কিন্তু এতবড় একটা ঘটনা এখনও গোপন রাখা হয়েছে জাতীয় স্বার্থে। তাই শেষ পর্যন্ত নিরাশ হলুম। কর্নেল বললেন—দু একটা দিন ধৈর্য ধরো, জয়ন্ত। এমন সাংঘাতিক খবর চেপে রাখা যাবে না, সেটা সরকার ভালই জানে। যথাসময়ে সাংবাদিকদের দিল্লিতে ডেকে কর্তৃপক্ষ ঘটনাটা জানাবে। তখন তোমাদের সত্যসেবক পত্রিকাও তা বিশদ ছাপতে পারবে। তবে কথা দিচ্ছি, ঠিক তার আগের দিন তুমি স্কুপ নিউজ হিসেবে বিশ্বস্তসূত্রে একটুখানি যাতে ছেপে দিতে পার, তার ব্যবস্থা করব। সংক্ষিপ্তভাবে কিন্তু! নইলে আমি ঝামেলায় পড়ব।
খুশি হয়ে বললুম-তাতেই চলবে। কিন্তু তার সঙ্গে ছবিটা ছাপলে ক্ষতি কী?
কর্নেল হেসে বললুম—তাহলে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর ডঃ গড়গড়ি বিপদে পড়বেন।
ডঃ গড়গড়ি জোরে মাথা নেড়ে বললেন—না জয়ন্তবাবু, ছবিটবি আমি ছাপতে দিতে পারব না।
ছবিটা দেখে শিউরে উঠতে হয়। ক্লোজ শটে তোলা ফোটো। ডঃ গুটেনবার্গ প্রাণের ভোয়াক্কা
করে কী দুঃসাহসে যে জন্তুটার মুখখামুখি দাঁড়িয়ে ক্যামেরার শাটার টিপে পালিয়ে গিয়েছিলেন, শুনে রক্ত হিম হয়ে যায়।
ডঃ গড়গড়ি আগাগোড়া খুলে কিছু বললেন না। কর্নেলও যেন ওঁর মুখ চেয়ে বেশি কিছু জানালেন না। তখন ভাবলুম, ডঃ গড়গড়ি চলে গেলে কর্নেলের কাছে আদ্যোপান্ত জেনে নেব।
কিছুক্ষণ একথা-ওকথার পর ডঃ গড়গড়ি চলে গেলেন। তখন কর্নেলকে বাগে পেয়ে বললুম-হাই ওল্ডম্যান! ডঃ গড়গড়ি আপনার দ্বারস্থ হলেন কেন খুলে বলুন তো?
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার রিং পাকিয়ে রইলেন সেদিকে। এক মিনিট পরে টাকে হাত বুলোলেন। তার এক মিনিট পরে সাদা দাড়ি খামচে ধরলেন। তারপর একটু হেসে আমার চোখে চোখ রেখে বললেন—টোরা আইল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছে আছে, জয়ন্ত?
চমকে উঠলুম।–ওরে বাবা! নৃসিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাবেন ভাবছেন নাকি?
—ক্ষতি কী?
–কর্নেল, ভুলে যাবেন না, আপনি পঁয়ষট্টি বছরের বুড়ো মানুষ। আর দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু ছিলেন রীতিমতো পালোয়ান। নৃসিংহের পাল্লায় পড়ে তার প্রাণটি বেঘোরে গিয়েছিল।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন—তবে সে-নৃসিংহ ছিল সত্যযুগে স্বয়ং ভগবানের অবতার। আর এ নৃসিংহ কলিযুগের নিছক প্রাণী বলেই অনুমান করছি। নইলে জনপ্রাণীহীন টোরাদ্বীপে তার আবির্ভাবের অর্থ কী? কাদের উদ্ধারে সেখানে ভগবান অবতীর্ণ হবে বলো?
-সত্যি কি টোরাদ্বীপে যাবেন ভাবছেন?
—যাব। ডঃ গড়গড়ি সেইজন্যেই এসেছিলেন। তবে এবার উনি যাবেন গোপনে, বেসরকারি ভাবে। আমার সাহায্য চান।
-কেন?
