—তাই হবে, কর্নেল! কাক এসে তালগাছে বসল, আর একটা পাকা তাল পড়ল দেখে কেউ যদি ভাবে, কাক এসে বসল বলেই তালটা পড়ল—তাতে কোনও যুক্তি নেই। কাক না বসলেও তালটা পড়ত। কাজেই টোরাদ্বীপের জ্যান্ত নৃসিংহ, আর আপনার ওই ভদ্রলোকের চুরি যাওয়া পাথুরে নৃসিংহের মধ্যে কোনও সম্পর্ক থাকতেই পারে না।
কর্নেল বললেন—কিন্তু এটাও অদ্ভুত যে এই ভদ্রলোক একজন নামকরা চিকিৎসাবিজ্ঞানী। শল্যচিকিৎসা বা সার্জারিতে এঁর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি আছে।
কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলুম—কী নাম বলুন তো?
—ডঃ পরমেশ পুরকায়স্থ।
—নাম শুনেছি। কিন্তু এতে অদ্ভুত কী দেখতে পাচ্ছেন?
কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। নিভে-যাওয়া চুরুটটা ধরিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন—জয়ন্ত, হাতে যদি সময় থাকে তো এস আমার সঙ্গে।
-কোথায় বলুন তো?
—ডঃ পুরকায়স্থের বাড়ি। উনি সল্টলেকে বাড়ি করেছেন বছর দুই আগে। ঠিকানা ফোন গাইডে পেয়ে যাব বললেন।
—আপনার মাথা খারাপ? এই রাত্রিবেলা জনমানুষহীন ওই ভূতুড়ে এলাকায় আপনি ওঁর বাড়ি খুঁজে বের করতে পারবেন, ভেবেছেন? গেছেন কখনও ওই এলাকায়?
কর্নেল হাসলেন।—তুমি ঠিকই বলেছ বৎস! একবার রাত্রিবেলা সল্টলেকে আমার এক বন্ধুর বাড়ি গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্নে গিয়ে ফেরার সময় তিন ঘন্টা ঘুরে মরেছিলুম। সব রাস্তা একরকম—দূরে দূরে একটা করে বাড়ি। লোকজন নেই রাস্তায়। গোলকধাঁধা!
—তাহলে কোন সাহসে যেতে চাইছেন এখন?
কর্নেল ফোন গাইডের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন ডার্লিং! কলকাতার লোকেরা নীরস একঘেয়ে জীবনযাত্রার মধ্যে থেকে যখন হাঁপিয়ে ওঠেন, আমি তাদের পরামর্শ দিতে চাই—যদি বৈচিত্র চান, রোমাঞ্চ চান, বুক ঢিপঢিপ-করা আতঙ্ক আর তার সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারের দুঃসাহসী আনন্দও পেতে চান, তাহলে আপনারা রাত্রিবেলা সল্টলেকে চলে যান। সারারাত ঘুরুন। মনে হবে সে এক অজানা রহস্যময় দেশ। মাথার ওপর ঝলমল নক্ষত্র, কিংবা ভূতুড়ে চঁাদ—প্রান্তরব্যাপী ধূসর কুয়াশা আর হলুদ জ্যোৎস্নার মধ্যে একটা করে বাড়ি—নিঃশব্দ নির্জন বাড়ি—কী তাদের রহস্য! কী আশ্চর্য রূপমহল! সেখানে আরব্য উপন্যাসের দৈত্য আর পরীরা সারারাত ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়ায় এবং…
আমি আবাক হয়ে আমার বৃদ্ধ বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থিয়েটারি সংলাপ বা প্রলাপ শুনছিলুম, সেই সময় ওঁর ভৃত্য ষষ্ঠীচরণ কফির পেয়ালা সাজানো ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল—স্যার! আমাদের পেরজাপতিগুলো ডিম পেড়েছে আজ। সেদিনকে বললেন না আপনি-ষষ্ঠী, পেরজাপতির ডিম দেখিও। এবার দেখবেন আসুন।
