“মাই গুডনেস!” কর্নেল ঘুরে বসলেন আমার দিকে। চোখ দুটো উজ্জ্বল। “কী হল?”
কর্নেল চুপ। একটু পরে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি চোখ বুজে ঘুমোতে চেষ্টা করলুম এবং সত্যিই একটি তিন-শিংওয়ালা ছাগল কল্পনা করলুম, যেটা দৌড়চ্ছে। মনে-মনে তার পেছনে দৌড়তে থাকলুম। দৌড়তে দৌড়তে দৌড়তে…
“চায়, ছোটাসাব!” তিন-শিংওয়ালা ছাগলটা বলল। “সাব! চায় পিজিয়ে।”
চোখ খুলে দেখি তিন-শিংওয়ালা ছাগল নয়, মাধবলাল। ঘরে উজ্জ্বল রোদ্দুরের ছটা ঝলমল করছে। সে বিনীতভাবে বলল, “বড়াসাব বোলকে গেয়া, সাড়ে সাত বাজকো ছোটাসাবকো বেড-টি দেনা।”
উঠে বসে চায়ের কাপ-প্লেট নিলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “কর্নেলসাব কখন বেরিয়েছেন?”
“ছয় বাজকে।” মাধবলাল খিকখিক করে হাসল। “ফারাঙ্গা পাকাড়নে গেয়া, মালুম হোতা। কর্নিলসার ইস দফে জরুর কম-সে-কম একঠো তো পাকড়ায়েগা!…তো হামি বলল, জেরাসা বড়া হোনা চাহিয়ে। কর্নিলসাব বলল, হাঁ, বড়া নেট লেকে আয়া।”
‘ফাটরাঙ্গা’ জিনিসটা যে প্রজাপতি, বুঝে গেছি। গরম চা খেয়ে চাঙ্গা হওয়া গেল। তারপর বাথরুম সেরে এসে দেখি, প্রকৃতিবিদ গেটে ঢুকছেন। ঢুকে ফুলে-ফুলে সাজানো সুদৃশ্য লনের ওপর দিয়ে উত্তরের নিচু পাঁচিলের কাছে গেলেন। চোখে বাইনোকুলার স্থাপন করলেন। উত্তরের জানালায় গিয়ে জলাধারটি দেখতে পেলুম। অবিকল চিল্কা হ্রদের মতো। প্রচুর পাখিও দেখা যাচ্ছিল। এদিকে-ওদিকে ছোট্ট দ্বীপের মতো টিলা জঙ্গলে ঢাকা।
ভালো করে দেখার জন্য বেরিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসলুম। কর্নেলের পাখি দেখা শেষ হল। ঘুরে বারান্দার দিকে আসতে-আসতে সম্ভাষণ করলেন, “গুড মর্নিং, ডার্লিং! আশা করি, ছাগলটি ধরতে পারোনি?”
হাসতে-হাসতে বললুম, “আশা করি আপনিও ফাটরাঙ্গা ধরতে পারেননি?”
কর্নেল বিমর্ষভাবে বললেন, “নাঃ। বেজায় ধূর্ত।…কী আশ্চর্য!”
হঠাৎ তিনি ছড়ির ডগায় আটকানো গুটিয়ে-থাকা সূক্ষ্ম তন্তুর নেটটি ছাতার মতো বোতাম টিপে খুলে দিলেন। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলেন। একটা ফুলের ঝোঁপের মাথায় প্রজাপতিটাকে এবার দেখতে পেলুম। রোদ্দুরে ডানা ঝিলমিল করছে। কিন্তু তারপরই ওটা উড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে ডানায় অবিকল সাতটা রঙ রামধনুর মতো স্পষ্ট দেখতে পেলুম। কর্নেল বললেন, “যাঃ! একটুর জন্য…”।
প্রজাপতিটা নিচু পাঁচিল পেরিয়ে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল বিষণ্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর চলে এলেন। বারান্দায় উঠে বললেন, “যাই হোক, নেটে ধরতে না পারলেও ক্যামেরায় ধরেছি। এটাই একটা সান্ত্বনা। তবে ঠিক-ঠিক রংগুলো আসবে কি না কে জানে।”
বললুম, “তিনকড়িচন্দ্রের দেখা পাননি তো?”
