“রাখুন। আপনি..” রমলা ধরা গলায় বললেন, “একটা নিরীহ সাদাসিধে মানুষকে কে অমন করে মারল, কেন মারল, খুঁজে বের করুন।”
“আপনার ঠাকুরপো কী করে?”
রমলা আস্তে বললেন, “ভাইটাকে মানুষ করতে পারেননি স্কুলটিচার হয়েও। স্কুল ফাইনালে দু’বার ফেল করে এতদিনে একটা চাকরি জুটিয়েছে। ব্যারেজে হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার স্টেশন আছে। সেখানকার সিকিউরিটি গার্ড। আসলে দাদা-ভাই দুজনেই একটু গোঁয়ার, জানেন? দাদা তো কার সঙ্গে ঝগড়া করে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভাই কবে না একই পথ ধরে। আমার হয়েছে জ্বালা!”
“তা হলে নকুলবাবু রিটায়ার করেননি?”
“না। ভেতরে-ভেতরে খুব রাগী আর জেদি মানুষ ছিলেন। আত্মসম্মানবোধ ছিল ভীষণ। তবে বাইরে থেকে বোঝা যেত না। খুব ভদ্র আর…”
“নিরীহ বলছিলেন?”
রমলা জোর দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। একটা পোকা মারতে হাত কাঁপত। তবে রাগ হলে মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলে দিতেন। এ জন্যই রূপগঞ্জে ওঁকে কেউ পছন্দ করত না। আর ওই এক স্বভাবতর্ক! পণ্ডিতি তর্ক।”
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, “শুনলুম, লোকে বলছে, শিবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের দাগ ছিল। বডিতে তিনটে ক্ষত ছিল। তোমার কী ধারণা?”
রমলা ঠোঁট কামড়ে ধরে বললেন, “উনি নাস্তিক মানুষ ছিলেন। সেজন্য ওসব রটানো হয়েছে। আর ত্রিশূলে রক্তের দাগ? মিথ্যা। সিঁদুর মাখিয়ে দিয়েছে কেউ।”
“পুলিশ কী বলছে?”
“পুলিশ ত্রিশূলের লাল দাগ তুলোয় মাখিয়ে টেস্ট করতে পাঠিয়েছে। রোজ থানায় গিয়ে খোঁজ নিই। বলে, এখনও কলকাতা থেকে রিপোর্ট আসেনি।”
কর্নেল উঠলেন। “চলি। আমি আছি ইরিগেশন বাংলোয়। দরকার হলে বিরুকে দিয়ে খবর পাঠিও।”
রমলা ব্যস্তভাবে বললেন, “বিট্টুকে খুঁজতে গেল ওরা। চিঠিটা ডাকে দিয়েছিল কি না…”
“থাক। ও-নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই।”….
ঘিঞ্জি গলি দিয়ে বাজারে পৌঁছে দু’জনে থমকে দাঁড়ালুম। শের আলি এবং তার জিপটা নেই। সামনে একটা চায়ের দোকান থেকে একটি ছেলে এসে বলল, “শের আলি বোলা, উও দেখিয়ে সাব! মহিলার সিংকা গ্যারিজ..উহা চলা যাইয়ে। উও দেখিয়ে শের আলি খাড়া হ্যায়!”
বললুম, “হঠাৎ গ্যারেজে কেন?”
কর্নেল কিছু বললেন না। হনহন করে এগিয়ে চললেন। রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়। বাঙালি-বিহারি চেনা কঠিন। দুই রাজ্যের সীমানাবর্তী শহরে এই এক জগাখিচুড়ি।
শের আলি দৌড়ে এল। মুখ উত্তেজনায় লাল। “হারামিলোগোকা খাসিয়ত এইসা হো গেয়া, কর্নিলসাব! দো চাক্কা ফাসা দিয়া, ঔর কারবুরেটর জ্যাম কর দিয়া! চাকু চালায় ইঞ্জিনকি অন্দর! তার উরভি কাট দিয়া। কম-সে-কম তিন-চার ঘণ্টে লাগেগি! ম্যায় কা কুঁরু? দেখনে সে তো কলিজা ফাসা দেতা।”
কর্নেল একটু হাসলেন। “ঠিক আছে। তুমি এখানেই অপেক্ষা করো। আমরা আর একটু ঘুরে আসি।”
একটা সাইকেল-রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, “শিউজিকো পুরানা মন্দির দর্শন করে ভাই! চলো!”
