কর্নেল বললেন, “ত্রিশূলটা, মুরারিবাবু!”
“ও, হা! ত্রিশূলটার কথা বলা হল না। মাথার ঠিক নেই স্যার!”মুরারিবাবু নিজের মাথায় গাঁট্টা মেরে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন। “কালো ছাগলটা পরপর তিনদিন আমাকে বলেছে, একাশি। চারদিনের দিন রাত্তিরে দেখি, সেই দেউড়ির নীচে ঘাসের ওপর নকুলদা মরে পড়ে আছে। পিঠে তিনটে ক্ষত। রক্ত শুকিয়ে গেছে। চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করলুম। তারপর স্যার আশ্চর্য ঘটনা…মন্দিরের ত্রিশূলে রক্ত…কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! পুলিশ এল। কিন্তু কিছুই হল না। …চলি স্যার! ট্রেন ফেল হবে।”
হালদারমশাই সোজা টানটান হয়ে বসে কথা শুনছিলেন। অভ্যাসমতো বলে উঠলেন, “রহস্য! প্রচুর রহস্য!”
কর্নেল বললেন, “মুরারিবাবু! পুলিশকে কালো ছাগলটার কথা বলেছেন কি?”
মুরারিবাবু ততক্ষণে ওয়েটিং-রুমটাতে ঢুকে গেছেন। সেখান থেকেই জবাব দিলেন, “বলেছি। দারোগাবাবু বললেন, মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি হোন।…শুনে বেজায় রাগ হল বলেই আপনার কাছে…নাঃ, ট্রেন ফেল হবে।”
মুরারিবাবু সশব্দে বাইরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। সিঁড়িতে তেমনি জুতোর শব্দ এবং কুকুরের চেঁচানি শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল হাঁকলেন, “ষষ্ঠী, দরজা বন্ধ করে দে।”
হালদারমশাই নড়েচড়ে বসে আবার একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, “তখন শুধু ছাগল ছিল। এবার এল মার্ডার। কাগজে ছাগল-টাগলের কথা লেখেনি। তবে ত্রিশূলে রক্তের দাগ আর ডেডবডির পিঠে তিনটে ক্ষতচিহ্নের কথা লিখেছে। মন্দিরে পুজো বন্ধ ছিল। আবার ঘটা করে ঢাকঢোল পুজোআচ্চা পাঁঠাবলির কথা লিখেছে। রীতিমতো রহস্য।”
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, “ব্যাকরণ কিংবা ব্যাকরণ রহস্য।”
আমি অবাক হয়ে বললুম, বারবার এ-কথাটা বলার কারণ কী?”
“তুমি কি ব্যাকরণ পড়োনি ডালিং?”
“স্কুলে পড়েছি। কিন্তু এখানে ব্যাকরণ আসছে কী সুত্রে?”
“সন্ধি, জয়ন্ত, সন্ধি! এক এবং আশি এই দুটো শব্দ সন্ধি করলে একাশি হয়।”
ষষ্ঠী ট্রে’তে কফি আর স্ন্যাকস্ রেখে গেল। কর্নেল তার উদ্দেশে বললেন, “শিগগির ছাদে যা তো ষষ্ঠী! কাকের ঝগড়া শুনতে পাচ্ছি। ফের কোনো ক্যাকটাসের ভেতর কার ঠোঁট থেকে মরা ইঁদুর পড়ে গেছে হয়তো।”
ষষ্ঠী ছাদের সিঁড়ির দিকে ছুটল। এই ঘরের কোণা থেকে এঁকেবেঁকে সিঁড়িটা ছাদে কর্নেলের শূন্যোদ্যানে উঠে গেছে। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “রূপগঞ্জের ওদিকে এক জাতের অর্কিড দেখেছিলুম। এনে বাঁচাতে পারিনি। রেনবো অর্কিড’ নাম দিয়েছিলুম। রামধনুর মতো সাতরঙা ফুল ফোটে। মোট তিনটে পাপড়ি। মাই গুডনেস!” কর্নেল নড়ে বসলেন। “আবার সেই তিন…তিন তিরিক্তে নয়…নয়-নয়ে একাশি। কালো ছাগলের ব্যাকরণ!”