কর্নেল সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে লাফিয়ে উঠলেন।-অ্যাঁ! ডিম পেড়েছে, ডিম? ও হো, কী সুখের কথা! জয়ন্ত! বুঝতে পারছ কি, কী প্রকাণ্ড অসম্ভব আমি সম্ভব করেছি? শীতকালে প্রজাপতিদের ডিম পাড়িয়েছি। দৈনিক সত্যসেবকের জন্যে এই অত্যাশ্চর্য খবর তুমি নিয়ে যেতে পার, বৎস!…বলেই উনি ওঁর পরীক্ষাগারের দিকে দৌড়লেন। ফোন গাইড পড়ে রইল।
ঠাকুরমশাইয়ের নতুন যজমান
প্রজাপতিগুলোকে অশেষ ধন্যবাদ। তারা জানুয়ারি মাসের ঠাণ্ডা কনকনে রাতে সল্টলেকে অ্যাডভেঞ্চারের হাত থেকে রক্ষা করল। কল্পনা করে শিউরে উঠেছিলুম, কুয়াশায় ঢাকা সল্টলেকের জনহীন রাস্তায় আমাদের গাড়ি সারারাত পেট্রল পুড়িয়ে হন্যে হচ্ছে—কিন্তু বেরুনোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
সে রাতে, আন্দাজ দশটায় যখন বুড়ো ঘুঘুর বাসা থেকে বেরুচ্ছি, তখনও ঘুঘুমশাই প্রজাপতির খাঁচার সামনে ঝুঁকে ধ্যানে মৌনীবাবা হয়ে রয়েছেন। আমার বিদায় সম্ভাষণ কানে শুনলেন বলে মনে হল না। দরজা আটকাতে এসে বেচারা ষষ্ঠী করুণ মুখে বলল—আজ রাতে আর আমার খাওয়া-শোওয়া হবে না স্যার।…
পরদিন সকালে উনি হঠাৎ আমার ফ্ল্যাটে হাজির হয়ে বললেন—এস জয়ন্ত, বেরিয়ে পড়া যাক।
অতএব বেরুতে হল। হ্যাঁ, সেই সল্টলেকে পরমেশ ডাক্তারের বাড়ি। সারা পথ কর্নেল প্রজাপতি বিষয়ে সমানে বকবক করলেন। কান পাতলুম না। বাড়ি খুঁজে বের করতে পারায় মিনিট কুড়ি লাগল। গেটের মুখে প্রকাণ্ড একটা অ্যালসেশিয়ান কুকুর আমাদের দেখে আপত্তি জানাল। তারপর যিনি হাসিমুখে এসে কুকুরটার বকলেস ধরে আমাদের সম্ভাষণ জানালেন, তিনি প্রখ্যাত শল্যবিদ ডঃ পুরকায়স্থ।
প্রথমে কর্নেল গেলেন বাগানে, যেখানে দশাবতার ফলক ফেরত পাওয়া গেছে। বাগান বলতে আমি যা ভেবেছিলুম, তেমন কিছু নয়। অল্প একটুখানি জায়গায় নানারকম ফুলের গাছ আর ক্যাকটাস। এটা বাড়ির পেছন দিক। তার ওপাশে অনেকটা ভোলা পোড়ড়া জায়গা। কাশকুশের বনে ভরা। কর্নেল বেড়ার ওধারে গিয়ে সেই ঘাসের জঙ্গলে কী সব খুঁজে-টুজে এসে বললেন—হুম! চলুন পরমেশবাবু, আপনার দশাবতার দর্শন করা যাক!
পরমেশ ম্লান হেসে বললেন-নবমাবতার বলুন কর্নেল!
কর্নেল হাসলেন। ঠিক বলেছেন। নবমাবতার।
বসার ঘরে আমাদের রেখে পরমেশ ভেতরে গেলেন এবং একটু পরে পেতলের সুদৃশ্য রেকাবে একটা কষ্টিপাথরের ফলক নিয়ে এলেন। ফলকটা মোটে ইঞ্চি নয় লম্বা এবং ইঞ্চি ছয়েক চওড়া। দশটা ভাগে ভাগ করা আছে। প্রত্যেক ভাগে একটা করে অবতারের মূর্তি খোদাই করা। ঠিক মধ্যিখানে একটা এবড়ো-খেবড়ো খোদল। বুঝলুম ওখানেই নৃসিংহ মূর্তিটা ছিল।
কর্নেল কোটের পকেট থেকে আতস কাচ বের করে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন ফলকটা। পরমেশ বললেন—একটা ব্যাপার লক্ষ্য করুন। ফলকটার চারটে ভাগ। প্রথম সারি ও দ্বিতীয় সারিতে রয়েছে তিনটে করে ছটা মূর্তি। পদ্মফুল দেখতে পাচ্ছেন! চোর শুধু ওই মূর্তিটাই খুবলে তুলে নিয়েছে। চতুর্থ সারিতে তিনটে মূর্তিও অক্ষত আছে।