রিকশায় বসে বললুম, “ব্যাপারটা রহস্যময়!”
“হ্যাঁ। ব্যাকরণ রহস্যের অবস্থা জমজমাট হয়ে উঠল।” কর্নেল বললেন। “তবে এখন আমার ভাবনা আর মুরারিবাবুর জন্য হচ্ছে না। হচ্ছে হালদারমশাইয়ের জন্যে!”
সঙ্গে-সঙ্গে হালদারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। বললুম, “সত্যিই কি মুরারিবাবুকে উনি ফলো করে এতদূর এসেছেন? বিশ্বাস হয় না।”
কর্নেল পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। বললেন, “ভোর ছ’টায় মর্নিং ওয়াকে বেরনোর সময় গেটের বাইরে একটা কাটাগাছে এটা আঁটা ছিল, চোখে পড়ার মতো জায়গায়। তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম।”
চিরকুটে লাল ডটপেনে লেখা আছে :
পাতিঘুঘু বলিদান
বুড়োঘুঘু সাবধান
বললুম, “সর্বনাশ! হালদারমশাই তা হলে অলরেডি…”
কর্নেল আমার হাত থেকে চিরকুটটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, “কলকাতা থেকে রূপগঞ্জ থানায় ট্রাঙ্ককলে অলরেডি জানানো হয়েছে। গতকাল এখানে উনি পৌঁছনোর আগেই পুলিশ সতর্ক থাকার কথা। স্বয়ং ডাইরেক্টর জেনারেল অব পুলিশের নির্দেশ। তবু কিছু বলা যায় না।”
শেষ বাক্যটি শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল।
.
চার
জঙ্গলে ঢাকা একটা ঢিবির কাছে এসে সাইকেল-রিকশাওয়ালা বলল, “আর যাবে না সার। হেঁটি-হেঁটি চলে যান। ম্যালাই লোক যেছে বটেক বাবার ঠেঞে।”
ঢিবির জঙ্গল কুঁড়ে টাটকা পায়ে-চলা পথের দাগ চোখে পড়ছিল। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে টিবিটি তদন্ত করে দেখলেন যেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, “হেটি-হেঁট চলেক যাই, ডার্লিং!”
সঙ্কীর্ণ নতুন রাস্তাটি করার সময় ঝোঁপঝাড়ও কাটা হয়েছে। কিছুটা এগিয়ে একদঙ্গল লোক যাচ্ছে দেখলুম। একজনের কাঁধে একটা পাঁঠা। তবে দুটো শিং। একটি ঢাকও নিয়ে যাচ্ছে। বললুম, “এ দেশের লোক বড্ড হুজুগে।”
কর্নেল বললেন, “সব দেশের লোকই হুজুগে, জয়ন্ত! তবে তফাতটা হল, এ-দেশে এখনও মানুষের হাতে প্রচুর সময়। সেই সময়কে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা কম। আর যদি কুসংস্কারের কথা বলো, সেও সবখানে মানুষের মগজে ঠাসা। মহা-মহা পণ্ডিতের সঙ্গে আমার চেনাজানা হয়েছে। পিদিমের তলায় আঁধারের মতো তাদের এক-একজনের এক-একরকম উদ্ভট কুসংস্কার দেখেছি। ..হঁ, নাস্তিকদেরও কুসংস্কার দেখেছি, জয়ন্ত! আসলে সত্যিকার নাস্তিক হতে গেলে মনের জোর থাকা চাই। খাঁটি নাস্তিক হওয়া সহজ নয়। অবিশ্বাস করাটা শক্ত বিশ্বাস করাটা সহজ। কারণ আজন্ম মানুষ বিশ্বাস ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসই মানুষের সমাজটাকে বেঁধে রেখেছে। ওই রিকশাওয়ালার কথাই ধরো। আমরা তাকে ভাড়া দেব বিশ্বাস করেই আমাদের বয়ে আনল! বিশ্বাস, ডার্লিং, বিশ্বাস জিনিসটা না থাকলে মানুষের বাঁচা কঠিন হত। কিন্তু কিছু বেয়াড়া লোক থাকে। তারা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। যে বিশ্বাস চালু, তাকে অবিশ্বাস করে। তারপর? চালু-বিশ্বাস যদি বা ভাঙে, আর এক নতুন বিশ্বাসের জন্ম হয়।…”
