“জিনিসটা কী?”
“পুরোনো মুদ্রা। কিন্তু আশ্চর্য, এতে একটা তিন-শিংওয়ালা ছাগলের মূর্তি খোদাই করা আছে!”
“বলেন কী!” বলে কর্নেলের কাছে গিয়ে চাকতিটা দেখলুম। আবছা একটা ছাগল জাতীয় প্রাণীর মূর্তি দেখা যাচ্ছে। মাথায় ত্রিশূলের মতো তিনটে শিং, কী সব দুর্বোধ্য লিপিও খোদাই করা রয়েছে।
কর্নেল বললেন, “এও আশ্চর্য, বিস্তর প্রাণী দেবদেবী হিসেবে বা দেবদেবীর বাহন হিসেবে মানুষের পুজো পেয়েছে। কিন্তু ছাগল? সে তো বলির প্রাণী।”
কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। বললুম, “সে যাই হোক, আমার ভাবনা হচ্ছে হালদারমশাই মুরারিবাবুকে মিস করেছেন। তবে মিস করুন বা নাই করুন, রূপগঞ্জে উনি যাবেনই এবং এও ঠিক, গণ্ডগোলে পড়বেন। ওঁর যা স্বভাব। রহস্যের গন্ধ পেলেই হল। আসলে পুলিশের চাকরি থেকে রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন, কিন্তু মক্কেল জোটে না। কাজেই যেচে মক্কেল জোটাতে ছাড়েন না। পকেট থেকে ট্রেন-ভাড়া দিয়েও যাওয়া চাই।”
“জয়ন্ত, আমরাও ট্রেনে যাব।” কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। “গত এপ্রিলে গাড়ি নিয়ে গিয়ে বড় ঝামেলায় পড়েছিলুম। জায়গায়-জায়গায় রাস্তার অবস্থা শোচনীয়। ট্রেনই ভালো। শুধু একটাই অসুবিধে। পরের ট্রেনে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাবে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ইরিগেশন বাংলো। চড়াই রাস্তা বলে সাইকেল-রিকশা মেলে না–সে তুমি যত টাকাই ভাড়া দাও
কেন। একটা ভরসা ঘোড়াগাড়ি। কিন্তু রাতবিরেতে ঘোড়াগাড়ি পাওয়ার চান্স কম। ..হঁ, ডি ই ভদ্রলোককে বললে জিপের ব্যবস্থা হতে পারে। তাঁকে টেলিফোনে পাওয়া সমস্যা। তবে কলকাতা হেডকোয়ার্টার থেকে বাংলো বুক করার অসুবিধে নেই। দেখা যাক।”
উনি টেলিফোনের দিকে উঠে গেলেন। বললুম, “হালদারমশাইয়ের মতো তাড়াহুড়ো না করলেই কি নয়? আগামীকাল সকালের ট্রেনে গেলে ক্ষতি কী?”
কর্নেল মুখটা যথেষ্ট গম্ভীর করে বললেন, “ক্ষতি মুরারিবাবুরই হওয়ার চান্স বেশি। ভদ্রলোক একেবারে ছিটগ্রস্ত। আমার খুব ভয় হচ্ছে জয়ন্ত…” কথা শেষ না করে কর্নেল ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন।
.
