হঠাৎ কর্নেল বললেন, “চুপ!” তারপর ইশারায় গাছটার পেছনে ঝোঁপের আড়ালে লুকোতে বললেন। নিজেও এসে ঘাপটি পেতে বসলেন আমাদের সঙ্গে!
দেখলুম, ওদিকে জঙ্গলের ভেতর স্তূপটার দিকে এগিয়ে চলেছে চারজন লোক। একজন সেই তিনকড়িচন্দ্র–হাতে ছড়ি, দু’জন ষণ্ডামার্কা লোক, অপরজন সেই সন্ন্যাসীবেশী লোকটা, সে মন্দির প্রাঙ্গণে নেচে-নেচে গান গাইছিল। কিন্তু এখন তার হাতে একটা চকচকে ধারালো খাঁড়া। হালদারমশাইকে শিউরে উঠে চোখ বুজতে দেখলুম। আমিও আঁতকে উঠে চোখ বুজেছিলুম, আর দেরি করলে কী হত ভেবেই। কর্নেল মিটিমিটি হাসছিলেন।
গাছের ডগা থেকে মুরারিবাবুও ওদের দেখতে পেয়েই চুপ করে গেছেন। ডালের সঙ্গে সেঁটে রয়েছেন কাঠবেড়ালির মতো।
দীর্ঘ মিনিট-পাঁচেক পরে তিনকড়িচন্দ্রকে আবার দেখা গেল। মুখে রোদ পড়েছে, সেজন্যও নয়, রাগে ও ব্যর্থতায় মুখটা দাউদাউ জ্বলছে। সন্ন্যাসীবেশী লোকটা খাঁড়ার উলটো দিক কাঁধে রেখে দাঁত কিড়মিড় করছে। ষণ্ডামার্কা লোক দুটো হাত-মুখ নেড়ে কী বলছে এতদূর থেকে শোনা যাচ্ছে না।
তারপর তারা খোলামেলা জায়গাটার দিকে এগিয়ে এল। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল, মুরারিবাবুর জুতো দুটো চোখে পড়লে ওরা কী করবে? কিন্তু কিছুটা এগিয়ে আসতেই কর্নেল অদ্ভুত গলায় শব্দ করলেন, “ব্যা-অ্যা-অ্যা!”
অমনি প্রথম খাঁড়াধারী সন্ন্যাসী লোকটা “ওরে বাবা!” বলে আর্তনাদ করে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ষণ্ডামার্কা লোক দুটোও আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে দুই দিকে ঝোঁপজঙ্গল ফুঁড়ে উধাও হয়ে গেল। তিনকড়িচন্দ্র হকচকিয়ে গিয়েছিল প্রথমে। কর্নেল আবার “ব্যা-অ্যা” ডাক ডাকতেই সেও ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে পিটটান দিল।
তারপর যা ঘটল, তা আরও তাজ্জব ঘটনা। মুরারিবাবু তরতর করে গাছ থেকে নেমে এসে জুতো দুটো হাতে নিলেন এবং “এ ব্যা তো সে ব্যা নয়”, বলে দৌড়ুলেন। চোখের পলকে তিনিও উধাও হয়ে গেলেন।
কর্নেল বললেন, “হুঁ, ব্যাকরণ রহস্য।”
আমি বললুম, “পাগল, পাগল।”
হালদারমশাই বললেন, “ছাগল, ছাগল!”
