কর্নেল মুখ তুলে বলেলেন—এই ফলকটা ঠাকুরঘরে ছিল বলছেন। ঘরটা একবার দেখতে পারি?
পরমেশ বললেন—নিশ্চয়! তবে একটু অপেক্ষা করুন। আমার স্ত্রী এখন ও-ঘরে পুজো দিচ্ছেন। ঠাকুরমশাই রয়েছেন। পুজোটা শেষ হোক।
ভেতর থেকে আবছা ক্ষীণ ঘণ্টার শব্দ শুনছিলুম। কর্নেল বললেন—হুম! ফলকটার গায়ে সিঁদুরের ছোপ দেখছি পরমেশবাবু! তার মানে দশাবতারেরও পুজো হত। এই তো?
পরমেশ বললেন—হ্যাঁ। তবে আমাদের গৃহদেবতা কিন্তু রাধাকৃষ্ণ। আমাদের পূর্বপুরুষ বৈষ্ণব।
কর্নেল হঠাৎ হেসে উঠলেন। সর্বনাশ! বৈষ্ণব হয়ে আপনি ছুরি চালিয়ে প্রাণীদের কাটাকুটি করেন এবং রক্তপাত ঘটান?
পরমেশও হো হো করে হেসে উঠলেন। আমি মশাই ধর্মটর্মের ধার ধারিনে। পাষণ্ড নাস্তিক বলতে পারেন। আমার বাবাও তাই ছিলেন। আপনি শুনে থাকবেন বাবার নাম কারণ আপনি মিলিটারিতে ছিলেন। আমার বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিলিটারি ডাক্তার ছিলেন। বাবার নাম ডাঃ অজিতেশ পুরকায়স্থ। মেজর পুরকায়স্থ নামে সবাই তাকে চিনতেন।
কর্নেল নড়ে বসলেন।মাই গুডনেস! মেজর পুরকায়স্থকে আমি ভীষণ চিনতুম। সিঙ্গাপুর পুনর্দখলের সময় আমার উরুতে সামান্য জখম ছিল। টুকরো একটা শার্পনেল লেগেছিল। আপনার বাবা অপারেশন করেছিলেন। আমার চেয়ে বয়সে বেশ বড় ছিলেন। তাহলেও আমাদের বন্ধুত্বে আটকায়নি।
পরমেশ খুশি হয়ে বললেন—এখন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে, যেন বাবার আত্মাই আমাকে আপনার পরামর্শ নিতে প্রেরণা দিয়েছে। নইলে পুলিশের কাছে না গিয়ে আপনাকে জানাতে গেলুম কেন?
কর্নেল বললেন—যাক গে। এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকুন।
–বেশ তো, বলুন।
—দশাবতার ফলকটা দেখে আমার মনে হচ্ছে, এ ধরনের মূর্তি এদেশে কখনও দেখিনি। এই ফলক আপনাদের পরিবারে কীভাবে এল?
–বাবা ওটা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে মালয়েশিয়া এলাকায় উনি ছিলেন। সেই সময় ওঁকে একবার টোরাদ্বীপে যেতে হয়েছিল। যেখানে…
কর্নেল ও আমি মুখ তাকাতাকি করলুম। আমি চমকে উঠেছি। কিন্তু কর্নেল শান্তভাবে বললেন—হুম! বলুন!
—টোরাদ্বীপে আমেরিকান সৈন্যদের একটা গোপন ঘাঁটি ছিল। জাপানিরা পালানোর সময় ঘাঁটিতে গোলাবর্ষণ করে যায়। কয়েকজন সৈন্য সাংঘাতিক আহত হয়। তাই বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওখানে। যাই হোক, উনি ওই দ্বীপেই ফলকটা কুড়িয়ে পান। উনি রিটায়ার করার পর ফলকটা ঠাকুরঘরে রাখা হয়। তারপর তো বাবা মারা গেলেন। আমি সল্টলেকে বাড়ি করে চলে এলুম। ফলকটা যথারীতি এ বাড়িতেও ঠাকুরঘরে রাখা হয়েছিল।
—বেশ। ফলকটা চুরি গেল কবে এবং কীভাবে?
