কর্নেল একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ, তাই চলুন।”
জিপের কাছে পৌঁছেই কল্যাণবাবু হঠাৎ মুরারিবাবুর মতোই তিড়িংবিড়িং করে জিপটার চারদিকে চক্কর মেরে হুমড়ি খেয়ে সামনের চাকার কাছে বসলেন। বসেই লাফিয়ে উঠলেন। মস্ত একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “কে সে…শয়তান, আমি তাকে দেখে নেব…এত সাহস!”
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “টায়ার ফাঁসিয়েছে। কারবুরেটর জ্যাম করেছে। ইঞ্জিনের ভেতরকার তার কেটেছে। যাকগে, কল্যাণবাবু, আপাতত বিদায়। আবার দেখা হবে।”
কর্নেল আমার হাত ধরে টেনে হনহন করে হাঁটতে থাকলেন। আমি হতবাক। কিছুটা এগিয়ে একটা সাইকেল-রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, “মহিলার সিংকা গ্যারিজ। তুরন্ত চন্না ভাই।”
এই রিকশাওয়ালা বটেক’-এর বদলে বলল, “জরুর, চলিয়ে না, যাঁহাপর যানা।”
গ্যারেজে গিয়ে দেখি, শের আলির জিপ রেডি। স্যালুট ঠুকে বলল, “সব ঠিক হ্যায় কর্নিলসাব! মালুম হোতা, কই বদমাশ গ্যাংকা কুছ খতরনাক মতলব হ্যায়। উও আপকো হেঁয়া ঘুমনা পসন্দ নেহি করতা।”
অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
.
পাঁচ
উত্তরের উজানে ব্যারেজ এবং জলাধারের দরুন এখানে নদীটার দশা করুণ। বুকে বড়-বড় পাথর নিয়ে ক্ষতবিক্ষত চেহারায় পড়ে আছে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনসূত্রে পাওয়া দয়ার দান সামান্য জলে এত গভীর নদীকে বড্ড গরিব দেখাচ্ছে! হাইওয়ের ধারে একটা বটতলায় জিপ দাঁড় করিয়ে কর্নেল শের আলিকে বললেন, “ফিরতে দেরি হবে। তুমি বরং চলে যাও। বিকেল চারটে নাগাদ বাংলোয় যেও।”
শের আলি স্যালুট ঠুকে জিপ নিয়ে চলে গেল। আমরা ঢিবিতে উঠে গেলুম। খানিকটা খোলামেলা জায়গায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, “দেখো, দেখো! রামধনুর জেল্লা দেখো। ওই গাছগুলোর ডালে ফুলন্ত রেনবো অর্কিডের ঝাঁক দেখতে পাচ্ছ না? সূর্যের আলো তিনটে পাপড়ির ভেতর দিয়ে সাতটা রঙে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। তিনটে পাপড়ি নয়, যেন তিনটে প্রিজম্।”
সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো দৃশ্য। বললুম, “ছবি তুলে নিন। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার কৃষির পাতায় ছাপিয়ে দেব। তবে আমারও লোভ হচ্ছে। একটা অর্কিড স্যুভেনির হিসেবে নিয়ে যেতুম। কিন্তু অত উঁচুতে ওঠা তো অসম্ভব। বিট্টুকে কিংবা মুরারিবাবুকে পেলে ভালো হত।”
কর্নেল একটা প্রকাণ্ড গাছের দিকে এগিয়ে গেলেন। গাছটার ডালে-ডালে প্রচুর রেনবো অর্কিড। আপন মনে বললেন, “এও সংখ্যাতত্ত্বের লীলা। তিনটে পাপড়ি। ঘুরে-ফিরে সেই তিনের অঙ্ক।”
বললুম, “কিন্তু তিন তিরেক্কে নয় হচ্ছে না। সাতটা রং!”
