মুরারিবাবু উসখুস করছিলেন। বললেন, “আমার এই বউদি, স্যার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা! যেমন রূপ, তেমনি গুণ।” বলে কর্নেলের প্লেট থেকে দুটো প্রকাণ্ড সন্দেশ তুলে মুখে পুরলেন।
বিরুর বউদি বললেন, “আহা, ওই তো তোমার প্লেট! তোমাকে নিয়ে পারা যায় না!”
মুরারিবাবু প্লেট গুনলেন। “এক…দুই…তিন!…অ! আমি ভাবলুম…যাকগে! খেয়ে যখন ফেলেইছি…কর্নেলস্যারের যা বয়স, মিষ্টি খাওয়া উচিত না।” উনি নিজের প্লেটটা হাতিয়ে নিলেন এবং খাওয়ার দিকে মন দিলেন।
বিরুর বউদি আস্তে বললেন, “যেদিন রাতে উনি মারা যান, সেদিনই বেশ কয়েকবার আমাকে বলছিলেন, কর্নেলসায়েবকে চিঠি লেখা হচ্ছে না। অ্যাড্রেসটা জোগাড় করেছি। নোটবইতে লেখা আছে। যদি আমি কোনো বিপদে পড়ি তো ওঁকে খবর দিও। পরদিন তো যা মনের অবস্থা, চিঠি লিখব কী! পরের দিন লিখে বিট্টুকে দিয়ে ডাকে পাঠালাম। প্রত্যেকদিন ভাবি, আজই আসবেন। এ-এই করে করে…”
মুরারিবাবু শুনছিলেন। বললেন, “আমাকে তোমরা পর ভাবো। নকুলদা ভাগ্যিস আমাকে বলে রেখেছিল। ..হুঁ হুঁ, কী ভাবছ? এই শৰ্মাই গতকাল কলকাতা গিয়ে ওঁকে টেনে এনেছে। …ওই বিরুটা! বিরুটা আমাকে ঘরে তালা আটকে সাতদিন…সাতটা দিন বন্দী করে রাখল। তারপর আর এ-ঘরে ঢুকতে পাইনি যে নকুলদার নোটবই থেকে ঠিকানা নেব। …শেষে পরশুদিন নোটবইটা বিট্টুকে দিয়ে হাতিয়ে…এই দ্যাখো!” বলে পকেট থেকে সেই নোটবইটা বের করলেন।
বিরুর বউদি সেটা ছিনিয়ে নিয়ে কর্নেলকে দিলেন। “দেখছ কাণ্ড? তাই খুঁজে পাচ্ছি না কাল থেকে। বেরোও! বেরোও বলছি ঘর থেকে! পাগলামির একটা সীমা থাকা উচিত।”
মুরারিবাবু বললেন, “উপকার করলে এই হয় সংসারে। ঠিক আছে। তিন কাপ চা দেখছি। অঙ্ক কষলেই এক কাপ আমার। খেয়েই বেরোচ্ছি। আর তোমাদের ত্রিসীমানায় আসব না।”
“হুঁ, গাছে চড়ে বসে থাকোগে!” বিরুর বউদি বললেন, “ওদিকে উনি মার্ডার হয়েছেন, এদিকে একে নিয়ে ঝামেলা। সামলানো কঠিন। শেষে বুদ্ধি করে বিরু আটকে রাখল ঘরে।…ঠাকুরপো! শোনো তো!”
বিরু বারান্দা থেকে বলল, “কী?”
“বিট্টুকে ডেকে নিয়ে এসো তো। ঘুড়ির লোভ দেখিও, আমার নাম করে। তা হলে আসবে।” মুরারিবাবু কেত-কোঁত করে চা গিলে বললেন, “বিরুর কম্ম নয়। আমি যাচ্ছি।”
উনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। বিরুর বউদি বললেন, “ঠাকুরপো, তুমি যাও। মুরারি ঢিল খেয়ে রক্তারক্তি হবে।”
কর্নেল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “অবশ্য আজকাল ডাকে চিঠি যেতে খুব দেরি হচ্ছে। তাই হয়তো আপনার…তুমিই বলছি বরং… জয়ন্তকে যেভাবে তুমি বলেছ!” কর্নেল প্রায় অট্টহাস্য করলেন।
বিরুর বউদি বললেন, “না, না। আপনি আমার বাবার বয়সি। তুমিই বলুন।”
“তোমার নাম কী মা?”
