“শিংওয়ালা জন্তুর গুঁতোয় মানুষ মারা পড়ে, শুনেছি।” কর্নেল বললেন। “রূপগঞ্জে নাকি ছাগলের গুঁতোয় একটা মানুষ মারা পড়েছে। শুনে একটু অস্বস্তি হচ্ছে।”
ডঃ সিংহ ভুরু কুঁচকে বললেন, “ছা-ছাগল…কথাটা কে বলল বলুন তো? কাগজে তো অন্য খবর পড়েছি। প্রাচীন শিবমন্দিরের ত্রিশূলে…হ্যাঁ, আসল কথাটা তা হলে খুলেই বলি। ওই শিবমন্দিরটা পাথরের, বুঝলেন? গত মাসে একবার গিয়ে দেখে এসেছি। আমার ধারণা, ওটা অন্তত দেড় থেকে দু’হাজার বছরের পুরনো। শৈব রাজাদের রাজধানী ছিল রূপগঞ্জ। নদীর নামটা সেই স্মৃতি বহন করছে–শৈব্যা! জঙ্গলের ভেতর ঢিবি, পাথরের স্তম্ভ। শৈব্যাও অনেক স্মৃতিচিহ্ন গ্রাস করেছে। রাক্ষুসি নদী মশাই, শৈব্যা!”
“ব্যা-করণ!” কর্নেল কথাটা বলেই চুরুট জ্বালতে ব্যস্ত হলেন।
ডঃ সিংহ বললেন, “কী, কী? ব্যাকরণ…”বলেই আবার একচোট হাসলেন। “আপনার রসবোধ আছে! শৈব্যাতে ব্যা আছে বটে।”
“ছাগলও ব্যা করে।” একরাশ চুরুটের ধোঁয়ায় কর্নেলের মুখ আবছা হয়ে গেল।
ডঃ সিংহের মুখে কেমন যেন সন্দিগ্ধ ভাব, ফের ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনার এই ছাগলের ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, ছাগলের কথা কে বলল আপনাকে, মানে, ছাগলের গুঁতোয় মানুষ মারা পড়ার কথা?”
কর্নেল বললেন, “হাওড়া স্টেশনে একদল লোক বলাবলি করছিল। আচ্ছা, ডঃ সিংহ, ছাগল এবং পাগলে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক আছে কি?”
ডঃ সিংহ হাসতে গিয়ে হাই তুলে বললেন, “আপনার রসবোধ অতুলনীয়। তো যাদ কাইন্ডলি, অনুমতি দেন, আমি এখানেই একটু গড়িয়ে নিই। এখনও দু’ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে। বিচ্ছিরি ঘুম পাচ্ছে।”
বলে অনুমতির তোয়াক্কা না করে সেই কাগজে-জড়ানো বোঁচকাটি খুললেন এবং কর্নেলকে আরও কোণঠাসা করে শতরঞ্জি-চাদর-বালিশ সাজিয়ে চিত হলেন। বেঁটে হওয়ার দরুন শোয়াটি বেশ পুরোপুরি হল। কর্নেলের চোখে আমার চোখ পড়ল। কর্নেল মিটিমিটি হাসছেন। একটু পরে বললেন, “ডঃ সিংহ কি ঘুমিয়ে পড়লেন?”
“উঃ…হা-না…কী?”
“আপনার পুরো নামটি জানতে ইচ্ছে করছে।”
“তি-তিনকড়িচন্দ্র সিংহ।” বলে পণ্ডিতপ্রবর নাক ডাকাতে শুরু করলেন। আমি তো থ। এরকম ঘুম কখনও কাউকে ঘুমোতে দেখিনি, এক কর্নেল বাদে।
“আবার তিন!” কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। “তিন তিরেক্কে নয়। নয়-নয়ে একাশি।”
নাকডাকা বন্ধ হল। চোখও খুলে গেল। শিবনেত্র হয়ে বললেন, “কী, কী?”