—ওঁর মনে একটা ধাঁধা ঢুকছে।
–খুলে বলুন।
—টোরাদ্বীপ আসলে একটা তিনকোনা পাহাড়। সমুদ্র থেকে ঠেলে উঠেছে টুপির মতো। চারধার অবশ্যি ততকিছু খাড়া নয়, অনেকটা গড়ানে বা ঢালু। জায়গায়-জায়গায় সমতল চত্বরও আছে। আগাগোড়া জঙ্গলে-ঢাকা। পাথর তো আছেই। খাড়ি বলতে মাত্র শতিনেক ফুট উঁচু এবং শখানেক ফুট চওড়া একটা অংশ। সেখানটা দেয়ালের মতো সোজা উঠেছে সমুদ্র থেকে। প্রচণ্ড বেগে জল আছড়ে পড়ে আর দেয়ালের মাথা অবধি ছিটকে ছড়িয়ে যায়। কানে তালা ধরে যায় তার শব্দে। তো ডঃ গড়গড়ির ধারণা ওইখানে কোথাও বিদঘুটে সিংহ-মানুষটা থাকে এবং কিছু পাহারা দেয়।
—পাহারা দেয়? কী পাহারা দেয়? গুপ্তধন বুঝি?
—কে জানে! তবে ডঃ গড়গড়ির মাথায় আরও একটা আজব ধারণা ঢুকেছে যে নৃসিংহটা হয়তো একালেরই বিজ্ঞানীর তৈরি একটা রোববা অর্থাৎ নিছক যন্ত্রমানুষ।
কর্নেলের পাশে সোফার ওপর খামে ছবিটা রয়েছে। হাত বাড়িয়ে সেটা নিলুম। খুলে ছবিটা দেখতে দেখতে বললুম—অসম্ভব! লোমওয়ালা একটা মানুষের মাথা সিংহের মতো। একরাশ কেশর আছে। বড় বড় হিংসুটে দাঁত বের করে আছে। এ কখনও যন্ত্র হতে পারে না।
কর্নেল আনমনে বললেন—ঠিক বলেছ। আতস কাচ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি। যন্ত্র বলে মনে হয় না।
আমরা কথা বলতে বলতে ফোন বাজল। কর্নেল ফোন ধরে কার সঙ্গে চাপা গলায় কিছুক্ষণ কথা বললেন। তারপর ফোন নামিয়ে রেখে গম্ভীর মুখে টাকে মৃদু মৃদু টোকা দিতে লাগলেন। দেখলে মনে হবে, ওস্তাদ তবলচী তবলায় হাতুড়ির ঘা মেরে সুর লাগাচ্ছেন। অবশ্য ব্যাপারটা কতকটা সেরকমই। কর্নেল বলেন, ডার্লিং! মাঝে মাঝে মাথার ঘিলু নানারকম চিন্তার চাঁটি খেয়ে বেসুরো হয়ে যায়। তখন ঠিক সুরে বাঁধতে হলে এই কাজটি জরুরি।
মগজের সুর বেঁধে কর্নেল হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে বললেন, জয়ন্ত। এইমাত্র এক ভদ্রলোক ফোনে বললেন, তাঁর বাড়িতে সম্প্রতি এক বিদঘুটে ব্যাপার ঘটেছে, তিনি আমার সাহায্য চান।
বললুম—তা কে না চায়? আপনি প্রখ্যাত বুড়ো ঘুঘু। সেখানে বিদঘুটে কিছু ঘটে, সেখানেই আপনার ডাক পড়ে। এতে এমন গোমড়া মুখে ঘিলু নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কী আছে?
কর্নেল একটু হাসলেন।—আছে মনে হচ্ছে। কারণ মাস তিনেক আগে ভদ্রলোকের ঠাকুরঘর থেকে পুরনো আমলের একটি দশাবতার মূর্তি চুরি গিয়েছিল। কষ্টিপাথরের একটা চওড়া ফলকের ওপড়া খোদাই করা দশটি মুর্তি। অদ্ভুত ব্যাপার, গতকাল ফলকটা উনি বাগানের মধ্যে কুড়িয়ে পেয়েছেন। কিন্তু ফলকের একটা মূর্তি খুবলে নিয়েছে চোর। বাকি নটা মূর্তি যেমন ছিল, তেমনি আছে। কোন মূর্তিটা নিয়েছে জানো? নৃসিংহের।
—অ্যাঁ! আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম।
কর্নেল দাড়ি চুলকে বললেন—টোরাদ্বীপের ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনার যোগাযোগ আছে কি না বলা কঠিন। নিছক আকস্মিক যোগাযোগও হতে পারে। অর্থাৎ কাকতালীয় যোগ।
