কর্নেল আবার স্প্রিংয়ের বোতাম টিপে ফলা ঢুকিয়ে মারাত্মক জিনিসটা পকেটে চালান করে দিলেন। বললেন, “এটা আমার জাদুঘরের জন্য একটা চমৎকার স্যুভেনিরও বটে। বছর-দশেক আগে ঠিক এরকম একটি ছোরার সান্নিধ্যে এসেছিলুম, কোকো আইল্যান্ডে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানকার পুলিশকর্তা সেটি হাতিয়ে নেন। একই ছোরা, একই কোম্পানির তৈরি এবং একই বিষের মলম। তিনকড়িবাবু আমাকে ভাবিয়ে তুলেছেন, জয়ন্ত!”
আমরা কফি খেতে খেতে শের আলি জিপ নিয়ে এসে স্যালুট ঠুকল। বলল, “আফসোস কা বাত, কর্নিলসাব! ডি. ই. সাব আসতে পারল না। বেটি কি বুখার বহত বাঢ়ল। তো হাথিয়াগড় মিশনারি হসপিট্যালমে চলিয়ে গেলেন। উনি মাফি মাঙ্গা আপসে।”….
.
তিন
মুরারিবাবুকে শের আলি চেনে। উনি এখানে ‘পাগলাবাবু’ নামে সুপরিচিত। কিন্তু ওঁর বাড়ি পর্যন্ত জিপ যাবে না। ঘিঞ্জি গলির পর ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গলে-ঢাকা এলাকা। সেখানে কিছু পুরোনো একতলা বাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার একটাতে মুরারিবাবু থাকেন। শের আলির কাছে জানা গেল, সেও ওঁর নিজের বাড়ি নয়। শিবের ত্রিশূলের আঘাতে যাঁর রহস্যময় মৃত্যু ঘটেছে, সেই নকুলেশ্বর ঠাকুরের বাড়ি। একটা ঘরে মুরারিবাবুকে থাকতে দিয়েছিলেন।
শের আলি বাজারের রাস্তায় জিপ রেখে আমাদের নিয়ে গেল। ডাক শুনে একজন আমার বয়সি যুবক বেরোল। মাথা ন্যাড়া দেখে বুঝলুম, নকুলবাবুর শ্রাদ্ধশান্তি চুকে গেছে। মফস্বলের খবর কলকাতার কাগজের হাতে পৌঁছতে দেরি হয়। সম্প্রতি বলে যে ঘটনা ছাপা হয়, তা হয়তো ঘটে গেছে এক-দু’সপ্তাহ আগে। মুরারিবাবুও এমন অস্পষ্টভাষী মানুষ, ওঁর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, সদ্য ঘটনাটি ঘটেছে।
যুবকটি অবাক চোখে আমাদের দেখছিল। শের আলি বলল, “কর্নিলসাব, ইয়ে ঠাকুরমেশার ভাই আছে। আপলোগ বাতচিত কিজিয়ে। ম্যায় গাড়িকা পাশ ইন্তেজার করুঙ্গা!”
সে চলে গেলে যুবকটি বলল, “আপনারা কোত্থেকে আসছেন স্যার?”
কর্নেল বললেন, “কলকাতা থেকে। মুরারিবাবুর সঙ্গে একটু দরকার আছে।”
যুবকটি খাপ্পা হয়ে গেল হঠাৎ।”মুরারিদাকে নিয়ে পারা যায় না! ওঁর মাথায় কী করে যে ঢুকে গেছে, সোনার মোহর-ভরা ঘড়া পোঁতা আছে কর্তাবাবার ভিটেয়! স্যার, আপনারা বুঝতে পারেননি মুরারিদার মাথায় ছিট আছে?”
কর্নেল অমায়িক হেসে বললেন, “তোমার নাম কী ভাই?”
