল দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। পাগলাবাবুকে দেখেই তার হাসি পায় মনে হল।
এই পাগলাবাবুর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করা যাক।”বসুন, আসছি,– বলে উঠে ঘরে গেলুম। তারপর উত্তরের জানালায় গিয়ে বিদঘুঁটে স্বরে ডাকলুম, “ব্যা-অ্যা-অ্যা!”
অমনি মুরারিবাবুর খ্যাক খ্যাক কানে এল। অর্থাৎ ভয় পাননি, হাসছেন। ঘরে ঢুকে সহাস্যে বললেন, “বারেবারে আর ভুল হবে না। তবে খুব আনন্দ হল জয়ন্তবাবু! আপনি রসিক লোক। আমার খুব পছন্দ।” তারপর বসে বকবক শুরু করলেন।
কিছুক্ষণ পরে বাইরে হালদারমশাইয়ের ডাক শোনা গেল, “জয়ন্তবাবু, আইয়া পড়ছি।”
.
ছয়
বেরিয়ে গিয়ে দেখি, গেটের ওধারে একটা এক্কা ঘোড়াগাড়ি থেকে লাফ দিয়ে সবে নেমেছেন হালদারমশাই। মাধবলাল ঘোড়ার গাড়িকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। গাড়িটা চলে গেল। হালদারমশাই বললেন, “কর্নেলস্যারের লগে রাস্তায় দ্যাখা হইল।”
মুরারিবাবু হালদারমশাইকে দেখে অভ্যাসমতো খ্যাক করলেন। বললেন, “তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে…আর কর্নেলসায়েব গাছে চড়ালেন…মশাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়নি। আপনাকে কেন তিনকড়িদা গর্তে ঢুকিয়ে বলি দিতে চাইছিল বলুন তো?”
বারান্দায় বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটু চটে গিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে কলকাতায় কর্নেলস্যারের ঘরে দেখেছেন। এখন বলছেন, পরিচয় হয়নি। আপনার জন্যই আমার আজ…”
ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললুম, “সন্ধিবিচ্ছেদ হয়ে যেত ব্যাকরণমতে।”
হালদারমশাই অনিচ্ছায় হাসলেন। “হ্যাঁ, ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হতে বসেছিল।”
জিভ চুকচুক করে দুঃখ দেখিয়ে মুরারিবাবু বললেন, “আহা রে! তিনকড়িদাটা মহা ধড়িবাজ। তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশির খেলা আর কি!”
“একাশি!” গোয়েন্দাপ্রবর নড়ে বসলেন। বেতের চেয়ার মচমচ করে উঠল। “আমাকে যারা বন্দী করে বলি দিতে যাচ্ছিল, তারাও একাশি বলেছিল। ব্যাপারটা কী?” বলে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন মুরারিবাবুর দিকে।
মুরারিবাবু কিছু বলার আগে তাঁকে ঝটপট হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিলুম। শোনার পর মুরারিবাবু খুব খুশি হয়ে বললেন, “তা হলে আর চিন্তা নেই। ডিটেকটিভ ডিটেকটিভে ছয়লাপ। যাবে কোথায়? নকুলদা, খুনের কিনারা হবে। সোনার মোহরভর্তি ঘড়াও বেরোবে। তিনপুরুষে তিন-তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশির মামলা। সবরকম কোঅপারেশন পাবেন স্যার!”
মাধবলালকে চা করতে বললুম। হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “জয়ন্তবাবুর লগে দুইখান কথা আছে।” তারপর আমার হাত ধরে ঘরে ঢুকে ফিসফিস করলেন, “সঙ্গে রিভলভার আছে। আর ভয় নেই। কর্নেলস্যার নিজের লাইনে চলুন, আমরা বলি নিজের লাইনে। কী কন?”