“কিছু না। আপনি ঘুমোন।” কর্নেল বললেন। “আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছি।”
আবার নাক ডাকতে থাকল।
কর্নেল বললেন, “বুঝলে জয়ন্ত, অ্যাস্ট্রোলজি বা জ্যোতিষের মতো সংখ্যাতত্ত্ব বলে একটা শাস্ত্র আছে। না, স্ট্যাটিসটিক্স নয়, নিউমারোলজি। অ্যাস্ট্রোলজির আওতায় পড়ে এটা। সংখ্যারও নাকি শুভাশুভ আছে। নাম, জন্মের সন-মাস-তারিখ, এসব থেকে সংখ্যা বের করে ভূত-ভবিষ্যৎ জানা যায় শুনেছি। তো দ্যাখো, ছাগল আর পাগল, শুধু ব্যঞ্জনবর্ণই ধর্তব্য, তিনটি সংখ্যার শব্দ। এও তিন তিরেক্কে নয়। নয়-নয়ে একাশি, সেই ছাগলীয় একাশি। তারপর ইনি বললেন, রূপগঞ্জের নদীটার নাম শৈব্যা, আমি তো শুনেছিলুম ‘শোভানদী’, রূপগঞ্জের পাশে সুন্দর ফিট করে যায়। কিন্তু ইনি পণ্ডিত মানুষ, বিশেষ করে পুরাতাত্ত্বিক। কাজেই নদীটা নিশ্চয় প্রাচীন যুগে ‘শৈব্যা ছিল। শিবসিংহের রাজধানীর পাশে শৈব্যা নদী ফিট করে যায়। যাই হোক, এখানেও একটা ব্যাকরণঘটিত ব্যাপার দেখা যাচ্ছে। ব্যাকরণ রহস্য, ডার্লিং! ছাগলের আদি-অকৃত্রিম ল্যাঙ্গোয়েজ, ব্যা!”
অসহ্য। কাহাতক আর বকবক ভালো লাগে। চোখ বুজেছিলুম। তারপর কখন যেন ঘুমিয়েও পড়েছিলুম। চলমান যানবাহনে মানুষের ঘুম পায় কেন, এ-নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চয় গবেষণা করে থাকবেন।
হঠাৎ কী-সব শব্দ এবং আমার পায়ের ওপরও ভারী কিছু পড়ল। চোখ খুলেই ভীষণ হকচকিয়ে গেলুম। আতঙ্কে মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! মারদাঙ্গার ফিল্মে অবিকল যেমনটি দেখা যায়।
আমার পায়ের ওপর বসে পণ্ডিতপ্রবর কর্নেলের সঙ্গে হাতাহাতি করছেন। হাতাহাতি কী বলছি! পণ্ডিতের হাতে একটা ছোরা, কর্নেল সেই হাতটা নিজের দু’হাতে ধরে মোচড় দিচ্ছেন।
মাত্র এক সেকেন্ডের দৃশ্য। পায়ে বেঁটে গাঁজাগোলা ওজনদার কিছু চাপানো থাকলে ওঠা কঠিন। অগত্যা পা দুটো যথাশক্তি নাড়া দিলুম। একই সঙ্গে ছোরাটাও ঠকাস করে মেঝেয় পড়ে গেল এবং ডঃ তিনকড়িচন্দ্র সিংহ কর্নেলের পেটে ঠিক ছাগলের মতোই ফুঁ মারলেন। কর্নেল তো খেয়ে একটু পিছিয়ে গেছেন, পণ্ডিত হাত বাড়িয়ে নিজের ফোলিও ব্যাগটা নিয়ে খোলা দরজা দিয়ে নীচে ঝাঁপ মারলেন।
ট্রেনের গতি খুব কম। দাঁড়ানোর মুখে বলে মনে হচ্ছিল। পায়ে ব্যথার দরুন উঠতে একটু সময় লাগল। কর্নেল ততক্ষণে ছোরাটা কুড়িয়ে নিয়েছেন এবং দরজায় উঁকি দিচ্ছেন। বাইরে বিদ্যুতের আলো। তা হলে কোনো স্টেশন আসছে। মালগাড়ি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।
আমার মুখে কথা নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। কর্নেল ক্লান্তভাবে একটু হাসলেন, “লোকটা বিছানা ফেলে গেল!” বলে বিছানাটা গুটোতে থাকলেন। “রেডি হও, ডার্লিং! রূপগঞ্জ এসে গেছে।”
ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললুম, “কী সাঙ্ঘাতিক!”
