বলে তিনি কিটব্যাগ থেকে প্যাকেটে ভরা একটা জিনিস বের করলেন। দেখামাত্র চিনতে পারলুম, এটা হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে উপেন দত্তের মৃতদেহের কাছে নগ্ন মাটি খুঁড়ে সুরেন বের করেছিল। কর্নেল মেটাল ডিটেক্টরে এটারই খোঁজ পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাকে খুলে বলেননি। আমার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে থেকেছেন।
প্যাকেটের ভিতর থেকে ছোট্ট চৌকোগড়নের কালো জিনিসটা কর্নেল বের করে বললেন, –এটা একটা রত্নকোষ। এটার কথাই সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিতে আছে। এবার দেখুন, আমি বত্রিশের ধাঁধার সূত্র অনুসারে এটা খুলছি। তবে ধাঁধার জট ছাড়ানোর কৃতিত্ব আমার নয়, কুমুদবন্ধু ভট্টাচার্যের ছেলে দীপুর। এই ছকের উল্লেখ সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিতে আভাসে ছিল। এই দেখুন!
কর্নেল পকেট থেকে দীপুর বইয়ের ভিতরে পাওয়া কাগজটা টেবিলে মেলে ধরলেন। বললেন,–এক থেকে পনেরো পর্যন্ত সংখ্যা চতুষ্ক’ পদ্ধতিতে এমন সাজাতে হবে, যে-কোনও দিকের যোগফল বত্রিশ হয়। দীপু সেই বত্রিশের ধাঁধার জট কীভাবে খুলেছে লক্ষ করুন।

অজয়েন্দুবাবু রত্নকোষটি দেখে বললেন, প্রায় তিনশো-চারশো বছরের এই জিনিসটা এখনও পরিষ্কার আছে দেখছি!
কর্নেল বললেন,–পরিষ্কার ছিল না। আমি ব্রাশের সাহায্যে লোশন দিয়ে এটাকে পরিষ্কার করেছি। এবার এই আতশ কাঁচের সাহায্যে নাগরি অক্ষরে লেখা সংখ্যাগুলো দীপুর ছক অনুসারে টিপে যাচ্ছি। চারদিক থেকে সংখ্যাগুলো চারবার টিপলে রত্নকোষটা খুলে যাবে।
কর্নেল সাবধানে তর্জনীর চাপে রত্নকোষের পর পর লেখা ১ থেকে ১৫টি সংখ্যা একে একে ছক অনুসারে চারদিকে থেকে চারবার পর-পর টিপলেন। অমনই রত্নকোষটা খুলে দুভাগ হয়ে গেল। আমরা দেখলুম, ভিতরে রংবেরঙের একটি রত্নমালা ঝলমল করে উঠল। কর্নেল মালাটি তুলে বললেন,–হীরা-চুনি পান্না মুক্তা সাজানো ঐতিহাসিক মালা। এখন এর দাম হয়তো বহু লক্ষ টাকা। এই মালা মোগল সোনাপতি রাজা মানসিংহ আপনার পূর্বপুরুষকে উপহার দিয়েছিলেন। অতএব আইনত এটা আপনারই প্রাপ্য।
বলে তিনি রত্নমালাটি কুমারবাহাদুর অজয়েন্দু রায়ের গলায় পরিয়ে দিলেন। হালদারমশাই সহাস্যে বলে উঠলেন,–কী কাণ্ড! এমন একখানা হিস্টোরিক্যাল জুয়েলের জন্য যুদ্ধ বাধবে না ক্যান?
