“ছাগল নেমে গেছে যখন, তখন তুমিও নামতে পারো। কুইক!”
কথাটা মনে ধরল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলুম। একটু পরে ঘুরঘুঁটে আঁধার। সেই আঁধারে আবার ব্যা-ডাক শুনতে পেলুম। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বেলে দেখলুম সিঁড়ির নীচে সমতল পাথর-বাঁধানো মেঝে। একটা করে দেশলাইকাঠি জ্বালি আর সেই আলোয় ভয়ে-ভয়ে পা ফেলি। তিনকড়িচন্দ্র খুঁড়িয়ে হাঁটছে যখন, তখন এই দুর্গম সুড়ঙ্গপথে তার হামলার আশঙ্কা যে নেই, এটাই আমার দুঃসাহসের কারণ। কিছুটা চলার পর সুড়ঙ্গপথ শেষ হল। বাইরের আলো এসে পড়েছে সামনে। আবার সিঁড়ির ধাপ উঠে গেছে ওপরে। এতক্ষণে অস্বস্তি কেটে গেল।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলুম। মাথায় ঘন ঝোঁপ ও লতার বুনোট। সম্ভবত তিনশিঙে ছাগলটির যাতায়াতে সবুজ রঙের বুনোটটি ঘেঁদা হয়ে গেছে। সেই ঘেঁদা দিয়ে বেরিয়ে দেখি, একটা ছাদবিহীন ভাঙা ঘরের ভেতর এসে পড়েছি। দু’দিকে ভাঙা উঁচু পাঁচিল, একদিকে ধ্বংসস্তূপ, অন্যদিকটায় জঙ্গল।
এইমাত্র কেউ বা কিছু জঙ্গল ভেদ করে চলে গেছে, ঝোঁপগুলো তখনও দুলছে। ছাগলটাই হবে। সুড়ঙ্গের মুখের দিকে তাকালে বোঝবার উপায় নেই কিছু। মনে হবে ওটা নেহাত আরও সব জঙ্গলের মতো জঙ্গল।
ছাগলটা যেদিকে গেছে বলে সন্দেহ হল, সেদিকেই পা বাড়ালুম। কিন্তু আর এগোনো কঠিন। গুঁড়ি মেরে অবশ্য ঢোকা যায়, এবং চারঠেঙে জন্তুর পক্ষেই খুদে গড়নের জন্য গলিয়ে যাওয়া সম্ভব। কাজেই সে-চেষ্টা ত্যাগ করে ধ্বংসস্তূপের দিকটায় এগিয়ে গেলুম। তারপর কী কষ্টে যে পাথরের স্ল্যাব, ইট আর ঝোঁপঝাড়লতার ভেতর দিয়ে ভোলা সমতল জায়গায় পৌঁছলুম, বলার নয়।
কিন্তু এবার যেদিকে তাকাই, ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর একই ধ্বংসস্তূপ। শিবমন্দিরের চূড়া বা তোরণটাও দেখা যাচ্ছে না। একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিলুম। ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”
সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া এল, “চলে এসো ডার্লিং! ব্র্যাভো!”
দক্ষিণের একটা ভাঙা ঘরের দরজায় প্রাজ্ঞ বন্ধুবর সাদা দাড়ি নেড়ে এবং টুপি খুলে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন। “মার্ভেলাস, জয়ন্ত! কনগ্রাচুলেশন! তবে এতখানি নার্ভাস হয়ে পড়ার কারণ ছিল না। এই স্তূপটায় উঠে বাইনোকুলারে মাটি ভেদ করে তোমার উদ্ভিদরূপী অভ্যুত্থান দেখেছি। আমি জানতুম, এটাই ঘটবে।”
কর্নেল খোলা জায়গায় নেমে এলেন। বললুম, “জানতেন! কী জানতেন?”
“তোমার এভাবেই অভ্যুত্থান ঘটবে।”
“তার মানে, আপনি বলতে চাইছেন ওই সুড়ঙ্গপথটার কথা, আপনি জানতেন?”
কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “অঙ্ক ডার্লিং! স্রেফ অঙ্ক! পিওর ম্যাথস। তিন তিরেক্কে নয়, নয়-নয়ে একাশি। তবে ব্যাকরণেও অঙ্কের নিয়ম কার্যকর। এক এবং আশি যোগ করলে যেমন একাশি হয়, তেমনি সন্ধি করলেও একাশি হয়। চলো! এবার থানায় গিয়ে হালদারমশাইয়ের খোঁজখবর নেওয়া যাক।”
ধ্বংসস্তূপগুলোর ভেতর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে এতক্ষণে দক্ষিণে সেই শিবমন্দিরের ত্রিশূল চোখে পড়ল। হঠাৎ কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, “তিনকড়িবাবু! তিনকড়িবাবু! আপনার বিছানা স্টেশনে… কী আশ্চর্য!”
এক পলকের জন্য দেখলুম, শিবমন্দিরের পেছন দিকে ছড়ি হাতে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে সেই তিনকড়িচন্দ্র উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, “না–ওঁর দোষ নেই। আসলে সেকালের লোকেরা বড্ড ধাঁধা ভালোবাসতেন। একালে যে হঠাৎ কুইজের হুজুগ উঠেছে, সেও সেই পুরোনো স্বভাবের পুনরুত্থান। সভ্যতার এই নিয়ম। পুরোনো বাতিক নতুন করে বারবার যুগে-যুগে ফিরে আসে। কিন্তু সমস্যা হল, কিছু লোক আছে, সভ্যতার ব্যাকরণ বোঝে না। ব্যাকরণ মানে না। তারা হাঁসজারুর পেছনে হন্যে হয়।”
কর্নেলের পুনঃ দীর্ঘ জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শেষ হল, মন্দির-চত্বর পেরিয়ে ঢিবির জঙ্গলচেরা সঙ্কীর্ণ নতুন রাস্তার নীচে পিচের সড়কে পৌঁছে। এতক্ষণে পুণ্যার্থীদের ভিড় বেড়েছে। সাইকেলরিকশা তখনই পাওয়া গেল।
কর্নেল বললেন, “থানেমে লে চলল, ভাই! জলদি যানা পড়ে। বখশিস মিলে গা।” সাইকেলরিকশাওয়ালা ফিক করে হেসে বলল, স্যার, চিনতে পারলেক নাই বটেক। আমিই তো তখন সারদের লইয়ে এলাম বটেক।”
কর্নেল বললেন, “তাই বটেক!”
আমি বললুম, “ওহে রিকশাওয়ালা, তোমাদের এই বটেকটা কী বলো তো?”
রিকশাওয়ালা একগাল হেসে বলল, “উটো একটো কথাই বটেক!”
“কথা তো বটেই! কিন্তু…”
“স্যার লিজের মুখেই তো বইললেন বটেক।”
কর্নেল গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন, “বুঝলে না? বটে তো বটেই বটেক!”
থানার সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা গেট দিয়ে ঢুকলুম। দু’ধারে ফুলে-ফুলে ছয়লাপ। বললাম, “রূপগঞ্জের ব্যাপার! খুব রূপসচেতন। খালি ফুল আর ফুল। থানাতেও ফুল! খুনে-বদমাশ চোর-জোচ্চোরদের ধরে এনে ফুল শোঁকানো হয় মনে হচ্ছে।”
থানাঘরে ঢুকতেই একজন পুলিশ-অফিসার কর্নেলকে দেখে চেয়ার ছেড়ে প্রায় লক্ষ্য দিলেন। “হ্যাল্লো কনেলসায়েব, আসুন, আসুন। ও.সি. সায়েব এখনই আপনার কথা বলছিলেন।”
অফিসারটি পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। দত্যিদানোর মতো প্রকাণ্ড এবং ফো অফিসার-ইন-চার্জ ভদ্রলোকও অনুরূপ লম্ফ দিয়ে হাত বাড়ালেন। পেল্লায় ধরনের হ্যান্ডশেকের পর বিকট অট্টহাসিতে কানে তালা ধরে গেল। বললেন, “কল্যাণবাবুকে এখনই বলছিলুম, এলে নিশ্চয় ইরিগেশন বাংলোয় উঠবেন। দেখুন তো খোঁজ নিয়ে। কাল ডি. জি-সায়েবের ট্রাকল পেয়েই বুঝে গেছি, সিরিয়াস কে। কাল ট্রেনও দু’ঘণ্টা লেট ছিল। স্টেশনে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক মোতায়েন ছিল।”
