কর্নেলের এই দীর্ঘ দার্শনিক ভাষণের তাৎপর্য বুঝতে পারছিলুম না। ফালি রাস্তার পর ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে সামনে ধ্বংসস্তূপ এবং তার পেছনে একটা মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ল। চূড়ায় কালচে রঙের ত্রিশুল। কর্নেল বাইনোকুলারে ত্রিশূলটি দেখে নিলেন। বললুম, “রক্তের দাগ দেখতে পাচ্ছেন?”
কর্নেল কথায় কান না দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।”
বিরক্ত হয়ে হাঁটতে থাকলুম। উনি সমানে বক্তৃতা চালিয়ে গেলেন। তারপর ঢাক বেজে উঠল। ধ্বংসস্তূপগুলোর পর একটা ভোলা পাথর-বাঁধানো চত্বর। ফাঁকে-ফোকরে উদ্ভিদ গজিয়েছিল। কেটে সাফ করা হয়েছে। একদল লোক বসে আছে এবং প্রত্যেকের হাতে একটা করে নানা সাইজের পাঁঠা। প্রকাণ্ড মন্দিরের সামনে হাড়িকাঠ এবং রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। ঢাক-কাঁসি বাজছে। ধেইধেই নাচও চলছে। রক্তারক্তি দেখলে আমার গা গুলোয়। মন্দিরটা দেখতে থাকলুম। কালো পাথরে তৈরি খয়াটে এবং ফাটলধরা প্রাচীন স্থাপত্যের কেমন যেন ভয়াল চেহারা। দেখলেই গা-ছমছম করে। এতক্ষণে লোহার ত্রিশূলে কালচে রক্তের দাগ স্পষ্ট চোখে পড়ল।
আমাদের দেখতে পেয়ে কয়েকজন পাণ্ডা ভিড় করল। কারও পরনে গেরুয়া, কারও পট্টবস্ত্র এবং প্রত্যেকের কপালে সম্ভবত রক্তের ফোঁটা। সাজিয়ে শিবের প্রিয় বেলপাতা, জবাফুল। কিছু ধুতরো ফুলও দেখতে পেলুম। কর্নেল প্রত্যেককে একটা করে টাকা বিলোচ্ছেন দেখে অবাক হলুম, কলকাতা থেকে একগুচ্ছের এক টাকার নোট জোগাড় করেই এসেছেন! আমার এই বৃদ্ধ বন্ধুটি সত্যিই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা।
ঢাকের বাজনার তালে-তালে একজন সন্ন্যাসী চেহারার লোক নেচে-নেচে গাইছে :
নাচে পাগলাভোলা গলায় মালা
হাতে লয়ে শূল
প্রমথ প্রমত্ত নাচে
কানে ধুতুরারই ফুল….
কর্নেল এক টাকার হরির লুঠ দিয়ে লম্বা পায়ে কেটে পড়লেন। মন্দিরের পেছনে গিয়ে ওঁর নাগাল পেলুম। আবার খানিকটা ভোলা জায়গা এবং সামনে একটা প্রকাণ্ড উঁচু আধখানা দেউড়ি দেখা গেল। পাথরের এমন তোরণ দিল্লির মেহরৌলিতে কুতবমিনারের কাছে দেখেছি।
“অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী!” কর্নেল মুগ্ধদৃষ্টে তাকিয়ে বলে উঠলেন। “এর মালিকানার জন্য একটা কেন একশোটা কুরুক্ষেত্র বাধা স্বাভাবিক। সত্যিই ডার্লিং! রাজা শিবসিংহের এই উত্তঙ্গ কীর্তির ভগ্নাবশেষ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ে ফতুর হতে আমারও ইচ্ছে করছে। দুঃখের বিষয়, সরকার দেশের প্রাচীন কীর্তি সম্পর্কে এত অমনোযোগী কেন, ভেবে পাইনে! ফিরে গিয়ে প্রত্ন-দফতরে কড়া করে চিঠি লিখব।”
বলে কর্নেল ক্যামেরায় নানা দিক থেকে ছবি তুললেন। তারপর কাছে গিয়ে বললেন, “ওপরটা ভেঙে গেলেও অনুমান করছি, তোরণটা অন্তত পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু ছিল। আর এই দ্যাখো, চওড়ায় কী বিশাল! প্রায় দশ ফুট!”