কর্নেল হাসলেন। “পেয়েছি। নদীর ব্রিজ থেকে বাইনোকুলারে ওপারের ধ্বংসাবশেষ দেখছিলুম। এক মিনিট ধরে দেখলুম, তিনকড়িবাবু ব্যস্তভাবে এদিক-ওদিক করে বেড়াচ্ছেন। ওদিকেই সূর্য। তাই সরাসরি লেন্সে রোদ্দুর পড়ছিল। বাকিটা দেখতে পেলুম না।”
কর্নেল কথাগুলো এমন নির্বিকার মুখে বললেন, যেন গতরাতে ট্রেনে আসতে-আসতে তিনকড়িচন্দ্রের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেছে। হিরো-ভিলেন ফাইটটা নেহাত ফিল্মি ঘটনা, অর্থাৎ স্রেফ অভিনয়! স্বভাবত আমার মুখে রাগ ফুটে বেরিয়েছিল। বারান্দার সাদা রং মাখানো বেতের টেবিলে মাধবলাল ট্রে-তে কফির পট, পেয়ালা রেখে গেল। বুঝলুম, সে কর্নেলের রীতি-নীতি এবং পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে বেশ পরিচিত।
আমার মনের ভাব ধুরন্ধর বৃদ্ধের চোখ এড়ায়নি। বললেন, “চলন্ত ট্রেন, তা যত আস্তে চলুক, বেয়াড়া যাত্রীদের পছন্দ করে না। তা ছাড়া নিয়ম হল, গতিশীল যানবাহন থেকে নিরাপদে নামতে হলে যেদিকে গতি, সেইদিকে ঝাঁপ দিতে হয়। উলটো দিকে ঝাঁপ দিলে হাড়গোড় ভাঙা অনিবার্য। সোজাসুজি ঝাঁপ দিলে তার চান্স সামান্য কমে। আমাদের তিনকড়িবাবু এই প্রাকৃতিক নিয়ম জানেন। তিনি গতির দিকেই ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে বললুম, চলন্ত ট্রেন বেয়াড়া যাত্রীদের পছন্দ করে না। বেচারা একটু ল্যাংচাচ্ছেন। হাতে ছড়ি নিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে, তোমার অবস্থা বিবেচনা করো, জয়ন্ত! তুমি অমন ওজনদার মানুষের ধাক্কা সামলে দিব্যি হাঁটাচলা করতে পারছ। একটুও ল্যাংচাচ্ছ না।”
বলার ভঙ্গিতে রাগ পড়ে গেল। বললুম, “ছোরার ঘা কিন্তু আপনিই খেতেন। যাকে বেচারা বলে সমবেদনা জানাচ্ছেন, তার ছোরাটা এখন একবার চাক্ষুষ করলে আমার মতোই রেগে যাবেন।”
কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর-পকেট থেকে যে-জিনিসটা বের করলেন, সেটা ছোরার বাঁট বলে মনে হল। অবাক হয়ে বললুম, “বাঁট আছে, ফলা নেই! ভেঙে গেল কী করে?”
কর্নেল বাঁটের একটা জায়গায় চাপ দিতেই ছ-সাত ইঞ্চি ঝকঝকে ফলা গোখরো সাপের ফণার মতো বেরিয়ে পড়ল। বললেন, “ম্প্রিংওয়ালা ছোরা। বিদেশি জিনিস। তবে আফ্রিকার নয়, এবং বুগান্ডা মিউজিয়ামের ডঃ হোয়াহুলা হোটিটি উপহার দেননি, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। একটু ভিজে দেখাচ্ছে, লক্ষ করো। আবছা সবুজে রঙের মলম মনে হচ্ছে না? ওটা সাপের বিষ থেকে তৈরি। তার মানে, একটু খোঁচা খেলেই ঘা বিষিয়ে যাবে। এমনকি, ক্রমশ রক্ত বিষিয়ে মারা পড়তেও পারো।”
ভয়ে বুক ধড়াস করে উঠল। বললুম, “তবু শয়তানটাকে আপনি বেচারা বলছেন!”
