বই বন্ধ করে রেখে প্রকৃতিবিদ উঠে দাঁড়ালেন। সাদা দাড়ি থেকে ছাইয়ের টুকরোটি খসে পড়ল। আমাদের কাছে এসে বসলেন। তারপর নিবে-যাওয়া চুরুটটি লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিলেন এবং একরাশ ধোঁয়ার ভেতর ফের বললেন, “ছাগলে কী না খায়, এটা একেবারে বাজে কথা। ছাগলের যা খাদ্য, তাই ছাগল খায়। কিন্তু সেই ছাগল যখন মানুষের ভাষায় আবোল-তাবোল বলে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন…”
কর্নেলের কথার ওপর বললুম, “আপনি ভদ্রলোকের কথা বিশ্বাস করেছেন দেখছি।”
“হুঁউ, করেছি।” হতভম্ব হয়ে বললুম, “কী আশ্চর্য! ছাগল শুধু ব্যা করে শুনেছি।”
“ব্যাকরণ রহস্য ডার্লিং! ব্যাকরণ রহস্যও বলতে পারো।”
“কী বলছেন! ওঁর হাবভাব কথাবার্তা শুনেও ওঁকে বদ্ধ পাগল মনে হল না আপনার?”
কর্নেল হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে চোখ বুজলেন। আপনমনে বলতে থাকলেন, “ছাগলটা কালো। কালো যা কিছু, মানুষের কাছে তাই অশুভ। কারণ কালো রং অন্ধকারের প্রতীক। অন্ধকারে মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে। তা ছাড়া কালোর সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক আছে ধরে নিয়েই যেন কালো শোকবস্ত্র পরার প্রথা..হঁ, বিজ্ঞানীরাও এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত নন। ব্ল্যাক হোল’ কথাটিতে সেটা স্পষ্ট। নক্ষত্রের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত এই টার্ম। …যাই হোক, কালো ছাগলটা আবার কিনা একটা পোডড়াবাড়ির ভাঙা দেউড়ির মাথায় চড়ে ঘাস-পাতা খায় এবং অদ্ভুত একটা কথা বলে নিপাত্তা হয়ে যায়!”
হালদারমশাই কান দুটো খাড়া করে ওঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। তাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বললুম, “আপনি ওই ভদ্রলোকের চেয়ে আরও পাগল!”
“উঁহু, পাগল নয় ডার্লিং, ছাগল,– কর্নেল চোখ খুলে বললেন। এবার মুখটা গম্ভীর। “মুরারিবাবু, মুরারিমোহন ধাড়া স্পষ্ট শুনেছেন ছাগলটা তাকে কিছু বলছে। একদিন নয়, তিন দিন,– বলে কর্নেল তিনটে আঙুল দেখালেন।
অমনি হালদারমশাই সশব্দে শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, “মনে পড়েছে! মনে পড়েছে!” জিজ্ঞেস করলুম, “কী হালদারমশাই?” হালদারমশাই ছটফটিয়ে বললেন, “ওই যে কর্নেল-স্যার তিনখান ফিঙার দ্যাখাইলেন, লগে-লগে কথাখান আইয়া পড়ল।”
কর্নেল বললেন, “ত্রিশূল?”
প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভীষণ হকচকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমিও একটু অবাক। বললুম, “থট-রিডিং, নাকি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছেন?”
ধুরন্ধর প্রকৃতিবিদ বললেন, “তোমার এই একটা অদ্ভুত স্বভাব জয়ন্ত! তুমি কাগজের খবর লেখো, কিন্তু খবর পড়ো না। ময়রা নাকি সন্দেশ খায় না। যাই হোক, হালদারমশাই, জয়ন্তদের ‘দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকায় আজ যে ভয়ঙ্কর ত্রিশূলের খবর বেরিয়েছে, তার সঙ্গে একটু আগে মুরারিবাবুর আবির্ভাবের সম্পর্ক আছে। না, থট-রিডিং নয়, নিছক অঙ্ক। খবরটার ডেটলাইন হল রূপগঞ্জ। আর মুরারিবাবুর বাড়িও রূপগঞ্জে।”
হালদারমশাই বললেন, “কিন্তু ভদ্রলোক তো ত্রিশূলের ব্যাপারটা বললেন না?”
