এ পর্যন্ত শুনেই কে জানে কেন, আতঙ্কে বুক ধড়াস করে উঠল। এতক্ষণে মনে হল, ভাঙা দেউড়িতে উঠে এবং সুড়ঙ্গপথে নেমে কী সাঙ্ঘাতিক গোঁয়ার্তুমি না করেছি! অমন বিপজ্জনক ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হয়নি। তার চেয়ে ভয়ানক ব্যাপার, আমি সেই প্রাণীরূপী অবতারের অলুক্ষুনে ব্যা-ডাক শুনেছি। দিনদুপুরে বুক ঢিপঢিপ করতে থাকল।
বাংলোয় পৌঁছে আড়াইটে অবধি অপেক্ষা করেও হালদারমশাইয়ের দেখা পাওয়া গেল না। কর্নেল নকুলবাবুর নোটবইটা নিয়ে প্রতিটি পাতা আতস কাঁচ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। নিজের নোটবইতে কী সব টুকলেনও। মুখটা গম্ভীর, এবং মাঝে-মাঝে তিতিবিরক্ত ভাব ফুটে বেরোচ্ছিল। কয়েকবার হালদারমশাইয়ের না আসার কথাটা তুললুম। কানেই নিলেন না।
খাওয়ার পর সবে শুয়েছি, ভাতঘুমের বাঙালি অভ্যাস, কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন, হঠাৎ তড়াক করে উঠে বসলেন। তারপর সেই নোটবইটা খুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “জয়ন্ত, জয়ন্ত, গুপ্তধন গুপ্তধন!”
বিরক্ত হয়ে বললুম, “এখানে গুপ্তধন কোথায়?”
গোয়েন্দাপ্রবর আমাকে টেনে ওঠালেন এবং বারান্দায় নিয়ে গেলেন। বেতের চেয়ারে বসে বললেন, “বোসো ডার্লিং! সত্যিই গুপ্তধনের সঙ্কেত-লেখ আবিষ্কার করেছিলেন নকুলবাবু। মুরারিবাবু ইচ্ছেমতো আঁকিবুকি কেটে গণ্ডগোেল বাধিয়েছেন। তবে আমার সৌভাগ্য, সঙ্কেত-লিপিটা অন্য একটা পাতায় ঠিকই আছে। আতস কাঁচের সাহায্যে অবিকল কপি করেছি। এই দ্যাখো।”
কর্নেল তার নিজের নোটবইয়ের একটা পাতা খুলে দেখালেন। কিছুই বুঝতে পারলুম না। কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং একেই বলে।
বললুম, “মাথামুণ্ডু নেই! এ কী অদ্ভুত লিপি!”
কর্নেল বললেন, “এটা একটা শিলালেখ থেকে অবিকল কপি। খানিকটা অংশ ভেঙে গিয়েছিল। এই শিলালেখটা নকুলবাবুর ঘরে আছে কি না দেখা দরকার। তবে একটা ব্যাপার আশ্চর্য! ব্রোঞ্জের সিল বা মুদ্রাটির লিপির সঙ্গে এর হুবহু মিল। তুমি নিজেই দ্যাখো।”
পরীক্ষা করে দেখে বললুম, “একই লিপি বলে মনে হচ্ছে।”
কর্নেল চিন্তিতমুখে বললেন, “লিপিটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই ঠিক করতে পারছি না।..না, ব্রাহ্মীলিপি নয়। কিন্তু ব্রাহ্মীর সঙ্গে প্রচুর মিল।”
বলে আবার কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন এবং টাকে হাত। তারপর চোখ খুলে বললেন, “জয়ন্ত! এখনই শের আলি জিপ নিয়ে এসে পড়বে। …হঁ, ওই আসছে। তুমি এক কাজ করো। বাংলো ছেড়ে বিশেষ বেরিও না। আমি নকুলবাবুর বাড়ি হয়ে থানায় যাব। তারপর পুলিশের জিপে কলকাতা…”
ছটফটিয়ে বললুম, “না, না। আমিও যাব।”
কর্নেল হাসলেন। “কাল দুপুরের মধ্যে এসে পড়ব, ডার্লিং! প্রাচীন লিপিটার পাঠোদ্ধার খুব জরুরি। তুমি হালদারমশাইয়ের সান্নিধ্যে আশা করি ভালোই কাটাবে। ভেবো না, ওঁর কাছে রিভলভার আছে।”
“কিন্তু ওঁকে পাচ্ছি কোথায়?”