দুই
ট্রেন, না ছ্যাকরা গাড়ি! স্টেশনেও থামছে, আবার যেখানে স্টেশন নেই, সেখানেও থামছে। আর যখনই থামছে, নড়তেই চায় না। চাকাগুলোর শব্দে বড় অনিচ্ছা বিরক্তির প্রকাশ। আমাদের দু’জনের জন্য রিজার্ভ-করা কুপে-তে কর্নেল এক উটকো যাত্রী ঢুকিয়েছিলেন। বর্ধমান স্টেশনে সন্ধ্যা নাগাদ এঁর হন্তদন্ত আবির্ভাব। যাবেন রূপগঞ্জে। নাদুসনুদুস বেঁটে গড়নের লোক। এক হাতে ফোলিও ব্যাগ, অন্য হাতে খবরের কাগজে জড়ানো চৌকো বোঁচকা, পরে দেখলুম সেটা একটা বিছানা। ট্রেনে কোথাও নাকি পা রাখবার জায়গা নেই। কাকুতি-মিনতি করে কর্নেলকে গলিয়ে জল করে ফেলেছিলেন প্রায়, আমি প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিলুম। তারপর একটি কার্ড আমাকে ধরিয়ে দিলে আমার আপত্তিওঁ গলে জল হল। অর্থাৎ না করতে পারলুম না। কার্ডে ছাপানো আছে, ডঃ টি. সি. সিংহ। তারপর আমার জানা-অজানা দিশি-বিদিশি ডিগ্রির লেজুড়, এই ট্রেনটার মতোই লম্বাটে। কিন্তু আর যা সব লেখা আছে, তাতে বোঝা যায় ইনি মস্ত বিদ্যাবাগীশ পণ্ডিত। প্রত্নবিদ্যা, নৃবিদ্যা, ভাষাবিদ্যা থেকে শুরু করে এমন বিদ্যা নেই, যা এঁর অজানা। তার প্রমাণও পাচ্ছিলুম হাড়ে-হাড়ে। কান ভোর্ভে করছিল। কর্নেল কিন্তু বিরক্ত হওয়া দূরের কথা, মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনছেন আর সায় দিচ্ছেন। শুধু সায় দিচ্ছেন বলা ভুল হল, প্রশ্নও করছেন। বার্থে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছিলুম। ওদিকের বার্থে জানালার পাশে হেলান দিয়ে কর্নেল বসে আছেন এবং তার পাশে পণ্ডিতমশাই। কানে এল, কর্নেল জিজ্ঞেস করছেন, “আচ্ছা ডঃ সিংহ, ট্রেনের সঙ্গে স্ট্রেইনের কোনো সম্পর্ক আছে কি, মানে ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক?”
“আছে। বিলক্ষণ আছে। প্রথমে ধরুন ট্রেন শব্দটা। এর আক্ষরিক অর্থ কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া। টে-নে!” ডঃ সিংহ নড়ে বসলেন।”বাংলা টান শব্দটা দেখুন। টেনে নিয়ে যাওয়া। টানাটানি সহজ কাজ নয়, কষ্টকর। স্ট্রেইন শব্দের আক্ষরিক অর্থও কষ্টে টেনে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এ থেকে কী বেরিয়ে এল দেখুন! ইংরেজি ট্রেন আর বাংলা টান একই শব্দের দুটো রূপ। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে, আমরা বাঙালিরা এবং ইংরেজরা একই জানো।”
কর্নেল প্রশ্ন করলেন, “শিং-এর সঙ্গে সিংহের সম্পর্ক আছে কি?”
“অ্যাঁ?” পণ্ডিতমশাই হকচকিয়ে গেলেন। তারপর হোহো করে হেসে বললেন, “আপনার রসবোধ আছে। উগান্ডার বুগান্ডা মিউজিয়ামে যখন ডিরেক্টর ছিলুম, ডঃ হোয়াহুলা হোটিটি প্রায় ঠাট্টা করে বলতেন, সিংহকে আমরা বলি শিম্বা। তোমার পূর্বপুরুষ নিশ্চয় আফ্রিকান ছিলেন। …হ্যাঁ, আপনার প্রশ্নটা ভাববার মতো। শিং এসেছে সংস্কৃত শৃঙ্গ থেকে। যা উঁচুতে থাকে। যেমন পর্বতশৃঙ্গ। পর্বতশৃঙ্গের ছবি দেখবেন, কেমন ছুঁচলো–খোঁচার মতো। আকাশকে যেন তোচ্ছে। তাই না? তবে সিংহ, সিংহের স্থানও জন্তুদের মধ্যে উঁচুতে। তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে, দুটো শব্দেই উচ্চতা বোঝাচ্ছে, আবার হিংস্রতাও বোঝাচ্ছে। শৃঙ্গী জন্তু গুতো মারে, আর সিংহ মারে থাবা।”