বললুম, “কর্নেল কলকাতা গেলেন। কাল দুপুরের মধ্যে ফিরবেন।”
“অ্যাঁ!” বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন হালদারমশাই। চোখের পাপড়ি কাঁপতে থাকল।
“হ্যাঁ। আমাকে বলে গেছেন কোথাও যেন না বেরোই।”
“এটা কি একটা কথা হইল? আপনে পোলাপান নাকি? ছাড়েন তো!” কিটব্যাগ টেবিলে রেখে হালদারমশাই ভেতর থেকে রিভলভার আর গুলি বের করলেন। ছ’টা গুলি খোপে ঢুকিয়ে অস্ত্রটা ঢোলা প্যান্টের পকেটে রাখলেন। তারপর নস্যির কৌটো বের করে বললেন, “এই নস্যির জন্য লাঞ্চের নেমন্তন্ন খেতে আসতে পারিনি। যাকগে, এখন তো কর্নেলস্যারের খাটেই তা হলে আমার শোয়ার জায়গা হবে।”
মুরাবিবাবু আপনমনে তিন-তিরেকে করতে করতে নীচের লনে ফুল দেখে বেড়াচ্ছেন আর সম্ভবত ফুলেদের ভূত-ভবিষ্যৎ গণনা করছেন। মাধবলাল নজর রেখেছিল। কিচেন থেকে হাঁক ছাড়ল, “এ বাবুমোশা! ফুলউলসে হাত মাতৃ লাগাইয়ে।”
মুরারিবাবু চটে গিয়ে বললেন, “ক্যা ফুল দেখাতা হ্যায় তুম?…হুঁ! মা-ধ-ব-লা-ল! পঞ্চব্যঞ্জন হ্যায়। স্রিফ পাঁ-চ। সমঝতা? তিনোসে নেহি আতা! তিন ঔর দো–ব্যস! তিন কাটা যায়েগা, দো রহেগা!” বলে বুড়ো আঙুল নেড়ে দিলেন। “অঙ্কের বাইরে পড়ে গেছ, সমঝা?”
হাসি চেপে বললুম, “তা হলে আমাদের ডিটেকটিভদ্রলোকের নামের হিসেবটা করে দিন মুরারিবাবু। সংখ্যাতত্ত্ব অনুসারে…।
বাধা দিয়ে মুরারিবাবু বললেন, “পুরো নাম?”
হালদারমশাই খুব আগ্রহ দেখিয়ে বললেন, “নিউমারোলজি? আপনি জানেন? তাই বলুন! আমার নাম কৃতান্তকুমার হালদার।”
চা আসতে-আসতে হিসেব কষে ফেললেন মুরারিবাবু। “একাদশ ব্যঞ্জন। …হুঁ, একটু গণ্ডগুলে নম্বর। সেইজন্যই খাঁড়ার ঘা প্রায় এসে পড়েছিল! …আরে তাই তো! এগারোকে তিনগুণ করলে তে-তিরিশ। দু-দুটো তিন পাশাপাশি। আপনাকে মারে কে? সেই তো! আপনাকে পাঁঠাবাঁধা করে বেঁধে গর্তে ফেলে খাঁড়ায় শান দিতে গিয়ে দেরি হতই। হয়েছে।”
বলে ফুঁ দিয়ে সশব্দে চা টানলেন। মাধবলালকে ডেকে বললুম, “ডরো মাত্ মাধবলাল! হাম হিসাব কার দেতা। তিন পাঁচ পরোহ। এক পাঁচ। এক ঔর পাঁচ ছে। ইসমে দো তিন হ্যায়!”
মুরারিবাবু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চাপা খ্যাক করলেন। মাধবলাল চলে গেলে ফিসফিস করে বললেন, “ভয় দেখাচ্ছিলুম। বুঝলেন না? তিন নেই কোথায়? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তিনের খেলা। তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশি।”
বুঝলুম চা পেয়ে খুশি হয়েছেন খুব। রিয়ে-তারিয়ে চা শেষ করে ফের বললেন, “চলুন ডিটেকটিভমশাই!”
হালদারমশাই উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও টেনে ওঠালেন। সাহস দিয়ে বললেন, “সঙ্গে উইন্ আছে। চলে আসুন! কর্নেলসারেরে দেখাইয়া দিমু…এমন চান্স আর পাইবেন না। কাইল আইয়া দেখবেন…” বলে ভুরু নাচিয়ে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, কী ঘটবে।
