কর্নেল টর্চের আলো ফেললেন গর্তের ভেতর। ফুট পাঁচ-ছয় নীচে ঊর্ধ্বমুখী একটা মাথা–মানুষেরই মাথা এবং জ্যান্ত মাথা। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আমাদের দেখছে। মুখে টেপ সাঁটা।
ক্রমে চোখে পড়ল পিঠমোড়া করে দুটো হাত বাঁধা। পা দুটো ভোলা। কিন্তু যোগীর আসনে যেন বসে রয়েছে। মুরারিবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “ধ্যাত্তেরি, কিসের বদলে কী! একাশির বদলে এক!”
কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত, নামো। হালদারমশাইকে ওঠাও।”
হালদারমশাই? এতক্ষণে ভ্যাবাচাকা কেটে গেল। বললুম, “কী সর্বনাশ! তা নামবার দরকার কী? হালদারমশাই, উঠে পড়ুন।”
হালদারমশাই জোরে মাথা নাড়লেন। কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, “দেরি কোরো না, জয়ন্ত! নেমে গিয়ে ওঁকে ওঠাও। কী মুশকিল! বুঝতে পারছ না পিঠমোড়া করে হাত-বাঁধা অবস্থায় বসিয়ে রাখলে নিজের থেকে সোজা হয়ে ওঠা যায় না?”
তাই বটে। এক লাফে নেমে গেলুম চওড়া গর্তটাতে। হালদারমশাইকে টেনে দাঁড় করালুম। দড়ির বাঁধন খুলে দিলুম। হালদারমশাই হাত দুটো ঝাঁকুনি দিয়ে এক লাফে গর্তের কিনারা আঁকড়ে ধরে চমৎকার উঠে পড়লেন। আমিও উঠে এলুম। অনেক চেষ্টায় ওঁর মুখের টেপ ছাড়ানো গেল। সেটা পকেটস্থ করার পর কর্নেল বললেন, “পরে কথা হবে। পাথরটা গর্তের মুখে চাপা দিতে হবে। আসুন, হাত লাগান সবাই!”
এবার একটু বেশি পরিশ্রমই হল। ওজনদার পাথরটা নিচু জায়গা থেকে উঁচুতে গড়িয়ে তুলতে ঘেমে একাকার। হালদারমশাইয়ের হাতে ব্যথা। তবু হুম-হুম শব্দে সবিক্রমে হাত লাগিয়েছেন। পাথরটা আগের মতো গর্তের মুখে রেখে আমরা বেরিয়ে গেলুম।
মুরারিবাবু জুতো’ বলে ছিটকে দলছাড়া হয়ে গেলেন। সেই গাছটার তলায় গিয়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হল। তার মুখের ভঙ্গিতে বিরক্তি আর নৈরাশ্য। বললেন, “বিট্টুকে তাড়া করে এসে হারিয়ে ফেলেছিলুম। এই গাছটা বেশ উঁচু। মগডালে চড়ে ছেলেটাকে খুঁজছি, হঠাৎ দেখি ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে হতচ্ছাড়া তিনকড়িদা আসছে। হাতে ছড়ি। কোথায় কার মার খেয়ে ঠ্যাং ভেঙেছে…তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশির কারবার। অঙ্কে ভুল হলেই গেছ!… সঙ্গে দুটো লোকের কাঁধে বস্তা!”
হালদারমশাই দ্রুত বললেন, “বস্তার ভেতর আমি।”
মুরারিবাবু বাঁকা মুখে বললেন, “আমি ভাবলুম সোনার মোহরভর্তি ঘড়া। তাই নিয়ে ভেতরে ঢুকল। একটু পরে খালি বস্তা নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর গাছ থেকে নেমে দৌড়ে চলে গেলুম। গর্তটা দেখেছি। পাথরটাও দেখেছি। গর্ত আর পাথর একসঙ্গে দেখিনি। কাজেই গর্ত এক, পাথর এক, আর খালি বস্তা এক। একুনে হল তিন।”
কর্নেল চুরুট ধরাচ্ছিলেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আমরাও এখন তিন, মুরারিবাবু!”