“রমলা।”
“তোমার স্বামী আমার কথা কবে থেকে বলতে শুরু করেন, মনে আছে?”
রমলা একটু ভেবে বললেন, “আজ ৯ এপ্রিল। উনি মার্ডার হন ২৮ মার্চ।..হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ১৭ মার্চ রাতে, তখন প্রায় দশটা বাজে, বাড়ি ফিরলেন। কেমন যেন চেহারা…খুব ভয় পেলে যেমন দেখায় মানুষকে। …তো এমনিতে খুব কম কথা বলতেন। জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে? বললেন, কিছু না। শরীরটা ভালো না। সেই রাতে হঠাৎ বললেন, একটা ধাঁধায় পড়েছি। কর্নেলসায়েবকে চিঠি লিখব। তারপর আপনার পরিচয় দিলেন। কিন্তু ধাঁধাটা কী, কিছুতেই বললেন না। শুধু বললেন, আমার নোটবইতে টুকে রেখেছি। তুমি বুঝবে না।”
কর্নেল নোটবইটার পাতা ওলটাতে থাকলেন। “হুঁ, ওঁর ডেডবডি কোথায় পাওয়া যায়?”
“ওই অলুক্ষুনে দেউড়ির নীচে।”
“কে দেখেছিল?”
“মুরারি। জ্যোৎস্না ছিল সে-রাতে। রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরছেন না দেখে মুরারি আর বিরুকে পাঠালুম। বিরু গিয়েছিল বাজারের ওদিকে লাইব্রেরিতে। ওখানে রোজই যেতেন।”
“মুরারিবাবু দেউড়ির দিকে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। …দেখে এসে…একে আধপাগলা মানুষ, আরও পাগল হয়ে গেলেন। কান্নাকাটি, আবোলতাবোল কথা, ঢিল ছোঁড়াছুড়ি, যাকে সামনে পান মারতে যান, ভাঙচুর…দু’দিকে দুই বিপদ তখন।”
“আচ্ছা রমলা, তোমাকে নকুলবাবু তিন-শিংওয়ালা ছাগলের কথা বলেছিলেন?”
রমলা চমকে উঠলেন। একটু পরে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলেছিলেন মনে পড়ছে। সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন, কেউ কখনও তিন-শিঙে পাঁঠা দেখেছে নাকি? এটা উনি মার্ডার হওয়ার ক’দিন আগের কথা। শুধু মুরারি বলল, দেখেছে। ও তো পাগল! ওর কথা! উনি আমল দেননি।”
“তুমি তিনকড়িবাবুকে চেনো?”
“একটু-আধটু চিনি। জাহাজে চাকরি করেন। বার-দুই এসেছিলেন। মুরারির জ্ঞাতি-ভাই। ওর সঙ্গে মামলা লড়ে মুরারির এই অবস্থা। তবে মামলা চলছিল তিন পুরুষ ধরে।”
“একটা দেউড়ি নিয়ে?”
রমলা অনিচ্ছায় হাসলেন। “তাই তো শুনেছি। আসলে জেদের লড়াই।”
“তিনকড়িবাবুর এখানে আর কোনো আত্মীয় আছেন?”
“আছে। করালীবাবু। এখন বাজারের ওখানে বাড়ি করেছে। ব্যাবসা করে খুব পয়সা কামাচ্ছে। তিনকড়িবাবুর কাকার ছেলে।”
“তিনকড়িবাবু কি বেঁটে, মোটাসোটা, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স?”
“বয়স জানি না। বার-দুই বিরুর দাদার কাছে এসেছিলেন। হ্যাঁ, বেঁটে। মোটাসোটা মানুষ। আপনি চেনেন ওঁকে?”
কর্নেল জবাব দিলেন না সে-কথার। বললেন, “নোটবইটাতে মুরারিবাবু খুব হাত লাগিয়েছেন, এটাই সমস্যা। এটা আমি রাখছি, রমলা!”