“বীরেশ্বর…” বলেই সে চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাই মুরারিদা, ওখানে কী করছ? দেখছেন পাগলের কারবার?” সে তেড়ে গেল।
একটু তফাতে একটা ঝাকড়া গাছ। তার উঁচু ডালে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে মুরারিবাবু উলটোদিকে ঘুরে কী যেন দেখছিলেন। মুখ ঘুরিয়েই আমাদের দেখতে পেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে সেই বিদঘুঁটে খাক হেসে হনুমানের মতো চমৎকার নেমে এলেন, পরনে পাঞ্জাবি-ধুতি এবং ধুতির কেঁচা পকেটে গোঁজা! গাছটার তলায় জুতো রাখা ছিল। পা গলিয়ে পরে সহাস্যে এগিয়ে এলেন নমস্কার করতে-করতে। “এসে গেছেন! নকুলদা বলেছিল, আমার কিছু হলেই খবর দিবি। ঠিকানাও নিজের হাতে লিখে দিয়েছিল। কিন্তু যাব কী করে? যেতে দিলে তো? সাত দিন স্যার, সাত-সাতটা দিন বন্দী!… এই বিরুটাকে অ্যারেস্ট করা উচিত। আমাকে সাত দিন আটকে রেখেছিল। …এও স্যার তিনের খেলা। তিন সাতে একুশ..দুইয়ের পিঠে এক একুশ… এবার দেখুন, দুই প্লাস এক ইজ ইকোয়াল টু থ্রি-অ্যাই বিরু! অমন করে তাকাবিনে! ইনি কে জানিস?”
বিরু রাগতে গিয়ে একটু হেসে ফেলল। “কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছেন তো আপনারা?”
মুরারিবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “শাট আপ! তুই সেদিনকার হাফপেন্টুল-পরা ছেলে। তুই কী বুঝিস? আসুন স্যার, আমার ডেরায় আসুন।”
বিরু বলল, “মুরারিদার কোনো কথা আপনারা বিশ্বাস করবেন না স্যার! ওঁর পাল্লায় পড়েই দাদা মার্ডার হয়ে গেল। সোনার মোহর-ভরা ঘড়ার লোভে না পড়বে, না মার্ডার হবে।”
সদর-দরজা খুলে থান-পরা এক মহিলা উঁকি দিচ্ছিলেন। বললেন, “ঠাকুরপো, জিজ্ঞেস করো তো উনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নাকি?”
চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল টুপি খুলে বিলিতিভাবে মাথা একটু নামিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, ম্যাডাম। আমিই।”
সেই মুহূর্তে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল, কর্নেল টুপি খুলতেই টাক ঝকমকিয়ে উঠেছিল এবং সেই টাকে একটা ছোট্ট ঢিল এসে পড়ল। কর্নেল টাকে হাত দিয়ে দ্রুত ঘুরলেন। উলটো দিকে একটি একতলা বাড়ির ছাদে বছর দশ-বারো বছরের একটি ছেলে জিভ দেখিয়ে ভো-কাট্টা হয়ে গেল।
বিরু চেঁচিয়ে বলল, “দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি।”
মুরারিবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “বাপের আশকারা পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে। মারব এক থাপ্পড়!… এসো এবার ‘ঘুড়ি আঁটকে গেছে জ্যাঠাকমশাই, পেঁড়ে দিন’ বলতে।… তিন তিরেক্তে নয়, নয়-নয়ে একাশি দেখিয়ে দেব।”
নেপথ্যে আওয়াজ এল, “ব্যা-ব্যা-অ্যাঁ!”
অমনি কর্নেল ফিক করে হেসে বললেন, “ব্যা-করণ!”
মুরারিবাবু বাড়িটার চারপাশে ছুটোছুটি শুরু করলেন। দুর্বোধ্য কীসব কথাবার্তা। বিরুর বউদি গম্ভীরমুখে বললেন, “ছেড়ে দিন। আপনারা ভেতরে আসুন। ঠাকুরপো, ওঁদের নিয়ে এসো।”
ভেতরে একটুকরো উঠোন। কুয়োতলা। উঁচু বারান্দা। একটা ঘর খুলে দিলেন বিরুর বউদি। বিরু বলল, “বসুন স্যার! দাদার ঘর। বাইরে বসার ঘরটা মুরারিদাকে থাকতে দিয়ে গেছে দাদা।”
