কর্নেল মুরগির ঠ্যাং কামড়ে বললেন, “তিন! তিন তিরেকে নয়। নয়ে-নয়ে একাশি।”
মাধবলাল বুঝতে না পেরে বলল, “হুজৌর?”
“শিবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের দাগ দেখে এসেছ মাধবলাল?”
সে অমনি চমকে উঠে করজোড়ে প্রণাম করে বলল, “আই বাপ! শিউজিকা পূজা বন্ধ থা। তো আদমি বলিদান হো গয়া সাব! উও বাঙ্গালি ঠাকুরমশাইভি আচ্ছা আমি নেহি থা। বহোত ঝামেলাবাজ থা। খালি ইসকা-উসকা সাথ টোক্কর লাগাতা। শিউজি উনহিকো বলিদান লে লিয়া।”
“মুরারিবাবুকে চেনো?” মাধবলাল খিকখিক করে হাসতে হাসতে ঝুঁকে পড়ল। “পাগলা! সির পাগলা!”
কেন পাগলা, জিজ্ঞেস করলে মাধবলাল অনর্গল তার মাতৃভাষায় মুরারিবাবু সম্পর্কে একটা লম্বা বক্তৃতাই দিল। আমাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা একটানা চলল। তার সংক্ষিপ্তসার হল এই :
মুরারিবাবুর ঠাকুর্দার আমলে রূপগঞ্জে ওঁদের খুব দাপট ছিল। অমন বড়লোক এ-তল্লাটে আর কেউ ছিল না। প্রচুর জমিজমা, মহাজনি কারবার, বিশাল দালানবাড়ি, একটা মোটরগাড়ি পর্যন্ত ছিল। তারপর যা হয়! সাত শরিকে মামলা-মকদ্দমা, ঝগড়াঝাটি। একটা ভাঙা দেউড়ি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অবধি আইনের লড়াই তিন পুরুষ ধরে। ততদিনে দেউড়িটার মাত্র আধখানা টিকে আছে। আধখানা দেউড়ির মাথায় জল গজিয়ে গেছে। সাবেকি বাড়ি মুখ থুবড়ে পড়েছে। কড়ি-বরগা, দরজা-জানালা চৌকাঠসুধু যে যখন সুযোগ পেয়েছে, উপড়ে নিয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ওই আধখানা দেউড়ি মুরারিবাবুর হাতছাড়া হয়ে গেল, আর সেই থেকে তার মাথাও খারাপ হয়ে গেল। মামলা এমন জিনিস, বেশিদিন চালিয়ে গেলে মানুষের ঘিলু ফেঁসে যায়। ফলে দেউড়িটা নাকি দেখবার মতো জিনিস। এত উঁচু দেউড়ি সচরাচর দেখা যায় না। মাধবলালের ধারণা, পাশের শিবমন্দিরটার চেয়ে দেউড়িটা উঁচু করে তৈরির জন্যই শিবের কোপ পড়েছিল ধাড়াবাবুদের বংশের ওপর। শিবের চেলারা দেউড়ির মাথায় সারা রাত নাচত, দমাদ্দম লাথি মারত, দাপাদাপি করে বেড়াত। কাজেই যত শক্তই হোক, ওটা ধসে পড়ার কারণ ছিল। তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, পাথরে কখনও উদ্ভিদ গজায়? শিউজির শাপে পাথর ফেটে তাও গজিয়েছিল। তবে মুরারিবাবুর মাথা খারাপ হওয়ার মূল কারণ সম্পর্কে মাধবলাল নিশ্চিত নয়। তার শোনা কথা, মুরারিবাবু ভাঙা দেউড়ির মাথায় নাকি বিকট চেহারার কোনো শিবের চেলার দর্শন পেয়েই আতঙ্কে পাগলা হয়ে যান।…
কর্নেল এবং আমার জন্য উত্তর-পূর্ব কোণে একটা বড় ডাবল বেডরুম তৈরি রাখা হয়েছে। উত্তরের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, “এখান থেকে জলাধার দেখলে তোমারও মাথা খারাপ হয়ে যাবে, ডার্লিং! তবে আতঙ্কে নয়, আনন্দে! কী অপূর্ব! কী অলৌকিক সৌন্দর্য। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নায় এলে তুমি সত্যিই আকাশের পরিদের ঝুঁকে-ঝকে নেমে স্নান করতে দেখতে। কৃষ্ণপক্ষে জ্যোৎস্নাটা তত খোলতাই নয়।”
বললুম, “খোলা জানালা দিয়ে তিনকড়িচন্দ্ৰ ছোরা না ছোঁড়ে!”