কর্নেল উঠে গিয়ে মুরারিবাবুর পেড়ে দেওয়া দুটো অর্কিড কুড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, “নাঃ! ছিঁড়ে ফেলেছেন গোড়াটা। এভাবে অর্কিড বাঁচানো যায় না। যাকগে, পরে দেখা যাবে। চলুন হালদারমশাই, আপাতত এই পর্যন্ত। ফেরা যাক।”
হাইওয়েতে নেমে কর্নেল হালদারমশাইয়ের বৃত্তান্তটি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “এবেলা বরং আমার গেস্ট হোন। রেস্ট নিয়ে তারপর রেস্টরুম থেকে আপনার ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে আসবেন। জিপের ব্যবস্থা করা যাবে।”
হালদারমশাই মাথা নেড়ে মাতৃভাষায় বললেন, “না, কর্নেলস্যার! এখনই রেস্টরুমে যাইয়া ব্যাগটা লইয়া আসি। আমার খাবারটা রেডি রাইখেন বরং। উইপন্ হাতে না লইয়্যা বারাইলে কী হয়, ট্যার পাইছি।”
বলে হনহন করে আমাদের ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন, “ভাগ্যিস নকুলবাবুর নোটবইটাতে ওই স্তূপটার উল্লেখ ছিল এবং গর্তটার কথাও লেখা ছিল। নইলে সত্যিই হালদারমশাই বলি হয়ে যেতেন! আসলে আমি ভেবেছিলুম কথামতো ওঁকে অ্যারেস্ট করে থানার লক-আপে সাদরে রাখা হবে, ওঁর নিরাপত্তার জন্যই। কিন্তু থানায় গিয়ে দেখলুম তা করা হয়নি। থানায় আমার যাওয়া অবধি ওঁর বেঁচে থাকার চান্স পুরোপুরি ছিল অবশ্য। কিন্তু আমি মন্দিরে গিয়ে যখন ত্রিশূল রহস্য ফাঁস করছি, তখন লক্ষ করলুম, দরজার কাছে কান পেতে ওই সন্ন্যাসী লোকটি আমার কথা শুনছে। অমনি মনে হল, এবার বন্দী হালদারমশাইয়ের বিপদ আসন্ন। ওরা ধরেই নিয়েছে বা কলকাতা পর্যন্ত মুরারিবাবুকে ফলো করে টের পেয়েছে, আমরা যাচ্ছি এবং হালদারমশাই আমাদেরই লোক।”
বললুম, “তা হলে মন্দির থেকে সোজা স্কুপে এলেন না কেন?”
কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমাকে বরাবর বলেছি ডার্লিং, তুমি সাংবাদিক। কিন্তু ভালো সাংবাদিক হতে গেলে ভালো পর্যবেক্ষক হওয়া দরকার। সন্ন্যাসী লোকটা আমাদের পেছন-পেছন এসেছিল। আমরা রিকশায় চাপলে সেও একটা রিকশায় চেপেছিল। ভাবলুম আমাদের ফলো করছে। কিন্তু ধাড়া ট্রেডিং কোম্পানির দোকানের সামনে সে রিকশা থেকে নামল! তখন বুঝলুম সে তিনকড়িবাবুকে খবর দিতে যাচ্ছে।”
বলে কর্নেল সেই নোটবইটা খুলে দেখালেন। “এই দ্যাখো, এরিয়া-ম্যাপ। এই হাইওয়ের বটতলা থেকে উঠলে স্তূপটা খুঁজে বের করা সোজা। মন্দিরের দিক থেকে এগোলে অনেকগুলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এই বিশেষ স্তূপটা খুঁজে বের করা কঠিন হত। যাই হোক, মুরারিবাবু জুতো দুটো আমাকে পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করেছিল।”
ব্যারেজের ব্রিজে পৌঁছে জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার ব্যা-ডাক শুনে অমন আতঙ্কের কারণ কী বলুন তো?”
কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে জলাধারের পাখি দেখতে দেখতে বললেন, “তিন-তিরেকে নয়, নয় নয়ে একাশি। একাশিতেই ব্যাকরণ রহস্য বা ব্যাকরণ রহস্য যাই বলো, লুকনো আছে।”
“প্লিজ, হেঁয়ালি নয়।”
“তোমাকে তা হলে প্রাচীন ভারতীয় মিথলজি পড়তে হবে। শিবকে পশুপতি বলা হয়। মহেনজো-দরোর একটি সিলে পশুপতিদেবের মূর্তি পাওয়া গেছে। তাঁর শিং আছে। কোননা কোনো পণ্ডিতদের মতে তিনটে শিং ছিল। একটা শিং ক্ষয়ে গেছে। তিনটে শিং নাকি ত্রিশূলের প্রতীক। শৈবযুগে এ-অঞ্চলে তিন-শিংওয়ালা ছাগলরূপী পশুপতিদেবের পুজো হত। সেটা ব্রোঞ্জের চাকতিতে দেখেছ। শিবসিংহের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষে এখনও নাকি কৃষ্ণপক্ষে পশুপতিদেবের সেই অবতার দেখা দেন এবং ব্যা-ডাক ডাকেন। এই ডাক নাকি ভীষণ অলুক্ষুনে। শুনলেই অমঙ্গল। নকুলবাবু তিনশিঙে ছাগল সত্যিই দেখেছিলেন এবং আমরাও আজ স্বচক্ষে দেখেছি।”
