কর্নেল বললেন,–তপেশবাবু! ওই জন্তুটাই এগুলো পাহারা দেয় বলে আমার ধারণা। জন্তুটা সম্পর্কে এলাকায় গুজব রটে গেছে। তাছাড়া লোকেরা ধরেই নিয়েছে, দীপু জন্তুটার পেটে গেছে। তারপর উপেন দত্তও তার আক্রমণে মারা পড়েছে। তাই স্মাগলারচক্র বলুন কিংবা কেষ্ট
অধিকারীর দল বলুন, ওরা নিশ্চিত যে কারও সাহস হবে না এই গোপন সুড়ঙ্গে ঢোকে!
সুড়ঙ্গের ভিতরে চাপাস্বরে এইসব কথাবার্তাও ভূতুড়ে প্রতিধ্বনি তুলছিল। হঠাৎ সুরেন বলল, –সার! আমি আর এই কনস্টেবলদাদা দুজনে মিলে সুড়ঙ্গের মুখের কাছে বরং ওত পেতে বসে থাকব। কেউ এলেই তার ঠ্যাঙে দায়ের কোপ মারব।
এমন সাংঘাতিক একটা অবস্থায় কর্নেল হেসে ফেললেন, তুমি বুদ্ধিমান সুরেন! সুড়ঙ্গের মুখে ওত পেতে থাকলে একজন লোক একসোজন শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে। তপেশবাবু! আপনি কনস্টেবল নরসিংহকে পুলিশ অফিসার হিসাবে নির্দেশ দিন, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সে প্রথমে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে আততায়ীদের তাড়িয়ে দিতে বা পায়ে গুলি করতে পারবে।
তপেশবাবুর নির্দেশ পেয়ে নরসিংহ এবং সুরেন এগিয়ে গেল। যে সিঁড়ি দিয়ে নেমেছি, সেই সিঁড়িতে টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে ওরা অদৃশ্য হল। কর্নেল বললেন,–চলুন। এবার আমরা এগিয়ে যাই।
কর্নেল সামনে, তার বাঁদিকে তপেশবাবু এবং ডানদিকে পিছনে আমি। তিনজনের হাতেই গুলিভরা রিভলভার। কর্নেল স্পটলাইটের আলোে মধ্যে মধ্যে জ্বেলে পথ দেখে নিচ্ছিলেন। পায়ের তলায় পাথরের ইট, দুধারে দেওয়ালেও পাথরের ইট এবং মাথার ছাদে চওড়া মসৃণ বড়-বড় কালো পাথরের স্ল্যাব।
জীবনে বহুবার কর্নেলের সঙ্গী হয়ে কত সাংঘাতিক অভিযানে গেছি। কিন্তু এই অভিযান একেবারে অন্যরকম। কোন যুগে রায়গড়ের কোন রাজা শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত ও পরাজিত হলে যাতে নিরাপদে একটা নিবিড় অরণ্যপথে (সে যুগে জঙ্গলটা নিশ্চয় আরও দুর্গম আর বিস্তীর্ণ ছিল) সপরিবারে পালিয়ে প্রাণে বাঁচতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে দুর্গ থেকে একটা নদীর তলা দিয়ে এই গোপন সুড়ঙ্গপথ তৈরি করেছিলেন। আর এতকাল পরে আমরা সেই পথে একটা মূর্তিমান বিভীষিকার মুখোমুখি হতে চলেছি। এই সব কথা ভেবেই যুগপৎ বিস্ময় আর আতঙ্কে আমি উদ্বেলিত হচ্ছিলুম।
চলেছি তো চলেছি। মাঝে-মাঝে কর্নেলের হাতে স্পটলাইটের ঝলকানি, তারপর নিবিড়কালো অন্ধকার। ঘড়ি দেখার কথা মনে ছিল না। তাছাড়া প্রতি মুহূর্তে হিংস্র জন্তুটার আবির্ভাব ঘটাতে পারে। কারণ ক্রমশ তার মরিয়া হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। সুড়ঙ্গের অন্যমুখে সশস্ত্র পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। তা টের পেয়ে সে আরও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।
কর্নেল বলেছেন, জন্তুটা আগ্নেয়াস্ত্র দেখলে ভয় পায়। কেন তার এমন ধারণা হল, বুঝতে পারছিলুম না। কিছুক্ষণ পরে স্পটলাইটের আলো ফেলে কর্নেল বললেন, আমরা এখন নদীটার তলা দিয়ে যাচ্ছি। ওই দেখুন তপেশবাবু! ছাদ থেকে ফোঁটা-ফোঁটা জল পড়ছে।
তপেশবাবু ছাদ লক্ষ করে বললেন,–ধসে পড়বে না তো?
