বলে বড়বাবু বসলেন। কর্নেল বললেন, “হালদারমশাইয়ের খবর?”
বড়বাবু বেজার মুখে বললেন, “ওরা তেমন সন্দেহজনক কাউকে তো দেখতে পায়নি। পাগলাবাবুকে কেউ ফলো করেনি। হালদারবাবুর চেহারার যে বর্ণনা দিয়েছেন ডি. জি-সায়েব, তেমন কাউকে দেখা যায়নি।”
আমি বললুম, “ছদ্মবেশ ধরার বাতিক আছে ওঁর।”
বড়বাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনিই আশা করি সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী? কর্নেলের মুখে আপনার কথা শুনেছি। ভালো, খুব ভালো। কিন্তু আপনি তো ভাবিয়ে তুললেন দেখছি!”
কর্নেল বললে, “মিঃ হাটি, মন্দিরের ত্রিশূলের রক্তের দাগ সম্পর্কে ফরেনসিক রিপোর্ট পেয়েছেন কি?”
“আজ সকালে পেয়েছি। মানুষেরই রক্ত। তার চেয়ে সমস্যা, নকুলবাবুর ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে মিলে গেছে।”
শুনেই আঁতকে উঠলাম। বললুম, “তা হলে ওই ত্রিশূলেই নকুলবাবুকে…”
আমার কথায় বাধা দিয়ে বড়বাবু মিঃ হাটি বললেন, “ওই ত্রিশূল ওপড়ানোর সাধ্য মানুষের নেই। তবে স্বয়ং মহাদেবের থাকতে পারে।” বলে আবার সেই দানবীয় অট্টহাসি হাসলেন। হাসি তো নয়, মেঘের ডাক। তার আওয়াজে যেন ভূমিকম্পও হচ্ছিল। অন্তত তার শরীরে সেই কাঁপুনি দেখে তাই মনে হয়।
কর্নেল বললেন, “মন্দিরটা দেখলুম খুব উঁচু। তা ছাড়া চূড়াটা ছুঁচলো এবং শ্যাওলায় পিছল হয়ে আছে। উঁচু মই ছাড়া ওঠাও অসম্ভব। ত্রিশূলে নকুলবাবুর রক্ত কী করে মাখানো হল?”
মিঃ হাটি গুম হয়ে বললেন, “এটাই আশ্চর্য! আমরা ফায়ারব্রিগেড আনিয়ে ত্রিশূল থেকে রক্তের নমুনা নিয়েছিলুম। ফায়ারব্রিগেডের মই ছাড়া চুড়োয় ওঠা যেত না। কল্যাণবাবুও উঠেছিলেন চূড়োর চারদিক পরীক্ষা করতে। সাধারণ মই দিয়ে উঠলে মইয়ের ডগার দাগ পড়ত।”
কল্যাণবাবু বললেন, “কোনো দাগ দেখতে পাইনি। তবে এক হতে পারে, লম্বা বাঁশের মাথায় রক্তমাখা তুলো বেঁধে ত্রিশূলে ঘষে দিয়েছিল খুনি। কিন্তু ভালোভাবে পরীক্ষা করেছি, ত্রিশূলে তুলোর আঁশ লেগে নেই। এমনকি, ত্রিশূলের গা বেয়েও রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়েনি। চূড়োতেও রক্তের ফোঁটা নেই কোথাও। তন্নতন্ন খুঁজেছি।”
আমি বললুম, “ন্যাকড়ায় রক্ত মাখিয়ে…”
আবার বাধা পড়ল হাটিবাবুর বিকট অট্টহাস্যে। বললেন, “তা হলে তো মশাই রক্তের ফোঁটায় চূড়ো একাকার হয়ে থাকত। তুলো রক্ত শুষে নেয়। ন্যাকড়া অত শুষতে পারে কি? ভেবে বলুন।”
হাবা বনে বসে রইলুম। কর্নেল বললেন, “কিন্তু আমার ভাবনা প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোকের জন্য। এই দেখুন।” বলে কর্নেল পকেট থেকে সচ্ছিদ্র চিরকুটটা বড়বাবুর হাতে দিলেন। “বাংলোর গেটের বাইরে একটা কাঁটাঝোপে এটা লটকানো ছিল।”
ছড়াটা পড়ে পুনঃ বিকটহাস্যের জন্য রেডি হয়েই বড়বাবু মিঃ হাটির মুখ তুম্বো হয়ে গেল। ভুরু বেজায় কুঁচকে গোঁফ চুলকে বললেন, “মন্দিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডি. জি-সায়েবের নির্দেশ দিল সাদা পোশাকের পুলিশ রাখতে, অক্ষরে-অক্ষরে তা পালন করেছি। পাঁঠাগুলোর দিকে লক্ষ রাখতে বলেছিলুম। তিন শিঙে পাঁঠা বলির জোগাড় দেখলেই যেন বমাল আসামি ধরে থানায় পাঠায়। কিন্তু এখনও তেমন কিছু ঘটেনি। নরবলি তো দূরস্থান!”