হেসে ফেললুম, “মুরারিবাবু এ-ঘরে এক খাবলা পাগলামি রেখে গেছেন। আপনার মাথায় সেটা ঢুকে পড়েছে।”
হালদারমশাইকে প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কফির পেয়ালায় পুনঃ পুনঃ ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে দ্রুত গিলে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। বললেন, “ছাগলেরও তিনটে শিং! বোকা বানিয়ে চলে গেল। পাগল না সেয়ানা পাগল। …অরে ফলো করুম। কর্নেল-স্যারের লগে ফাইজলামি?”
কর্নেল বললেন, “তার আগে একটু ব্যাকরণচর্চা করে নিন, হালদারমশাই!”
“ক্যান?” হালদারমশাইয়ের চোখ দুটো গোলাকার দেখাল।
“ছাগল কোন লিঙ্গ জানেন তো?”
আমি ঝটপট বললুম, “স্ত্রীলিঙ্গ। পুংলিঙ্গে পাঁঠা।”
কর্নেল চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোমাদের কাগজের লোকেদের নিয়ে এই এক জ্বালা। সুকুমার রায়ের হাঁসজারু! ব্যাকরণ মানেন না। ছাগল পুংলিঙ্গ এবং তার দাড়িও থাকে।” বলে হালদারমশাইয়ের দিকে ঘুরলেন। এবার মুখে অমায়িক ভাব। “হালদারমশাই, কথাটা মনে রাখবেন। ছাগল পুংলিঙ্গ। কাজেই তার দাড়ি থাকে। রূপগঞ্জে শিবমন্দিরে যে চারঠেঙে জীবগুলো বলি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর দাড়ি আছে, এটা ইমপর্ট্যান্ট।”
“হঃ!” কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার রূপগঞ্জের মুরারিমোহন ধাড়ার দ্বিগুণ জোরে বেরিয়ে গেলেন।
চুপচাপ কফি খাওয়ার পর বললুম, “আপনার কথাটাও সুকুমার রায়ের সেই বদ্যিবুডোর পদ্যটার মতো হল, যে নাকি হাত দিয়ে ভাত মেখে খেত এবং খিদে পেত বলেই খেত। আশ্চর্য! দাড়িওলা ছাগলকেই তো লোকে পাঁঠা বলে এবং শুধু পাঁঠাই বলি হয়।”
“অবশ্যই।” কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন। “ছাগলি বলিদান শাস্ত্রমতে চালু নয়।”
“তা হলে কথাটা ইমপর্ট্যান্ট বলার কারণ কী?”
“একাশির হ্যাপা। সন্ধিবিচ্ছেদ করা কতকটা ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হওয়ার মতো। বলিদান হলেই প্রব্লেম!” কর্নেল ঘনঘন দাড়িতে হাত বুলোতে শুরু করলেন। “হুঁ, ফের সুকুমার রায় এসে যাচ্ছেন। গোঁফচুরি’ পদ্যটা।’গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। এক্ষেত্রে দাড়ি দিয়ে চেনার একটা ব্যাপার আছে। সব দাড়ি একরকম নয়, ডার্লিং! আমার মনে হচ্ছে, ছাগলটার দাড়ি তাকে বাঁচাতে পারত–কিন্তু তার তিনটে শিং নিয়েই সমস্যা।”
কর্নেল হঠাৎ উঠে পায়চারি শুরু করলেন এবং রূপগঞ্জের ওই ছিটগ্রস্ত ভদ্রলোকের মতো এলেবেলে কথাবার্তা বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন। “…বলির জন্তুর কোনো খুঁত থাকা শাস্ত্রসিদ্ধ নয়। কিন্তু তিনটে শিং থাকাটা কি খুঁত? ও-তল্লাটে শাস্ত্রজ্ঞ বামুন আছেন অনেক। শিবমন্দিরের ছড়াছড়ি..ধ্বংসস্তূপ…জঙ্গল…ঢিবি…শৈবযুগে এক রাজাও ছিলেন দেখলুম। শিবসিংহ!”