মুরারিবাবু চিন্তিতমুখে বললেন, “তা হলে সোনার মোহরভর্তি ঘড়া পাওয়া উচিত। পাচ্ছি না কেন বলুন তো?”
“পাওয়ার চান্স আছে,– কর্নেল বললেন, “যদি প্লিজ অন্তত গোটা-তিন অর্কিড আমাকে পেড়ে দিতে পারেন। ওই দেখুন, ওইগুলো। দেখতে পাচ্ছেন তিনটে করে পাপড়ি? দা নম্বর থ্রি!”
মুরারিবাবু জুতো খুলে তড়াক করে হনুমানের মতো দিব্যি গুঁড়ি আঁকড়ে গাছে উঠে গেলেন। কর্নেল তাকে আঙুল দিয়ে কোনটা পাড়তে হবে দেখাতে থাকলেন।
এবার হালদারমশাইয়ের দিকে মনোযোগ দিলুম। জামা ছিঁড়ে গেছে। প্যান্ট অবশ্য অটুট আছে। কিন্তু ধুলোকাদায় নোংরা। মুখে এতক্ষণে রাগের ছাপ স্পষ্ট হয়েছে। বললেন, “ব্যাটারা আবার নস্যির কৌটোটা পকেট সার্চ করে খামোখা কেড়ে নিল, এ-দুঃখ আর রাগ জীবনে ঘুচবে না। বলে, কি, নস্যি নিলেই হাঁচবে। হাঁচলে লোকে সাড়া পাবে। ভাববে বস্তার ভেতর হাঁচি কেন?…জানেন? বস্তার ফুটো দিয়ে দেখছি, দিনদুপুরে রাস্তাঘাট, বাজার, মানুষজন–সব। পুলিশ পর্যন্ত! একজন ব্যাপারি গোছের লোক জিজ্ঞেস করল, কী মাল দাদা? ব্যাটারা বলল, কুমড়ো৷ ছিরুবাবুর ছেরাদ্দর ভোজ-কাজ হবে। কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ..উঃ, জয়ন্তবাবু, হেনস্থার একশেষ।”
“আপনাকে কীভাবে ধরল ওরা?”
“আর বলবেন না। আমারই বোকামি।” হালদারমশাই শ্বাস ছাড়লেন। “এই গেছো-ভদ্রলোককে ফলো করে তো এলুম। কী খেয়াল হল, স্টেশনের রিটায়ারিং রুমের দোতলায় একটা সিঙ্গল রুম বুক করলুম। তারপর রেল-ক্যান্টিনে খাওয়াদাওয়া করে সন্ধে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লুম। মুরারিবাবুর বাড়ির খোঁজ করে শুনি, তাঁর আদতে বাড়িই নেই। তখন শিবমন্দিরে গেলুম। হ্যাঁজাক জ্বেলে বলিদান হচ্ছে। ঢাক বাজছে। তদন্ত শুরু করলুম। একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় বাবা মহাদেব ত্রিশূল মেরে মানুষের রক্ত খেয়েছেন যেন? সে বলল, চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি। ওদিকটা অন্ধকার। পা বাড়িয়ে মনে পড়ল, ওই যাঃ! রেলের রেস্টরুমে ব্যাগের ভেতর রিভলভারটা ফেলে এসেছি। তো কী আর করব! খানিকটা গেছি, লোকটা বলে উঠল–একাশি! আর সঙ্গে-সঙ্গে কারা আমাকে ধরে ফেলল। তারপরই মুখে টেপ। পিঠমোড়া করে বেঁধে এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা বাড়িতে ঢোকাল। বাড়িটাতে লোকজন নেই। অন্ধকার। একটা ঘরে ঢুকিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।”
“পিঠমোড়া করে বাঁধা অবস্থায়?”
হালদারমশাই করুণ হাসলেন। “না। বাঁধন খুলে খাটের বিছানার সঙ্গে মড়াবাঁধা করে বাঁধল। সেই যেমন কাকতাড়ুয়া’ কেসে কাটরার শ্মশানে বেঁধেছিল, ঠিক তেমনি। তারপর সারাটা রাত ওইভাবে…”