কর্নেল বললেন, “রাতেও আশা করি পুলিশ ছিল?”
“আলবাত ছিল,” মিঃ হাটি জোর গলায় বললেন, “নরবলি যে হয়নি, সেটার গ্যারান্টি দিতে পারি। কাজেই এটা স্রেফ হুমকি।”
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “অন্য কোনো মন্দিরেও তো… মানে, ওদিকটা অনেক ভাঙাচোরা মন্দির দেখলুম। যদি হালদারমশাইকে…”
বড়বাবুর শেষদফা আটকে-রাখা বিকট হাস্যটির বিস্ফোরণ ঘটল। পরিশেষে প্রকাণ্ড মুণ্ড জোরে নেড়ে বললেন, “এখন পর্যন্ত ওই এরিয়া কেন, কোথাও কোনো ডেডবডির খবর নেই। ডি. জি-র ট্রাঙ্ককল পেয়েই আমরা অ্যালার্ট, রেড সিগন্যাল বোঝেন তো?”
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, “আচ্ছা মিঃ হাটি, তিনকড়িচন্দ্র ধাড়াকে চেনেন?”
মিঃ হাটির ভুরু বেশ পুরু। কুঁচকে তাকালেন কল্যাণবাবুর দিকে।
কল্যাণবাবু বললেন, “কেন? করালীবাবুর আত্মীয়…সেই স্মাগলার স্যার! জাহাজে চাকরি করে। …সরডিহির রাজবাড়ির মন্দির থেকে সোনার ঠাকুর চুরির কেসের মূল আসামি ছিল। আইনের ফাঁকে ছাড়া পেয়ে নিপাত্তা হয়ে গেল। এক মিনিট। কেসের ফাইলটা খুঁজে আনছি।” কল্যাণবাবু সবেগে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনার একটু সাহায্য এখনই চাই মিঃ হাটি!”
“অবশ্যই পাবেন। বলুন!”
“আমি শিবমন্দিরের ভেতরটা একবার দেখতে চাই। ভক্তদের সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগতে পারে। সেজন্যই পুলিশের সাহায্য ছাড়া এ-কাজটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।”
বড়বাবু হাঁকলেন, “কল্যাণবাবু, ফাইল পরে হবে। প্লিজ, চলে আসুন!”..বলে কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, “মার্ডার কেস! ধম্মকম্ম নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কর্নেলসায়েব! ভগবান আছেন, মাথায় থাকুন। আর স্বয়ং ভগবানই বলেছেন কি না যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি…’ এটসেট্রা এটসেট্রা!”
পুনঃ ভূমিকম্পসদৃশ বিকট অট্টহাস্য! বাস! পুলিশকে এমন হাসতে কখনও দেখিনি। এই ভদ্রলোক যদি চোর-জোচ্চোরকে বেটনের গুঁতোর বদলে এই সাঙ্ঘাতিক হাসির গুঁতো মারেন, সঙ্গে-সঙ্গে পেটের কথা উগরে দেবে। মারমুখী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাসের বদলে এঁর লাফিং গ্যাস প্রয়োগ করলে অনেক বেশি কাজ হবে সন্দেহ নেই।