ওদিকে গিয়ে দেখলুম, তোরণ বা দেউড়িটির মাথায় ঘন ঝোঁপ গজিয়ে রয়েছে। আস্ত একটা বেঁটে বটগাছ মাথা তুলেছে এবং সেটার শেকড় সাপের মতো এঁকেবেঁকে নেমে এসেছে গা বেয়ে।
হঠাৎ দেউড়ির মাথায় ঝোঁপের ভেতর আওয়াজ হল, “একাশি!”
চমকে উঠলুম। ঝোঁপ কুঁড়ে কালো একটা ছাগলের মুখ দেখা যাচ্ছে এবং রীতিমতো আশ্চর্য ঘটনা, তার তিনটে শিং! উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”
কর্নেল বাইনোকুলারে দেখছিলেন। ঝটপট ক্যামেরা তাক করে শাটার টিপলেন। ছাগমুণ্ডটি দাড়ি ও তিন শিং নেড়ে ফের বলে উঠল মানুষের ভাষায়, “একাশি!” তারপর বেমালুম নিপাত্তা হয়ে গেল।
কর্নেল এবং আমি ভাঙা দেউড়িটার চারদিকে ছোটাছুটি করে তাকে আর খুঁজে পেলুম না। কর্নেল ব্যস্তভাবে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে এবং শেকড়বাকড় ধরে ওঠার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। তখন বললেন, “তোমার তো মাউন্টেনিয়ারিং-এ ট্রেনিং নেওয়া আছে। দ্যাখো তো চেষ্টা করে। আসলে আমার শরীরটা বেজায় ভারী হয়ে গেছে। নইলে আমিও কিছু পাহাড়ের চূড়োয় উঠেছি একসময়। জয়ন্ত! কুইক!”
একটু দোনামনা করে বললুম, “মাউন্টেনিয়ারিংয়ের জন্য বিশেষ জুতো পরা দরকার। এই জুতো পরে ওঠা সম্ভব নয়।”
“চেষ্টা করো ডার্লিং!”
কর্নেলের তাড়ায় পাথরের খাঁজে পা রেখে বুটের শেকড় আঁকড়ে অনেকটা ওঠা গেল। প্রায় মাঝখানে পৌঁছে হল বিপদ। শেকড়টা এখন বেশ মোটা। খাঁজে গজানো গুল্ম ধরে উঠতে গেলেই উপড়ে যাচ্ছে। নীচে থেকে কর্নেল ক্রমাগত উৎসাহ দিচ্ছেন। এইবার একটা মোটা লোহার আংটা চোখে পড়ল মাথার ওপরে। মরচে-ধরা আংটা। টেনে দেখলুম, ওপড়ানোর চান্স নেই।
আংটাটি আঁকড়ে বারের কসরত করে গিরগিটির মতো উঠতেই একটা শক্ত ঝোঁপ বাঁ হাতের নাগালে এসে গেল। এরপর আর ওঠাটা কষ্টকর হল না। ঝোঁপ আঁকড়ে পাথরের খাঁজে পা রেখে-রেখে মাথায় উঠলুম। ফুট-দশেক চওড়া জায়গা জুড়ে ঘন ঝোঁপ। তিন-শিঙে ছাগল যেখানে মুখ বের করেছিল, সেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়ালুম। নীচে থেকে কর্নেল বললেন, “গর্ত দেখতে পাচ্ছ কি?”
এমনভাবে বললেন, যেন নিজেও একবার উঠে আবিষ্কার করে গেছেন! হাসতে-হাসতে বললুম, “গর্ত নয়। কুয়ো৷”।
কর্নেল উত্তেজিতভাবে বললেন, “সিঁড়ি আছে দ্যাখো!”
“আছে।”
“নির্ভয়ে নেমে যাও।”
“পাগল!”
“পাগল না ডার্লিং, ছাগল।”
“কী যা-তা বলছেন?”
