অমনি লেখাপড়ার টেবিলের সেই প্রকাণ্ড বইটার দিকে চোখ গেল। বাদামি চামড়ায় বাঁধানো gehiaCO GHIRT 967 66781 0169, ‘Ancient Kingdoms of Bengal, Vol. I’.
একটু হেসে বললুম, “তাহলে এখানেও শিং এসে যাচ্ছে। একটা পপুলার বাংলা গান শুনেছি, ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ/ডিম নেই তবু অশ্বডিম্ব…’ তাতে ‘ভ্যাবাচাকা’ কথাটাও ছিল মনে পড়ছে।”
কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, “রেনবো অর্কিড, ডার্লিং! তুমি তো আকাশে রামধনু দেখেছ। পৃথিবীতে রামধনু… শ’য়ে-শ’য়ে রামধনু দেখতে হলে রূপগঞ্জে চলো। গেঁয়ো যোগী ভিক্ষে পায় না বলে একটা কথা আছে। রূপগঞ্জের লোকেরা রেনবো অর্কিডের কদর বোঝে না। চোখ জ্বলে যায়, জয়ন্ত। কী অসাধারণ সৌন্দর্য এই এপ্রিলে!”
“তার মানে, আপনি যাচ্ছেন এবং আমাকেও তাতাচ্ছেন!”
কর্নেল টেলিফোনের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “রূপগঞ্জ নামটা যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনি নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যরসিক। শুধু কি রেনবো অর্কিডের ফুল? প্রজাপতিও। আর সেই প্রজাপতির ডানায় রামধনুর সাতরঙা সৌন্দর্য! দুঃখের কথা, ডার্লিং! রেনবো অর্কিড এনে বাঁচাতে পারিনি। তার চেয়ে আরও দুঃখ প্রজাপতিগুলো এত চালাক যে, একটাও নেটে আটকাতে পারিনি।”
ফোনে হাত বাড়াতে গিয়ে ডাইনে দরজার দিকে প্রায় ঝাঁপ দিলেন কর্নেল। কী একটা জিনিস তুলে নিলেন মেঝের কার্পেট থেকে।
একটা ছোট্ট গোল কালচে রঙের খয়াটে চাকতি।
বললুম, “কী ওটা?”
কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতস কাঁচ বের করে দেখতে দেখতে বললেন, “প্রাচীন যুগের মুদ্রা অথবা সিল। পরিষ্কার করলে বোঝা যাবে। মনে হচ্ছে, মুরারিবাবুর হাতেই এটা ছিল। দেখাতে এনেছিলেন। ট্রেন ফেলের ভয়ে তাড়াহুড়োয় হাত থেকে পড়ে গেছে। কার্পেটে পড়ার জন্যই শব্দ হয়নি। তবে…ওই! আবার উনি আসছেন। জয়ন্ত, দরজা খুলে দাও, প্লিজ!”
ফের নীচের দোতলায় কুকুরের চ্যাঁচামেচি, বিচ্ছিরি জুতোর শব্দ। ভদ্রলোক ছিটগ্রস্ত নন, বদ্ধ পাগলই। বাইরের দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলুম, কলিং বেলের দিকে ওঠানো হাত সটান নেমে গেল এবং সেই বিদঘুঁটে এ্যাক হেসে আমাকে ঠেলে ঢুকে পড়লেন। আগের মতো হাঁসফাস করে বললেন, “আবার ভুল! আসলে মাথার ঠিক নেই। ওদিকে ট্রেনের সময় হয়ে গেছে…কোথায় যে জিনিসটা হারিয়ে ফেললুম, কে জানে…হাতেই ছিল…”।
“চাকতি?” কর্নেল জিনিসটা দেখালেন।
মুরারিবাবুর মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। “পেয়েছেন? বাঁচলুম তা হলে। যাই, ট্রেন ফেল হবে,– বলে ঘুরে পা বাড়ালেন।
কর্নেল বললেন, “মুরারিবাবু, এটা কোথায় পেয়েছেন?”