“উঁহু! ভুল করছ, ডার্লিং!” কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, “তিন সাতে একুশ। দুইয়ের পিঠে এক একুশ। এবার দুই প্লাস এক সমান তিন। অঙ্ক ডার্লিং, অঙ্ক! প্রকৃতি অঙ্কের মাস্টারমশাই।”
কর্নেল গাছটার ওপাশে গিয়ে হঠাৎ বললেন, “কী আশ্চর্য!” তারপর মুখ তুলে গাছের ডালপালা দেখতে থাকলেন। কাছে গিয়ে দেখি একজোড়া ছেঁড়াফাটা প্লিমারা পামশু। কর্নেল বললেন, “লক্ষণ ভালো নয়। জুতো খুলে রেখে মুরারিবাবু এই গাছে চড়েছিলেন। কিন্তু গাছে তো উনি নেই!” বাইনোকুলারে চারদিকে ঘুরে গাছগাছালি তল্লাশ শুরু করলেন। আমি অবাক।
অবাক এবং উদ্বিগ্ন। বিট্টুকে মুরারিবাবু ডাকতে গিয়েছিলেন নকুলবাবুর বাড়ি থেকে। তারপর এতক্ষণে এই গাছের তলায় ওঁর জুতো! অথচ ওঁর পাত্তা নেই। ভারী অদ্ভুত ঘটনা। ডাকলুম, “মুরারিবাবু, মুরারিবাবু!”
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, “চুপ!” তারপর হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। তাকে অনুসরণ করলুম। ঘন জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপ, উঁচু-নিচু গাছ, ঝোঁপঝাড়ের ভেতর নানা গড়নের পাথরের স্ল্যাব–এই তা হলে সেই রাজা শিবসিংহের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। দিনের বেলায় এখানে গাঢ় ছায়া। হাওয়ায় ভুতুড়ে গা-ছমছম করা কত রকমের বিদঘুঁটে শব্দ। একখানে একটা বৌদ্ধ স্তূপের গড়নের গোলাকার প্রকাণ্ড পাথর। গর্তের মতো একটা জায়গা। দরজার ভাঙাচোরা ফোকর। মুখে ঝোঁপ গজিয়ে আছে। এতক্ষণে কানে এল ফোঁস-ফোঁস গোঁ-গোঁ অদ্ভুত সব শব্দ। কর্নেল ফোকরের মুখের কাছে গিয়ে ঝোঁপ সরিয়ে টর্চের আলো ফেললেন ভেতরে। তারপর বললেন, “মুরারিবাবু! ওখানে কী করছেন?”
আবার ফোঁস-ফোঁস, যেন নাক ঝাড়ছেন মুরারিবাবু। কিন্তু গোঁ-গোঁ করছেন কেন? কর্নেলের পাশে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, মুরারিবাবু একটা পাথরের চাই নড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। ফিসফিসিয়ে ডাকলেন, “আসুন, আসুন, হাত লাগান!”
কর্নেলের পেছন-পেছন ঢুকে গেলুম। মুরারিবাবু হাঁপাচ্ছেন। ফেস-ফোঁস শব্দ করে বললেন, “তিন তিরেক্তে নয়। নয় নয়ে একাশি।”
কর্নেল পাথরের চাইটার ওপর টর্চের আলো ফেলে বললেন, “আপনি কি গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছেন মুরারিবাবু?”
মুরারিবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ, আলো নেভান। হাত লাগান। ঝটপট। ওরা এসে পড়লেই কেলেঙ্কারি।”
বলে আবার হাত লাগিয়ে ফোঁস-ফোঁস, গোঁ-গোঁ শব্দে ঠেলতে শুরু করলেন। কর্নেলের ইশারায় সামিও অগত্যা হাত লাগালুম। উত্তেজনায় প্রায় কম্পমান অবস্থা। তিনজনের ঠেলাঠেলিতে পাথরের চাইটা ওপাশের নিচু জায়গায় গড়িয়ে পড়ল। একটা প্রকাণ্ড গর্ত দেখা গেল। মুরারিবাবু বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার মতো আওড়ালেন, “তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশি। আটের পিঠে এক একাশি। তা হলে আট আর একে ফের পাচ্ছি নয়। নয় বিভক্ত তিন। ভাগফল তিন।”
