ঘরের ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলুম। কর্নেলের মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠল। ঘরভর্তি পুরোনো বই-পত্রপত্রিকা, তাক এবং আলমারিতে বিচিত্র গড়নের সব পুতুল, পাথরের টুকরোয় খোদাই-করা আঁকিবুকি। কর্নেল বললেন, “এ তো দেখছি প্রত্নশালা! বিরু, তোমার দাদা কী করতেন?”
বিরু বলল, “দাদার ওই এক বাতিক ছিল স্যার! কোত্থেকে সব কুড়িয়ে এনে জড়ো করতেন। স্কুলে মাস্টারি করতেন। মাস্টারি ছেড়ে বাতিক আরও বেড়ে গিয়েছিল। সারাদিন জঙ্গলে ঢিবিতে ঘুরে বেড়াতেন টোটো করে। আর রাজ্যের যত উদ্ভুট্টে জিনিস কুড়িয়ে আনতেন।”
কর্নেল ঘুরে-ঘুরে সব দেখছিলেন। মুখে বিস্ময় আর তারিফের ছাপ। বিড়বিড় করছিলেন আপনমনে।”..শিলালিপি! …দাঁতের জীবাশ্ম! …বুদ্ধমূর্তি, নাকি শিব… আশ্চর্য! বড় আশ্চর্য! এমন ব্যক্তিগত সংগ্রহ কোথাও দেখিনি! …মাই গুডনেস! এ তো কুষান মুদ্রা! …ব্রোঞ্জের যক্ষিনী…তাম্রশাসন…”।
বাইরে থেকে ডাক এল, “ঠাকুরপো!”
বিরু চলে গেল। কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত! বুঝতে পারছ কিছু?”
বললুম, “হ্যাঁ, আপনার মতোই কুড়ুনে স্বভাবের লোক ছিলেন। তবে আপনি আবার রহস্যভেদীও। আর এই নকুলবাবু রহস্যভেদী ছিলেন না, এই যা।”
“না জয়ন্ত! রহস্যভেদ করতে গিয়েই প্রাণে মারা পড়েছেন ভদ্রলোক।”
“সোনার মোহর-ভরা ঘড়ার রহস্য।”
“উঁহু। ব্যাকরণ রহস্য।” বলে কর্নেল এতক্ষণে চেয়ারে বসলেন।
এইসময় মুরারিবাবু হন্তদন্ত এসে ঢুকলেন। তক্তাপোশে পাতা বিছানায় ধপাস করে বসে বললেন, “পালিয়ে গেল বাঁদরটা! বিষ্ণুবাবুর ঘরে এই এক অবতার। তিন তিরেক্কে দেখিয়ে ছেড়ে দিতুম।”
কর্নেল একটু হেসে বললেন, “ছেলেটি বেশ।”
“বেশ? বিচ্ছু! বাঁদর!” মুরারিবাবু বললেন। “গাছে-গাছে ঘোরে। দালানের মাথায়-মাথায় ছোটে। দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়, স্যার!…” বলে খ্যাক করলেন। “তবে আমারই ট্রেনিং, বুঝলেন? একদিন ঘুড়ি আটকে গেছে গাছের ডগায়, করুণ মুখে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, জ্যাঠাকমশাই, আপনি তো গাছে চড়তে পারেন, দিন না ঘুড়িটা পেড়ে। ….পেড়ে দিলুম। তারপর ট্রেনিং দিতে শুরু করলুম। …একদিন স্যার নকুলদা বলল, মুরারি, তুমি তো বেশ গাছে চড়তে পারো দেখেছি। বললুম, হুঁ, পারি। বলে কী, তোমাদের দেউড়ির মাথায় চড়তে পারবে? …না স্যার! কড়িদার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে লড়ে হেরে গেছি। কড়িদা এখানে নেই তো কী হয়েছে? চক্ষুলজ্জা বলে কথা। ..নকুলদা স্যার, বড্ড গোঁয়ার। বিষ্ণুবাবুর ছেলে ওই যে দেখলেন, … বিচ্ছু, বাঁদর…”
কর্নেল বললেন, “ছাগলও বলতে পারেন। কেমন ব্যা-অ্যা ডেকে ভেংচি কাটল!”
মুরারিবাবু কান করলেন না। “ওর ডাকনাম আবার বিট্টু…বি-টু-টু…এও তিন! তিন তিরেক্তে নয়, নয়ে-নয়ে একাশি!”
“আপনি কি নিউমারোলজিস্ট, মুরারিবাবু?”