আমিও বললুম, “শুধু ছাগল-টাগল নিয়েই বকবক করে গেলেন।” কর্নেল একটু হেসে বললেন, “বেশি উত্তেজনা অনেক প্রাসঙ্গিক কথা ভুলিয়ে দেয়। তা ছাড়া ভদ্রলোক পাগল না হলেও একটু ছিটগ্রস্ত, তাতে সন্দেহ নেই। তবে..হ্যাঁ, উনি ফিরে আসছেন। সিঁড়িতে ভীষণ পায়ের শব্দ আর লিন্ডাদের কুকুরটা আবার চেঁচাচ্ছে! যে কারণেই হোক, কুকুরটা ওঁকে পছন্দ করছে না।” বলে হাঁক ছাড়লেন, “ষষ্ঠী, দরজা খুলে দে।”
কলিং বেল বাজল। বাজল বলা ঠিক হচ্ছে না, বাজতে লাগল। বিরক্তিকর! গ্রামগঞ্জের মানুষ বলে নয়, ছিটগ্রস্ততাও বিশ্বাস করি না, বদ্ধ পাগল! কলিং বেল একবার বাজানোই তো যথেষ্ট। যেন কারা তাড়া করেছে কাউকে এবং সে মরিয়া হয়ে কলিং বেলের বোম টিপে চলেছে। ষষ্ঠীচরণ ছোট্ট ওয়েটিং-রুমের ভেতর বাঁকা মুখে বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে দেখতে পেলুম। বাইরের লোক এলে ওখানেই বসিয়ে রেখে সে কর্নেল-বাবামশাই’কে খবর দেয়। আমরা যে বিশাল ঘরটাতে বসে আছি, এটা ড্রইংরুম, তবে জাদুঘর বা প্রশালা-পাঠাগার-গবেষণাগার এসবের একটা বিচিত্র জগাখিচুড়ি।
হ্যাঁ, তিনিই বটে। হুড়মুড় করে পরদা ফুঁড়ে ঢুকেই হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন, “আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি।”
কর্নেল বললেন, “ত্রিশূল?”
ভদ্রলোক বললেন, “ত্রিশূল।” তারপর অদ্ভুত খাক শব্দে কষ্টকর হাসি হাসলেন। এমন বিদঘুঁটে হাসি মানুষের মুখে কখনও শুনিনি।
হালদারমশাইয়ের ফ্যাচটা হাসিই বটে। এই ‘খ্যাঁক’-টা দাঁত খিঁচুনি।
কর্নেল বললেন, “আপনি বসুন মুরারিবাবু।”
“বসব না। ট্রেন ফেল হয়ে যাবে। তবে আপনি স্যার, সত্যিই অন্তর্যামী! নকুলদার কথা বর্ণে-বর্ণে মিলে গেল এতক্ষণে। নকুলদার চেনাজানা ছিলেন বঙ্কুবাবু…বন্ধুবিহারী ধাড়া স্যার…সম্পর্কে আমার জ্যাঠাকমশাই হন। ব্রিটিশ আমলে অমন ডাকসাইটে দারোগা আর দুটি ছিল না। তার কাছে নকুলদা আপনার সাঙ্ঘাতিক-সাঙ্ঘাতিক গল্প শুনেছিল। …তবে স্যার, কালো ছাগলটারও একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল। ছাগলটার তিনটে শিং। তার, তিরিশ ফুট উঁচু দেউড়ির মাথায় ওঠে কী করে? …আর স্যার…হা, মনে পড়েছে! কাছেই শিবমন্দিরটা। তার মাথায় ত্রিশূল। …সেও তিন, এও তিন…তিন তিরিক্তে নয়…নয়নয়ে একাশি…।…কালো ছাগলটা স্পষ্ট বলেছে ‘একাশি, বুঝুন স্যার! এক গ্লাস আশি, একাশি। এক বাদ দিলে রইল আশি। আশির শূন্য বাদ দিন। রইল আট। এবার ওই বাদ দেওয়া এক-কে আটের সঙ্গে যোগ করুন, আবার নয় পাচ্ছেন। তিন তিরিক্কে নয়। ছাগলের তিনটে শিং আর মন্দিরের মাথায় তিনটে শিং। গুণ করলে নয় পাচ্ছেন না কি?…আমি আসি স্যার! ট্রেন ফেল হবে,– বলে মুরারিবাবু ঘুরেই পা বাড়ালেন।