অজয়েন্দুবাবু রত্নমালা গলা থেকে খুলে কর্নেলকে দিয়ে বললেন,–আবার আগের মতো রত্নকোষে এটা ভরে দিন। আমি আয়রনচেস্টে লুকিয়ে রাখব। তারপর আপনাকে ডেকে আবার এটা বের করে বিক্রি করব। সেই টাকায় একটা অনাথ আশ্রম খুলব।
কর্নেল মালাটা আগের মতো রত্নকোষে সাজিয়ে দুটো ঢাকনা টিপে ধরলেন। রত্নকোষ আবার বন্ধ হয়ে গেল। কর্নেল টানাটানি করে দেখে বললেন,–আবার বত্রিশের ধাঁধার জট না ছাড়াতে পারলে এটা খুলবে না। কাজেই দীপুর এই কাগজটা রেখে দিন। আর-একটা কথা, কুমুদবাবু গরিব মানুষ। দীপুর পড়াশুনার জন্য–
তার কথার ওপর অজয়েন্দুবাবু বলে উঠলেন,–দীপুর উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব আমার। কুমুদকে আজই লিখে পাঠাচ্ছি। এবার এটা আমি আয়রনচেস্টে রেখে আসি। তারপর কফি খেতে-খেতে আপনার কাছে সব কথা শুনব।
উনি দরজা খুলে বেরিয়ে গেলে হালদারমশাই বললেন,–কথাটা বলি নাই। এবার বলি। কেষ্টবাবুর পিঠে চাপছিলাম। তখনই ট্যার পাইছিলাম, অর পিঠে একখানা আব আছে। কুঁজও কইতে পারেন। কুঁজে হেভি প্রেসার দিছিলাম। কর্নেল কথাটা শুনে অট্টহাসি হেসে উঠলেন।
৪.১ ব্যাকরণ রহস্য
“ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়!” বাঁকা মুখে কথাটি বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে, কে, হালদার, আমাদের প্রিয় হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিলেন।
হাসি চেপে বললুম, “একটু ভুল হল হালদারমশাই!”
গোয়েন্দা-ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে চার্জ করলেন, “কী ভুল? যতসব পাগল-ছাগলের কারবার!”
“সে-বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি একমত।”
“তা হলে?”
“কথাটা উলটে গেছে। ওটা হবে, পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়।”
গোয়েন্দামশাই এবার তাঁর অনবদ্য ফ্যা’ শব্দটি বের করলেন। অর্থাৎ হাসলেন। “তাই বটে। তবে আমার রাগ হচ্ছিল, বুঝলেন? ভদ্রলোকের মাথার গণ্ডগোল আছে। খামোকা কর্নেল-স্যারের মূল্যবান সময়ের অপচয় করে তো গেলেনই, উপরন্তু আমারও ক্ষতি করলেন।” বলে নিজের কাঁচা-পাকা চুল খামচে ধরলেন। মুখে আঁকুপাঁকু ভাব।
আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার প্রকাণ্ড একটা বইয়ের পাতা খুলে মনোযোগী ছাত্রের মতো কী সব নোট করছিলেন। দাঁতে কামড়ে-ধরা চুরুট। সেটি নিবে গেছে বলেই আমার ধারণা। তবে ওঁর সাদা সান্তাক্লজ সদৃশ দাড়িতে একটু ছাই আটকে আছে এবং সকালের রোদ্দুরের ছটায় চওড়া টাক ঝকমক করছে। মুখ না তুলেই বললেন, “হালদারমশাই যা বলতে এসেছিলেন, আশা করি সেটা ভুলে গেছেন।”
বিমর্ষ মুখে হালদারমশাই শুধু বললেন, “হঃ।”
“মাথার ভেতর পাগল আর ছাগল যুদ্ধ করছে,– বলে কর্নেল এবার মুখ তুলে মিটিমিটি হাসলেন। “তবে জয়ন্ত যা বলল, ঠিক নয়। হালদারমশাই ঠিকই বলেছেন, ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়।”
অবাক হয়ে বললুম, “কী বলছেন! কথাটা একটা বাংলা প্রবচন। তাকে উলটে দিচ্ছেন আপনি?”
কর্নেল আমাকে পাত্তা না দিয়ে বললেন, “আসলে হালদারমশাইয়ের বলতে আসা কথাটা এক্ষেত্রে পাগলেই খেয়ে ফেলেছে।”