হঠাৎ অন্য একটা ঘটনা ঘটে গেল। হালদারমশাই কখন এগিয়ে গেছেন গুঁড়ি মেরে, তা লক্ষ করিনি। তিনি আচম্বিতে ঝাঁপ দিলেন কেষ্ট অধিকারীর ওপরে। কেষ্টবাবু তৎক্ষণাৎ ধরাশায়ী হল। এদিকে কর্নেল ও তপেশবাবুও কেষ্টবাবুর দুই সঙ্গীর পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাদের কালাশনিকভ রাইফেল দুটো দুজন পুলিশ অফিসার দ্রুত এসে জুতোর নিচে চেপে ধরলেন। দুজনে ধরাশায়ী হল। এবং কেষ্টবাবুর মতোই তাদের পিঠেও সশস্ত্র এবং ওজনদার দুজন মানুষ কর্নেল এবং ও.সি. তপেশ সান্যাল। কেষ্টবাবুর রিভলভার ছিটকে পড়েছিল। হালদারমশাই তার রিভলভারটা দেখিয়ে দীপুর উদ্দেশ্যে বললেন,–এই পোলাটা কী করে! খাড়াইয়া আছ ক্যান? কেষ্টবাবুর ফায়ার আর্মস কুড়াইয়া লও!
দীপু তবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সুরেন লাফিয়ে এসে কেষ্টবাবুর রিভলভারটা কুড়িয়ে নিল। তারপর ফিক করে হেসে দীপুকে বলল,–হা রে! তুই তো গিয়েছিলি হাফপ্যান্ট স্পোর্টিং গেঞ্জি পরে। ফিরলি সোয়েটার আর ফুলপ্যান্ট পরে। কে কিনে দিল?
দীপু এবার আড়ষ্টভাবে হেসে বলল,–চট্টরাজসায়েব!
ততক্ষণে ধরাশায়ী কেষ্ট অধিকারী এবং তার দুই সঙ্গীকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করিয়েছে। তপেশবাবু বললেন,–মিত্রবাবু! সাবধানে আসামীদের নিয়ে যান। আমি গড়ের জঙ্গল থেকে পুলিশফোর্সকে কলব্যাক করি। আমি নিচে গিয়ে ভ্যানে ফিরব। কর্নেলসায়েব
কর্নেল দ্রুত বললেন, আমি কফি খেতে বাংলোয় ফিরব। দীপুকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। সুরেন, ওর বাবাকে তুমি গিয়ে খবর দাও। চলো দীপু!
তপেশবাবু একটু হেসে বললেন,–আপনি এবং দীপু, দুজনকেই আমাদের দরকার হবে।
–জানি। আজ রাতেই আমাদের সবাইকে আপনি কেষ্ট অধিকারী অ্যান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য পেয়ে যাবেন। অবসরপ্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ডঃ দেবব্রত চট্টরাজকে বরং রাজসাক্ষী করার ব্যবস্থা আমি কলকাতায় ফিরেই করব। চলি!
বাংলোয় ফেরার পর চৌকিদার নাখুলাল দীপুকে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,–দীপুবাবু! এতদিন তুমি কোথায় ছিলে? কর্নেল বললেন, সুরেন দীপুর বাবাকে খবর দিতে গেছে। নাখুলাল! শিগগির কফি চাই! আর আমাদের হালদারমশাইয়ের জন্য এক বালতি গরম জলও চাই। উনি গেরুয়া ধুলো মেখে খাঁটি সায়েব হয়ে গেছেন।
হালদারমশাই বললেন,–খুব ধস্তাধস্তি বাধছিল। এরা চারজন। আমি একা।
কিছুক্ষণ পরে কফি খেতে-খেতে কর্নেল বললেন, তুমি কফি খাচ্ছ না কেন দীপু? কফি খেলে নার্ভ চাঙ্গা হবে। কফি খাও। আজ খেয়েছ?