—গত পুজোয় আমরা কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলুম। দারোয়ান রেখে গিয়েছিলুম। বাড়িতে আসবাবপত্র ছাড়া খুব দামি জিনিস আমি রাখিনে। সব ব্যাংকের লকারে থাকে। অবশ্যি চোরের কাছে সবই দামি। তো কাশ্মীর থেকে ফিরে দেখি কিছু খোওয়া যায়নি। দারোয়ান খুব বিশ্বাসী। ঠাকুরঘরের চাবি অবশ্যি তার কাছে রেখে গিয়েছিলুম। ঠাকুরমশাই এসে পুজো করে যেতেন রোজ। আমার স্ত্রীর আবার ধর্মকর্মের প্রচণ্ড বাতিক। যাই হোক, বাড়ি ফেরার কয়েকদিন পরে হঠাৎ ঠাকুরমশাই জানালেন, দশাবতার নেই। আসলে আমরা কেউ লক্ষ্য রাখিনি ব্যাপারটা। কাজেই ঠিক কবে বা কখন চুরি গেল, বলা খুব কঠিন।
–ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে একটু আলাপ করতে পারি কি?
—নিশ্চয়, নিশ্চয়। পুজোটা হয়ে যাক।
এতক্ষণে চা সন্দেশ ইত্যাদি এল। অতিথি সৎকারে ব্যস্ত হলেন পরমেশবাবু। চা খেতে খেতে কর্নেল হঠাৎ বললেন—আচ্ছা পরমেশবাবু, যদি আপনাকে অনুরোধ করি—আমাদের সঙ্গে টোরাদ্বীপে চলুন, আপনি যাবেন?
পরমেশ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন—কেন বলুন তো?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন–আপনার যাওয়া দরকার। আপনিই টোরাদ্বীপের নৃসিংহ রহস্য ভেদ করতে পারবেন। কারণ আপনি একজন কুশলী শল্যবিদ। তবে তার আগে আপনাকে আগাগোড়া সব কথা জানানো দরকার। আমার বিশ্বাস, আপনার নৃসিংহমূর্তি চুরির পেছনে একটা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার রয়েছে।
এরপর কর্নেল চাপা গলায় সম্প্রতি টোরাদ্বীপে সরকারি সমীক্ষকদলের ভীষণ পরিণতির ঘটনা বলতে শুরু করলেন। শুনতে শুনতে ডঃ পরমেশ পুরকায়স্থ যে উত্তেজিত হয়ে উঠছেন, তা ওঁর মুখের ভাবে টের পাচ্ছিলুম। সবটা শোনার পর উনি বললেন—এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! টোরাদ্বীপে সত্যিসত্যি নৃসিংহ রয়েছে এবং আমার বাবা সেখানেই এক ফলক কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, দুটোতেই কেমন যেন যোগসূত্র আছে মনে হচ্ছে। ঠিক আছে। আমি যাব আপনাদের সঙ্গে।
কিছুক্ষণ পরে আমরা ঠাকুরঘরে গেলুম। দরজার পাশে একটা টিকিওয়ালা লোক বসে আছে দেখলুম। গায়ে একটুকরো উত্তরীয় এবং পরনে কোরা ধুতি। কঁাধে একটা থলে। বুঝলুম, ইনিই ঠাকুরমশাই।
কর্নেল খুব ভক্তিভরে ঠাকুরঘরে উঁকি মারার পর ঠাকুমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে থাকলেন। দুজনে যে কথাবার্তা হল, তা এই :
–নমস্কার ঠাকুরমশাই!
–নমস্কার স্যার, নমস্কার।
-–এতদূরে পুজোআচ্চা করতে আসেন কি পায়ে হেঁটে। নাকি সাইকেলে?
–না স্যার, সাইকেল। সল্টলেকে তো মাঠ ময়দান জায়গা। পায়ে হেঁটে কি অতগুলো বাড়ির পুজো সারা যায়? এক যজমানের বাড়ি টালা, তো আরেক যজমানের বাড়ি বাঙ্গুরে। বুঝলেন না ঝামেলাটা?
–বুঝলুম বইকি। তা এতসব পুজো না করে বড়সড় দুতিনটে যজমান ধরলেই তো হয়।