–ধসে পড়ার কারণ নেই। সেকালের স্থপতি আর কারিগররা কত দক্ষ ছিলেন, বিশ্বের সর্বত্র তার প্রমাণ আছে। জলের ফোঁটাগুলো নিচে পড়ে পাথরের ইটের ফাঁক দিয়ে তলার বালিতে মিশে যাচ্ছে। হ্যাঁ-কিছুটা পথ পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে পা ফেলে আসুন।
নদীর তলায় সুড়ঙ্গপথে হেঁটে যাওয়ার এই অভিজ্ঞতা সাংঘাতিক। কে বলতে পারে হঠাৎ এখনই এই প্রাচীন সুড়ঙ্গের ছাদ ধসে যাবে না? প্রাণ হাতে করে এগিয়ে যাচ্ছিলুম। একসময় কর্নেল বললেন, আমরা নদী পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু এবার আরও সাবধান। পথটা ক্রমশ উঁচু হচ্ছে।
তার কথা শেষ হওয়ার পরই আবার সেই কানে তালা ধরানো ভয়ঙ্কর গর্জন শোনা গেল। –আঁ–আঁ–আঁ–আঁ! আঁ–আঁ আঁ–আঁ! সুড়ঙ্গের মধ্যে এই গর্জন শুনে আমার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে যাচ্ছিল। গর্জন থামলে কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে বললেন,–শিম্পাঞ্জি বা গরিলারা কতকটা এইরকম গর্জন করে শুনেছি। কিন্তু
তিনি হঠাৎ থেমে গেলে তপেশবাবু বললেন, কিন্তু কী?
আসলে কর্নেল কান পেতে কী শুনছিলেন। বললেন,গর্জনটা থেমে যাওয়ার পর প্রতিবার শুনেছি শুকনো ডালভাঙার মতো মটমট শব্দ। শুনুন! শব্দটা ভারি অদ্ভুত!
তপেশবাবু এবং আমি দুজনেই এতক্ষণে স্পষ্ট শুনতে পেলুম মটমট শব্দ। এই শব্দ হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলেও শুনেছিলুম। কিন্তু সুড়ঙ্গের ভিতরে শব্দটা যেন কোন অজানা বিভীষিকারই সাড়া। কোনও প্রাগৈতিহাসিক হিংস্র প্রাণী যেন আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। এই শব্দ তারই পা ফেলার শব্দ।
মটমট শব্দটা একটু পরে থেমে গেল। কর্নেল আবার পা বাড়ালেন। এবার ক্রমশ সুড়ঙ্গপথ একটু করে উঁচু হয়েছে। পাথরে জুতো স্লিপ করছে। তাই আমি দেওয়াল ঘেঁসে হাঁটছিলুম। কর্নেল আলো ফেলে হঠাৎ বললেন,–সাবধান! একটা সাপ মনে হচ্ছে!
তপেশবাবু বললেন,–কই? কোথায় সাপ?
–সামনে। ফণা তুলেছে!
–সর্বনাশ! তাহলে বিষাক্ত গোখরো সাপ। আলো দেখলে ওরা ফণা তোলে!
বলে তপেশবাবু কর্নেলের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। ক্রুব্ধ কণ্ঠস্বরে তিনি বললেন,–সাপটাকে দেখতে পাচ্ছি। গুলি করে ওর ফণাটা এখনই গুঁড়ো করে দিচ্ছি।
কর্নেল তাকে এগিয়ে যেতে দিলেন না। বললেন,–সাপটা কি বাবা হাড়মটমটিয়ার পোষা? তাকে কামড়ালে তো টের পেতুম। এক মিনিট! আমি সাপটার সঙ্গে একটু খেলা করি!