দীপু বলল,–দুপুরে সুড়ঙ্গের মধ্যে খাবার এনেছিলেন কেষ্টবাবু। আমার খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হয়নি। শুধু উপেনদা আমাকে বস্তির একটা ঘরে গোবিন্দের কাছে আটকে রেখেছিল। সে আমাকে ড্যাগার দেখিয়ে হুমকি দিত। বাইরে থেকে তালা এঁটে রাখত।
–তুমি সেখান থেকে পালিয়েছিলে কী করে?
–এক রাত্রে গোবিন্দ মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় সেই ঘরে শুতে ঢুকেছিল। ভেতর থেকেও রোজ রাত্রে তালা এঁটে দিত। সে রাত্রে সে তালা আঁটতে ভুলে গিয়েছিল। খুব নেশা হয়েছিল তার। সেই সুযোগে আমি পালিয়ে গিয়েছিলুম। ডঃ চট্টরাজের নেমকার্ডের ঠিকানা আমার মুখস্থ ছিল। খুঁজে-খুঁজে তাঁর বাড়ি গেলুম। তাকে বত্রিশের ধাঁধার অঙ্কটা দিলুম। কিন্তু উনি আমাকে বাইরে যেতে নিষেধ করতেন। বলতেন, উপেন দত্তের লোকেরা তোমাকে খুঁজছে। পরে বুঝেছিলুম, উনিও আমাকে আটকে রেখেছেন।
–হুঁ। বাকিটা আমার জানা। তোমার বত্রিশের ধাঁধার অঙ্কটা তোমার একটা বইয়ের ভিতরে পেয়ে গেছি। এই দ্যাখো!
কর্নেল কিটব্যাগ থেকে একটা ভাজকরা পুরনো কাগজ দেখালেন। দীপু বলল,–কিন্তু রত্নকোষ তো পাওয়া যায়নি।
কর্নেল বললেন,–রত্নকোষের কথা থাক। চুপচাপ কফি খাও। তোমার বাবা এলে একসঙ্গে আমরা থানায় যাব। তারপর আজ রাত একটার ট্রেনে কলকাতা ফিরব। তোমার আর কোনও বিপদ হবে না।
একটু পরে কুমুদবাবু এলেন সুরেনের সঙ্গে। তিনি দীপুকে বুকে চেপে ধরে কেঁদে উঠলেন।
*
পুলিশের গাড়ি কর্নেল, হালদারমশাই এবং আমাকে সেই রাত্রে রায়গড় স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল। কলকাতায় ফেরার পর সেইদিন বিকেলে কর্নেল আমাকে এবং হালদারমশাইকে হাজরা রোডে কুমারবাহাদুর অজয়েন্দু রায়ের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
অজয়েন্দুবাবু কর্নেলকে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন,–বলুন কর্নেলসায়েব! আপনার অভিযান সফল হয়েছে তো?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–অভিযান সফল! কিন্তু একটা কথা। আপনি কি জানতেন কৃষ্ণকান্ত অধিকারী নানা অঞ্চলে জঙ্গিদের কাছে চোরা বিদেশি অস্ত্র পাচারের কারবার করত?
অজয়েন্দুবাবু আঁতকে উঠে বললেন,–কী সর্বনেশে কথা! ঘুণাক্ষরে টের পাইনি তো!
–যাই হোক, কেষ্টবাবু সদলবলে ধরা পড়েছে। আপনাকে পরে বিস্তারিত বলব। আপাতত একটা গোপন কাজকর্ম করতে চাই। আপনি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিন। বাইরে যেন কেউ না থঅকে।
কুমারবাহাদুর বেরিয়ে গিয়ে সেইমতো ব্যবস্থা করে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করলেন। তাকে চঞ্চল দেখাচ্ছিল। তিনি চাপাস্বরে বললেন,–সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিটা উদ্ধার করতে পেরেছেন কি?
কর্নেল তার কিটব্যাগ থেকে প্রথমে খবরের কাগজের প্যাকেটে ভরা সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিটা তাকে দিলেন। তারপর বললেন,–এবার আপনাকে যে জিনিসটা দেব, সেটা দেখলে আপনি চিনতে পারবেন না। কিন্তু আপনার পূর্বপুরুষ সেই জিনিসটা মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহের কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন।