“আজ্ঞে। একটু-আধটু চৰ্চা করি আর কি!” মুরারিবাবুর ট্রেন চলতে থাকল। “নকুলদা বিট্টুকে ঘুড়ির লোভ দেখিয়ে চড়াল। বাস্! দেউড়ির মাথায় চড়াল। …বাপ নিজের মাথায় চড়িয়েছে, নকুলদা এককাঠি সরেস। দেউড়ির মাথায় চড়াল। তারপর থেকে রোজ দেখি দেউড়ির মাথায়… শাসালুম, থাম। কড়িদা আসছে! জিভ দেখায় আর ব্যা করে। ইউ আর রাইট। পূর্বজন্মে ছাগলই ছিল।”
“আপনার এই কড়িদাটি কে?”
“তিনকড়িদা। আমার জ্ঞাতি। মহাভারত কি মিথ্যা, বলুন আপনি? কুরুক্ষেত্র কি মিথ্যা? তবে এখন যুদ্ধ কাগজে-কলমে, উকিলে-ব্যারিস্টারে…জজের সামনে। বেধে গেল লড়াই।”
“তিনকড়িবাবু থাকেন কোথায়?”
“শুনেছি জাহাজে চাকরি করে। কঁহা-হা মুল্লুক ঘোরে। সমুদ্রে মহাসাগরে। বলবেন, তা হলে মামলা কে লড়ল? …মামলা লড়ে ব্যারিস্টার। ওর ভগ্নীপতি ব্যারিস্টার। …হারিয়ে দিলে! সবই তিন তিরেক্কের খেলা সার!” মুরারিবাবু পকেট থেকে নোটবই বের করে একটা পাতা খুলে দেখালেন। “এই দেখুন! হিসেব কষে রেখেছি। আপনিই খুঁজে বের করতে পারবেন নকুলদাকে কে মারল, শিব না মানুষ? নামের ব্যাঞ্জনবর্ণগুলোই লক্ষ করুন স্যার।”
উঁকি মেরে দেখলুম, লেখা আছে :
ক+র+ন+ল+ন+ল+দ+র+স+র+ক+র=১২
১+২=৩
ন+ক+ল+শ+ব+র+ঠ+ক+র=৯
৩x৩=৯
৯/৩ = ৩
কর্নেল নোটবই ফেরত দিয়ে বললেন, “নকুলেশ্বর ঠাকুরকে এলাকায় ঠাকুরমশাই বলত কেন, মুরারিবাবু? নিছক পদবির জন্য?”
“পদবি এল কোত্থেকে?” মুরারিবাবু বললেন, “নকুলদা’র ঠাকুর্দা পর্যন্ত শিবমন্দিরের সেবাইত ছিলেন। আমার ঠাকুর্দা জমিদার আর নকুলদা’র ঠাকুর্দা জমিদারবাড়ির মন্দিরের পুজো-আচ্চা করতেন। সেই থেকেই তো এই সম্পর্ক। ঠাকুরমশাই ডাকতে-ডাকতে ঠাকুর হয়ে গেল। ঠাকু-র…তিন! নাম্বারের খেলা। অঙ্ক! অঙ্কে অঙ্কে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলছে। এক থেকে তিন…ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর…তিন থেকে তেত্তিরিশ কোটি। খালি তিনের লীলা!…তিন তিরেক্কে নয়, নয়-নয়ে একাশি!…ছাগলটা দেউড়ির মাথায় চড়েছিল, স্যার! বলল, “একাশি!..তিন দিন।” বলে মুরারি তিনটে আঙুল তুললেন।
কান ঝালাপালা! এতক্ষণে বিরুর বউদি ট্রে হাতে ঢুকলেন। কর্নেল বললেন, “এ কি! আমরা সদ্য ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়েছি।”
ভদ্রমহিলা বললেন, “একটু মিষ্টিমুখ না করলে চলে? কত ভাগ্যে আপনি এসেছেন। উনি প্রায় বলতেন, কর্নেলসায়েবকে চিঠি লিখতে হবে। উনি ছাড়া এর জট…না, না। আপনি অন্তত একটা সন্দেশ খান।” বলে বিরুর বউদি আমার দিকে তাকালেন। “তুমি, বলছি ভাই, কিছু মনে কোরো না। তুমি আমার ঠাকুরপোর বয়সি। খাও! এখানকার মিষ্টি খাঁটি ছানার। তোমাদের কলকাতার মতো সয়াবিনের ছানা নয়।”