“পাবে।” কর্নেল আশ্বস্ত করলেন। ধারালো খাঁড়া দেখার পর হালদারমশাই আর বেপরোয়া হবেন না। আমার বিশ্বাস!..আরে! শের আলির জিপে মুরারিবাবু এসেছেন দেখছি। ভালোই হল। ততক্ষণ ওঁর সান্নিধ্যে কাটাও।”
কর্নেল ঘরে ঢুকলেন পোশাক বদলাতে। গেট খুলে দিল মাধবলাল। জিপ এসে বারান্দার ধার ঘেঁষে দাঁড়াল। মুরারিবাবু এক লাফে নেমে সহাস্যে বললেন, “তখন একটু গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল।–ইয়ে আপনার নামটা কী যেন…”
“জয়ন্ত চৌধুরী।”
মুরারিবাবু খ্যাক করলেন। “ঘরপোড়া গোরু। সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরায়, বুঝলেন না? কর্নেলসায়েব কই? ঘুমোচ্ছেন বুঝি? থাক, ঘুম ভাঙাব না। আপনার সঙ্গেই গল্পগুজব করা যাক। তিন তিরেক্কে নয়…দাঁড়ান। আপনার নামের নম্বর-ইউনিট বের করি। বগীয় জ…” আঙুল গুনতে শুরু করলেন উনি। হিসেব শেষ হলে বললেন, “সপ্ত ব্যঞ্জন। সাত। সাত তিনে একুশ। দুইয়ের পিঠে এক। তা হলে দুই যুক্ত এক সমান তিন। সেই তিন! যাবেন কোথায় আপনি? আমার নামও দেখুন। মুরারিমোহন ধাড়া। অষ্ট ব্যঞ্জন। আটকে তিন দিয়ে গুণ করুন। চব্বিশ হল। দুইয়ের পিঠে চার চব্বিশ। তা হলে দুই যুক্ত চার, সমান ছয়। ছয়কে আধখানা করুন। সেই তিন। হল তো?”
বলে এবার দু’বার খ্যাক করলেন। বড় বিপদে পড়া গেল দেখছি। এঁকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে কর্নেল কেটে পড়লে আমার অবস্থা হালদারমশাইয়ের চেয়ে করুণ হবে।
কর্নেল বেরিয়ে এলেন কাঁধে কিটব্যাগ, গলায় বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলিয়ে। মাথায় ছাইরঙা টুপি। শের আলি স্যালুট দিল। মুরারিবাবুও উঠে কতকটা একই ভঙ্গিতে কপালে হাত ঠেকালেন। উনি কিছু বলার আগেই কর্নেল বললেন, “জয়ন্তর সঙ্গে গল্প করুন মুরারিবাবু! আমি আসছি।”
তারপর সোজা গিয়ে জিপে উঠলেন এবং শের আলি তাকে নিয়ে গর করে বেরিয়ে গেল। তুম্বো মুখে বসে রইলুম। কোনো মানে হয়?
মুরারিবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “কী কাণ্ড! কিছু বোঝা গেল তো?” বললুম, “বুঝতে হলে ফলো করুন মুরারিবাবু!”
মুরারিবাবু বললেন, “মাথা খারাপ? শের আলির জিপ না, রকেট। ওই দেখুন, কোথায় চলে গেছে। যাঃ! হারিয়ে গেল। শের আলি–চার ব্যঞ্জন। তিন গুণ করুন। বারো হল। বারোর অর্ধেক ছয়। ছয়ের অর্ধেক তিন। সেই তিন! যাবেন কোথায় মশাই? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অণু-পরমাণু চলছে অঙ্কে। তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশি। শিবের জীব বলেছিল, একাশি।”