তুমি বড় বেরসিক, জয়ন্ত!” কর্নেল হাসলেন। “তবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। মাধবলালকে যতই রোগাভোগা দেখাক, ওকে নিরীহ ভেবো না। ও এমন মানুষ, যার ঘুমন্ত অবস্থায় কান দুটো দিব্যি জেগে থাকে।”
দরজার পরদার বাইরে থেকে মাধবলালের সাড়া পাওয়া গেল তখনই। “সব ঠিক হ্যায়, সাব?”
কর্নেল বললেন, “ঠিক হ্যায়। তুম শো যাও।”
বলে দরজা এঁটে দিয়ে এলেন। তারপর জানালার ধারে চেয়ার টেনে বসে চুরুট টানতে থাকলেন। একটু হিমের ছোঁয়া এপ্রিলেও। ফ্যানের হাওয়া এবং পেছনের জলাধারও তার কারণ। চাদর-মুড়ি দিলুম। কর্নেল এয়ারকন্ডিশন্ড রুম একেবারে পছন্দ করেন না। প্রকৃতিবাদীর কারবার! এয়ারকন্ডিশন্ড রুম হলে অন্তত তিনকড়িচন্দ্রের পরোয়া না করে আরামে ঘুমনো যেত।
এপাশ-ওপাশ করছিলুম। মশারি নেই, কারণ মশা নেই। কিন্তু মশারি থাকলে খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত, যদিও ছোরার মশারি ছুঁড়ে ঢোকার ক্ষমতা আছে। শুধু একটা সুবিধে আমার বিছানার পশ্চিমে নিরেট দেওয়াল এবং দক্ষিণে বাথরুম। কর্নেলের বিছানার পাশেই পুবের জানালা, মাথার দিকে উত্তরের জানালা, দুটোই ভোলা। ফ্যানটা দুই বিছানার মাঝামাঝি আস্তে ঘুরছে। ছোরা ছুঁড়লে কর্নেলের বিপদের চান্স নিরানব্বই শতাংশ। দৈবাৎ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছিটকে এলে তবেই আমার বিপদ এবং সেটার চান্স এক শতাংশ মাত্র।
নাঃ, এই হিসেব করেও আতঙ্ক কাটছে না। ঘুমও আসছে না। একটু পরে দেখি, কর্নেল কোনার দিকের টেবিলের কাছে গেলেন। টেবিলবাতি জ্বেলে সেই চাকতিটা বের করলেন। তারপর নোটবইতে কী সব লিখতে শুরু করলেন। ঘড়ির রেডিয়াম-দেওয়া কাটা তিনটের ঘরে, যাকে বলে কাঁটায়-কাঁটায় রাত তিনটে।
বিরক্ত হয়ে ইচ্ছে করেই সশব্দে পাশ ফিরলুম। কর্নেল বললেন, “ঘুমের ওষুধ হিসাবে ভেড়ার পাল কল্পনা করে ভেড়া গোনার ব্যবস্থা আছে। এক্ষেত্রে তুমি তিন-শিংওয়ালা ছাগলটিকে কল্পনা করো। ঘুম এসে যাবে। কল্পনা করো, ওটা দৌড়চ্ছে, তুমিও তাকে ধরার জন্য দৌড়চ্ছ এবং ধরতে পারলেই বলি দেবে শিবের মন্দিরে। নাও, স্টার্ট!”
রাগ করে বললুম, “আমি কি বাচ্চাছেলে যে…”
কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, “কী বললে? কী বললে?”
“আমি বাচ্চা ছেলে নই যে এসব বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঘুম পাড়াবেন!”