মুরারিবাবু না ঘুরে জবাব দিলেন, “নকুলদার হাতের মুঠোয়। পুলিশকে বলিনি। …ট্রেন ফেল হবে।”
তারপর অদৃশ্য হলেন। ফের সিঁড়িতে শব্দ, কুকুরের চাঁচানি। দরজা বন্ধ করে ড্রইংরুমে ফিরে দেখি কর্নেল একটা শিশিতে ছোট্ট বুরুশ চুবিয়ে চাকতিটাতে খুব ঘষাঘষি করছেন। সোফায় বসে ওঁর ক্রিয়াকলাপ লক্ষ করতে থাকলুম। একটু পরে ষষ্ঠী শূন্যোদ্যান থেকে নেমে একগাল হেসে ঘোষণা করল, “না বাবামশাই! মরা ইঁদুর নয়, খামোকা ঝগড়া। আপনাকে বলি না কাকেরা বড্ড ঝগড়াটে।”
বাবামশাই’কান করছেন না দেখে সে আমার উদ্দেশে বলল, “বুঝলেন দাদাবাবু? যার ওপরটা কালো, তার ভেতরটাও কালো। কালো বেড়াল, কালো কুকুর…আপনারা কালো ছাগলের কথা বলছিলেন, কানে আসছিল। বড্ড গণ্ডগুলে স্বভাব, দাদাবাবু। দোতলার মেমসায়েব একটা কালো কুকুর পুষেছেন। খালি চাঁচায়। ওই সিঙ্গিবাবুদের একটা কালো ময়না আছে। আমাকে দেখলেই ইংরিজিতে গাল দেয়…”।
কর্নেল মুখ তুলে তার দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকাতেই ষষ্ঠী কেটে পড়ল।
দেখলুম, খয়াটে চাকতিটা মোটামুটি সাফ হয়েছে। “সোনা না পিতল?” জিজ্ঞেস করলুম।
কর্নেল চাকতিটাতে চোখ রেখে বললেন, “তুমি সাংবাদিক হলে কী করে জানি না। আজকাল খাঁটি সাংবাদিক হতে হলে জ্যাক অব অল ট্রেড’ হওয়া দরকার। কিন্তু হোপলেস জয়ন্ত। সোনা বা পিতল অন্তত চেনা উচিত। এটা ব্রোঞ্জ! হ্যাঁ, পুরোনো সোনা অনেক সময় একটুখানি তামাটে দেখায়। কিন্তু এত বেশি তামাটে নয়।” বলে উঠে গেলেন। বইয়ের ঝাঁক থেকে আবার একটা বিশাল বই নিয়ে এলেন।
গতিক বুঝে বললুম, “চলি। আজ মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স। একটু তৈরি হয়ে যাওয়া দরকার।”
কর্নেল হাসলেন। “মোটা বই দেখে ভয় পাওয়ার কারণ নেই, ডার্লিং! মাথার সাইজ মোটা হলেই যেমন বিদ্যাসাগর হওয়া যায় না, মোটা বই মাত্রই তেমনি বিদ্যার সাগর নয়। মোটা মানুষ হলেই তাকে স্বাস্থ্যবান বলা যাবে? বরং মজার ব্যাপারটা দ্যাখো জয়ন্ত! বোকাদেরই আমরা মাথামোটা বলি। অথচ মোটা যা কিছু, তার প্রতি আমাদের ভয়-ভক্তি প্রচুর…এই বইটার সাইজ মোটা। প্রচুর বাক্য ছাপা আছে। কিন্তু আমার দেখার বিষয় হল এর ফোটোগ্রাফগুলো। এক মিনিট! চাকতিটার সঙ্গে মিলিয়ে নিই।”
বুঝলুম, বইটা প্রাচীন মুদ্রা এবং সিল সম্পর্কে কোনো পণ্ডিতের গবেষণার ফলাফল। ধৈর্য, নিষ্ঠা আর হাতে সময় না থাকলে এমন জিনিস তৈরি করা যায় না। কিন্তু তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, রূপগঞ্জের ব্যাকরণ রহস্য যা ব্যাকরণ রহস্য-কর্নেল যাই বলুন, ভীষণ জট পাকিয়ে গেল যে!
কর্নেল বই বন্ধ করে রেখে চাকতিটাকে আবার আতসকাঁচে পরীক্ষা করতে থাকলেন। তারপর নিভন্ত চুরুটটি জ্বেলে বললেন, “হালদারমশাইয়ের ভাষায় বলতে গেলে প্রচুর রহস্য, প্রচুর।”
